সবার উচিত অন্যের দোষ না খুঁজে নিজেদের আত্মসমালোচনা করা: আসিফ নজরুল

অন্তর্বর্তী সরকারের আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল বলেছেন, কাগজ বা আইন দিয়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠা হয় না। ইসলাম ধর্মেও আত্মসমালোচনাকে বড় গুণ বলা হয়েছে। তাই আমাদের সবার উচিত অন্যের দোষ না খুঁজে নিজেদের আত্মসমালোচনা করা।

তিনি বলেন, আমরা কি নিজের চিন্তা-ভাবনা ও সততার সংস্কার করেছি? রাজনৈতিক দল, এনজিও, সংবাদমাধ্যম বা অ্যাক্টিভিস্ট প্রতিষ্ঠানগুলো কি নিজেদের সংস্কার করেছে? সবাই একে অপরকে দোষারোপ করছে, কিন্তু নিজেরা পরিবর্তন হচ্ছে না। শুধু আইন দিয়ে, সংস্কার করলে ম্যাজিকের মতো মানুষ ভালো হয়ে যায় না। ইংল্যান্ডে লিখিত সংবিধান নেই, তবু সেখানে সুশাসন আছে। অথচ আফ্রিকার অনেক দেশে হাজারও ভালো আইন থাকার পরও সুশাসন নেই। 

শনিবার (১০ জানুয়ারি) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘রাজনৈতিক দল, মানবাধিকার এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা’ শীর্ষক পলিসি ডায়ালগ অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।

আসিফ নজরুল বলেন, দশটি কাজের মধ্যে সরকার যদি চারটি ভালো কাজ করে তবে তার স্বীকৃতি দেওয়া উচিত। বাকি ছয়টি কাজের সমালোচনা করতে কোনো বাধা নেই। কিন্তু একেবারে কিছুই হয়নি বলে প্রচার করা সৎ সমালোচনার পর্যায়ে পড়ে না।

সংস্কার প্রসঙ্গে আসিফ নজরুল বলেন, আমরা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পদায়ন, বদলি, পদোন্নতি, বাজেট বরাদ্দ ও বাজেট ব্যবস্থাপনার সব ক্ষমতা উচ্চ আদালতের হাতে ন্যস্ত করেছি। এটি কি সংস্কার নয়? আমরা গুম কমিশন গঠন করেছি, সেটি অসাধারণ কাজ করেছে এবং সেই অভিজ্ঞতার আলোকে মানবাধিকার কমিশন আইন প্রণয়ন করা হয়েছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার যেকোনো আইনের চেয়ে উন্নত। অচিরেই এই আইনের আওতায় কমিশনে নিয়োগ দেওয়া হবে। এছাড়া সিআরপিসি ও সিপিসিতেও যুগান্তকারী সংস্কার আনা হয়েছে। লিগ্যাল এইড কার্যক্রম আগের চেয়ে দশগুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে, যার ফলে মানুষ বিনা খরচে ও ভোগান্তিতে আইনি সহায়তা পাচ্ছে। এই কার্যক্রমে সন্তুষ্ট হয়ে ব্র্যাক সাড়ে ৫ কোটি টাকা অনুদান দিয়েছে। আমাদের লক্ষ্য এই কার্যক্রম ২০ গুণ বৃদ্ধি করা।

তিনি বলেন, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে ভারতের আধিপত্যবাদী অবস্থান থেকে দেশকে মুক্ত করে স্বাধীনভাবে কথা বলার পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে। এছাড়া অর্থনৈতিক খাতেও স্বস্তি ফিরেছে। রিজার্ভ বেড়েছে এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ভগ্নপ্রায় ও বিধ্বস্ত ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ও আস্থা ফিরিয়ে আনা হয়েছে। বিরোধী দল ও ভিন্ন মতের মানুষের প্রায় ৫ লাখ আসামি ছিলেন এমন ২০ হাজারেরও বেশি হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে। এগুলো কি কোনো সাফল্য নয়? অথচ সমালোচনার সময় এসব বিষয় কারও চোখে পড়ে না।

আইন উপদেষ্টা বলেন, গত ১৬ মাসে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি সাইবার বুলিংয়ের শিকার আমি হয়েছি, এটা আমি চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারি। গত ১৫ বছর আমাকে পাকিস্তানের দালাল বলা হয়েছে, আর এখন রাতারাতি আমাকে ভারতের দালাল বানানো হয়েছে। অপপ্রচার চালানো হয়েছে যে, আমার আমেরিকায় বাড়ি আছে এবং পরিবার সেখানে চলে গেছে। আমি প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ দিয়েছিলাম যে আমেরিকায় বাড়ি থাকলে তার ঠিকানা খুঁজে বের করুন। কিন্তু কোনো সাংবাদিক বা ইউটিউবার তা বের করতে পারেনি। যারা এসব মিথ্যা ও বানোয়াট তথ্য ছড়িয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে কেউ কোনো প্রতিবাদ করেনি। সততাই যার জীবনের সবচেয়ে বড় অহংকার, তার বিরুদ্ধে এমন জঘন্য অপপ্রচার চালানোই সবচেয়ে বড় সাইবার বুলিং।

