ত্বকের যত্নে গ্লিসারিন একটি পরিচিত ও বহুল ব্যবহৃত উপাদান। পানি ও সুগন্ধির পর প্রসাধনীতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত উপাদানগুলোর একটি হলো গ্লিসারিন। এটি ত্বককে আর্দ্র রাখতে ও সুরক্ষা দিতে সাহায্য করে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মুখে সরাসরি বা অপরিশোধিত (undiluted) গ্লিসারিন ব্যবহার করলে উল্টো সমস্যা দেখা দিতে পারে; যেমন– ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া বা ফোসকা পড়া। তাই গ্লিসারিন ব্যবহারে কিছু সতর্কতা জানা জরুরি।
গ্লিসারিন কী?
গ্লিসারিন, যাকে গ্লিসারলও বলা হয়, একটি প্রাকৃতিক উপাদান। এটি সাধারণত উদ্ভিজ্জ তেল বা প্রাণিজ চর্বি থেকে তৈরি করা হয়। গ্লিসারিন স্বচ্ছ, বর্ণহীন, গন্ধহীন এবং একটু ঘন ও মিষ্টি স্বাদের তরল।
গ্লিসারিন হলো একটি হিউমেকট্যান্ট, অর্থাৎ এটি ত্বকের গভীর স্তর ও আশপাশের বাতাস থেকে পানি টেনে এনে ত্বকের উপরের স্তরকে আর্দ্র রাখে। এ কারণেই এটি ময়েশ্চারাইজার, লোশন, সাবানসহ নানা স্কিন কেয়ার পণ্যে ব্যবহার করা হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, ত্বকের ওপরের স্তর আর্দ্র রাখতে গ্লিসারিন অনেক জনপ্রিয় উপাদানের চেয়েও কার্যকর।
ত্বকের জন্য গ্লিসারিনের উপকারিতা
বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্লিসারিন ত্বকের জন্য যেসব উপকার করে, সেগুলো হলো :
- ত্বকের উপরিভাগে আর্দ্রতা ধরে রাখা
- ত্বকের প্রাকৃতিক সুরক্ষা স্তর শক্তিশালী করা
- ত্বককে জ্বালা ও ক্ষতিকর উপাদান থেকে রক্ষা করা
- ক্ষত সারাতে সহায়তা করা
- শুষ্ক ত্বকের সমস্যা কমানো
কিছু ক্ষেত্রে সোরিয়াসিসের উপসর্গ হালকা করতে সাহায্য করা
গ্লিসারিন কি ত্বকের ক্ষতি করতে পারে?
হ্যাঁ, কিছু ক্ষেত্রে পারে। গ্লিসারিন আশপাশ থেকে পানি টেনে আনে। বাতাসে আর্দ্রতা কম থাকলে, এটি ত্বকের ভেতরের স্তর থেকে পানি টেনে নিতে পারে। ফলে ত্বক আরও শুষ্ক হয়ে যেতে পারে এবং কখনো কখনো ফোসকাও পড়তে পারে।
এই কারণে বিশেষজ্ঞরা সাধারণত খাঁটি গ্লিসারিন সরাসরি ত্বকে ব্যবহার না করার পরামর্শ দেন। বরং গ্লিসারিনযুক্ত প্রস্তুত প্রসাধনী ব্যবহার করাই নিরাপদ।
অনেকে গ্লিসারিনের সঙ্গে গোলাপজল মিশিয়ে ব্যবহার করেন। গবেষণায় দেখা গেছে, গোলাপজলে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ও প্রদাহরোধী গুণ আছে, যা ত্বকের জন্য উপকারী হতে পারে।
পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে কি?
গ্লিসারিন সাধারণত নিরাপদ হলেও, যে কোনো প্রাকৃতিক উপাদানের মতোই এতে অ্যালার্জির সম্ভাবনা থাকে। যদি ব্যবহার করার পর -
ত্বক লাল হয়ে যায়
চুলকানি হয়
ফুসকুড়ি বা র্যাশ দেখা দেয়
তাহলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবহার বন্ধ করা উচিত এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া দরকার।
মুখে গ্লিসারিন কীভাবে ব্যবহার করবেন?
যদি ব্যবহার করতেই চান, তাহলে সতর্কভাবে করুন :
- প্রথমে ঠান্ডা পানি দিয়ে মুখ ধুয়ে নিন।
- তুলা বা টিস্যুতে অল্প গ্লিসারিন নিয়ে হালকাভাবে মুখে লাগান।
- কয়েক মিনিট অপেক্ষা করুন।
- এরপর পরিষ্কার পানি দিয়ে মুখ ধুয়ে ফেলুন।
তবে মনে রাখতে হবে, এটি নিয়মিত ব্যবহারের জন্য নয়। গ্লিসারিনযুক্ত ফেসওয়াশ বা ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করাই বেশি নিরাপদ।
কোন গ্লিসারিন পণ্য ব্যবহার করবেন?
বাজারে গ্লিসারিনযুক্ত অসংখ্য পণ্য পাওয়া যায়। জনপ্রিয় ব্র্যান্ডই যে সবার জন্য ভালো হবে, এমন নয়। ত্বকের ধরন অনুযায়ী পণ্য বেছে নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সংবেদনশীল ত্বকের জন্য গ্লিসারিন সাবান অনেক সময় ভালো বিকল্প হতে পারে। প্রয়োজনে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই উত্তম।
গ্লিসারিনের অন্যান্য ব্যবহার
ত্বকের যত্ন ছাড়াও গ্লিসারিন ব্যবহৃত হয় :
- কোষ্ঠকাঠিন্যের চিকিৎসায়
- বিভিন্ন ওষুধ তৈরিতে
- খাদ্যে মিষ্টি ও ঘনত্ব বাড়াতে
- সংরক্ষণকারী উপাদান হিসেবে
গ্লিসারিনকে সাধারণভাবে নিরাপদ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (FDA)।
গ্লিসারিন ত্বকের জন্য উপকারী একটি উপাদান, বিশেষ করে আর্দ্রতা ধরে রাখতে। তবে মুখের ত্বক তুলনামূলকভাবে বেশি সংবেদনশীল হওয়ায় খাঁটি গ্লিসারিন সরাসরি ব্যবহার ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাই নিজে মিশিয়ে ব্যবহার না করে, গ্লিসারিনযুক্ত মানসম্মত প্রসাধনী ব্যবহার করাই সবচেয়ে নিরাপদ উপায়।
ত্বকে কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবহার বন্ধ করা এবং বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। সচেতন ব্যবহারই ত্বককে সুস্থ ও সুন্দর রাখতে সাহায্য করবে।
সূত্র : Health Line
আরআই/টিকে