ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ আরও রক্তক্ষয়ী রূপ নিয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর হিসাব অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত নিহত অন্তত ৬২ জন। এর মধ্যে রয়েছেন ৪৮ জন বিক্ষোভকারী ও ১৪ জন নিরাপত্তা সদস্য। বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর সহিংসতায় গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও ফ্রান্সের নেতারা।
এদিকে পরিস্থিতি মোকাবেলায় এবার কঠোর দমননীতির ইঙ্গিত দিয়েছেন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। ট্রাম্পের হাতে ইরানিদের রক্ত লেগে আছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ডলারের বিপরীতে রিয়ালের রেকর্ড দরপতন এবং এর প্রেক্ষিতে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি এবং জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের প্রতিবাদে গত ২৮ ডিসেম্বর রাস্তা নামেন তেহরানের ব্যবসায়ীরা। এরপর তা তেহরানের বাইরে কারাজ, ইসফাহান, শিরাজ, কেরমানশাহসহ দেশের বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষোভে অংশ নেয় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা।
বিক্ষোভ প্রশমনে আলোচনায় বসার পাশাপাশি সীমিত সহায়তা হিসেবে প্রতি পরিবারকে মাসিক প্রায় ৭ ডলার দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
এরপরও থামেনি বিক্ষোভ। গত কয়েকদিনে বিক্ষোভের মধ্যে কোথাও কোথাও সহিংস ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হচ্ছে। এতে হতাহতের ঘটনাও ঘটছে।
মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ জানায়, এখন পর্যন্ত নিহত অন্তত ৬২ জন। এর মধ্যে রয়েছেন ৪৮ জন বিক্ষোভকারী ও ১৪ জন নিরাপত্তা সদস্য। আটক করা হয়েছে ১ হাজার ২শ’র বেশি মানুষকে। ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা ফার্স নিউজ বলছে, বিক্ষোভে এ পর্যন্ত অন্তত ৩শ’ পুলিশ ও আইআরজিসি সদস্য আহত হয়েছেন।
বিক্ষোভ দমনে ইরানি নিরাপত্তা বাহিনীর সহিংসতায় গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও ফ্রান্স। এক যৌথ বিবৃতিতে তিন দেশের নেতারা বিক্ষোভকারীদের হত্যার তীব্র নিন্দা জানান। একইসঙ্গে তারা ইরানকে নাগরিকদের মতপ্রকাশ ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধানও বিক্ষোভ ঘিরে সহিংসতায় 'গভীরভাবে উদ্বিগ্ন' বলে জানিয়েছেন।
এরই মধ্যে কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছে ইরানের নিরাপত্তা ও বিচার বিভাগ। দেশটির ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল জানায়, বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
তাদের ভাষায়, যারা সরকারি ও নিরাপত্তা স্থাপনায় হামলা চালাচ্ছে, তারা সশস্ত্র নাশকতাকারী। ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর গোয়েন্দা শাখাও ঘোষণা দিয়েছে, তথাকথিত শত্রুর পরিকল্পনা সম্পূর্ণভাবে পরাজিত না হওয়া পর্যন্ত অভিযান চলবে।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ঐক্যের আহ্বান জানান এবং হুঁশিয়ারি দেন, অস্থিরতা দমনে কর্তৃপক্ষ পিছু হটবে না। একইসঙ্গে বিদেশি শক্তি, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ উসকে দেয়ার অভিযোগ পুনর্ব্যক্ত করেন খামেনি।
ইন্টারনেট বন্ধ থাকলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে খামেনির ইংরেজি অ্যাকাউন্ট থেকে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে করা বক্তব্য পোস্ট করা হয়েছে।ট্রাম্পের হাতে ইরানিদের রক্ত লেগে আছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির দাবি, সরকার বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর সঙ্গে আলোচনার চেষ্টা করছে। তবে তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে বিক্ষোভকে সহিংসতায় রূপ দেওয়ার অভিযোগ তোলেন। বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের ভাষা ও নিরাপত্তা বাহিনীর সমন্বিত সতর্কবার্তা ইঙ্গিত দিচ্ছে, ইরান জুড়ে বড় ধরনের দমন অভিযান যে কোনো সময় শুরু হতে পারে।
এমআর/টিএ