হাইকোর্ট থেকে জামিন পাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, জুলাইয়ের ঘটনায় আটক ব্যক্তি বা আওয়ামী লীগের যেসব জামিন হচ্ছে, তার ৯০ শতাংশই দিচ্ছে হাইকোর্ট। জামিন দেওয়ার এখতিয়ার সম্পূর্ণ বিচারকের। কোনো বিচারক যদি ভুল বা অন্যায়ভাবে জামিন দেন, তবে তার দায় সেই বিচারকের, আমাদের না। এখানে আইন মন্ত্রণালয়ের কোনো হাত নেই। অথচ জামিন হলেই আইন উপদেষ্টাকে দোষারোপ করা হয়। এর পেছনে বিশেষ রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা রয়েছে। কেননা আমাকে দুর্বল করলে সেই অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়ন সহজ হবে বলেই উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এই দোষারোপ করা হচ্ছে।

সিজিএসের সভাপতি জিল্লুর রহমানের সঞ্চালনায় পলিসি ডায়ালগে আরও বক্তব্য দেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান, বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) অবৈতনিক নির্বাহী পরিচালক সারা হোসেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক আবদুল লতিফ মাসুম, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ ও বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দিদার ভুঁইয়া।

কেএন/টিকে

Share this news on:

সর্বশেষ

img
গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ৫২ Jan 11, 2026
img
কিছু ভুয়া খবর দেখলাম : তাহসান Jan 11, 2026
img
তিন ফিফটিতে নিউজিল্যান্ডের সংগ্রহ ৩০০ রান Jan 11, 2026
img
মিয়ানমারে সংঘাতের জেরে টেকনাফ সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদারের দাবি বিএনপি-জামায়াতের Jan 11, 2026
img
তাহসান খুব রোমান্টিকভাবে সেদিন প্রপোজ করেছিল রোজাকে: মনজু আহমেদ Jan 11, 2026
img
সুষ্ঠু ভোট হলে জাতীয় পার্টি ৪০-৭০টি আসন পাবে: শামীম হায়দার Jan 11, 2026
img
বাংলাদেশি শনাক্তে এআই টুল চালু হচ্ছে: মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী Jan 11, 2026
img
ইসিতে দ্বিতীয় দিনের আপিলে ৫৭ জন বৈধ Jan 11, 2026
img
ডেভিড বেকহ্যাম ও তার স্ত্রীকে বড় ছেলের আইনি নোটিশ Jan 11, 2026
img
‘আমরা ইন্টারনেট বন্ধ করিনি’ বক্তব্যের ভিডিও মনোযোগ দিয়ে দেখলেন পলক Jan 11, 2026
img

তদন্তে বাধা

নেতানিয়াহুর এক সহকারী আটক Jan 11, 2026
img
গণভোটের ক্ষেত্রে 'হ্যা'র পক্ষে প্রচারণা চালাবে সরকার: প্রেস সচিব Jan 11, 2026
img
মোসাব্বিরের ঘটনায় অভিযুক্ত শুটার জিনাতসহ গ্রেপ্তার ৪ Jan 11, 2026
img
১৭৮ রান করেও রাজশাহীর কাছে পাত্তা পেলো না রংপুর Jan 11, 2026
img
নোবেল পুরস্কার ঘোষণার পর বাতিল, হস্তান্তর কিংবা ভাগাভাগি সম্ভব নয়: নোবেল ইনস্টিটিউট Jan 11, 2026
img
‘হ্যাঁ’ ভোটের মাধ্যমেই গণতন্ত্র শক্তিশালী হবে: হাসনাত আবদুল্লাহ Jan 11, 2026
img
এখন তোমার সব হয়েছে, পর হয়েছি আমি : রুমিন ফারহানা Jan 11, 2026
img
বগুড়া-১ আসনে কাজী রফিকুল ইসলামের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা Jan 11, 2026
img
গণভোটে সরকারের ‘হ্যাঁ’ ভোট চাইতে আইনগত বাধা নেই: প্রধান উপদেষ্টা Jan 11, 2026
img
কুমিল্লা-২ আসনে সীমানা পরিবর্তন নিয়ে ইসির গেজেট অবৈধ ঘোষণার রায় স্থগিত Jan 11, 2026