যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডে নেমে শক্তি প্রয়োগ করে অঞ্চলটি দখল করবেন না বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রে দায়িত্বপালন করা সাবেক ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত লর্ড ম্যান্ডেলসন। তিনি বলেছেন, ট্রাম্প রাজনৈতিক আলোচনায় সরাসরি কথা বলতে পছন্দ করলেও তিনি ‘মূর্খ নন’, আর তার উপদেষ্টারাও তাকে মনে করিয়ে দেবেন যে গ্রিনল্যান্ড দখলের চেষ্টা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তার মতে, কৌশলগত গুরুত্ব থাকলেও শক্তি প্রয়োগ করে গ্রিনল্যান্ড দখলের পথে হাঁটবেন না ট্রাম্প।
সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ম্যান্ডেলসন বলেন, ট্রাম্পের কথাবার্তায় তিনি স্পষ্টতা দেখেন, তবে বাস্তবতা বোঝার ক্ষেত্রে তিনি যথেষ্ট সচেতন। তার ভাষায়, গ্রিনল্যান্ড দখলে সামরিক পদক্ষেপ নিলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তা ‘গুরুতর বিপদের’ কারণ হতে পারে।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে আধা-স্বায়ত্তশাসিত ডেনিশ অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডের শাসনব্যবস্থা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা জোরদার হয়েছে। গত শনিবার ট্রাম্প বলেন, রাশিয়া ও চীনের প্রভাব ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ড ‘নিজেদের মালিকানায়’ নেয়া প্রয়োজন। তবে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড— দুই পক্ষই স্পষ্ট করে জানিয়েছে, অঞ্চলটি বিক্রির জন্য নয়। ডেনমার্ক সতর্ক করে বলেছে, সামরিক পদক্ষেপ নেয়া হলে তা ন্যাটো জোটের অবসান ডেকে আনতে পারে।
এদিকে আগামী সপ্তাহে গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ডেনমার্কের সঙ্গে আলোচনা করবেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। এদিকে এএফপি জানিয়েছে, ডেনমার্কে পরিচালিত এক জরিপে ৩৮ শতাংশ মানুষ মনে করছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডে সামরিক আগ্রাসন চালাতে পারে।
বিবিসির ‘সানডে উইথ লরা কুয়েন্সবার্গ’ অনুষ্ঠানে লর্ড ম্যান্ডেলসন বলেন, ‘তিনি (ট্রাম্প) এটা করবেন না বলে আমি মনে করি। আমি নিশ্চিত করে বলতে পারছি না, তবে যিনি কাছ থেকে তাকে দেখেছেন, তার বিবেচনায় এটা অসম্ভব।’
জনসংখ্যা কম হলেও উত্তর আমেরিকা ও আর্কটিক অঞ্চলের মাঝামাঝি অবস্থানের কারণে গ্রিনল্যান্ড কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষেপণাস্ত্র আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা ও আর্কটিক অঞ্চলে নৌযান নজরদারির জন্য এটি আদর্শ অবস্থানে রয়েছে।
ট্রাম্প বারবার দাবি করে আসছেন, গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনও প্রমাণ ছাড়াই তিনি বলেছেন, অঞ্চলটি নাকি ‘রাশিয়া ও চীনের জাহাজে ভরে আছে’। ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে সাম্প্রতিক এক অভিযানে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটক এবং বহু মানুষের মৃত্যুর ঘটনার পর আবারও গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের আগ্রহ সামনে আসে।
লর্ড ম্যান্ডেলসন আরও বলেন, আর্কটিক অঞ্চলকে রাশিয়া ও চীনের প্রভাব থেকে সুরক্ষিত করার বাস্তবতা সবাইকে মেনে নিতে হবে। তার মতে, এই নিরাপত্তা উদ্যোগের নেতৃত্ব শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রই দেবে, এটা সবারই জানা।
এদিকে যুক্তরাজ্য ন্যাটো মিত্রদের সঙ্গে আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা জোরদারে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন দেশটির এক জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী। পরিবহনমন্ত্রী হাইডি আলেকজান্ডার বলেন, রাশিয়া ও চীনের প্রভাব মোকাবিলায় আলোচনা ন্যাটোর নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ, এটি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হুমকির প্রতিক্রিয়া নয়। তবে তিনি স্বীকার করেন, আর্কটিক অঞ্চল দিন দিন আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে উঠছে, এ বিষয়ে যুক্তরাজ্য ট্রাম্পের সঙ্গে একমত।
তিনি বলেন, ‘পুতিনের বিরুদ্ধে আর্কটিক অঞ্চলে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ন্যাটোর সব মিত্রের সঙ্গে একযোগে কাজ করা অত্যন্ত জরুরি।’
তবে ব্রিটিশ কনজারভেটিভ পার্টির নেতা কেমি ব্যাডেনক বলেন, গ্রিনল্যান্ড পরিস্থিতি ইরানে চলমান বিক্ষোভ ও দমন-পীড়নের তুলনায় দ্বিতীয় স্তরের ইস্যু। তার মতে, গ্রিনল্যান্ডে সেনা পাঠানো নিয়ে আলোচনা পুরোপুরি কাল্পনিক, কারণ যুক্তরাষ্ট্র এখনও সেখানে হামলা চালায়নি।
লিবারেল ডেমোক্র্যাট নেতা স্যার এড ডেভি বলেন, ডেনমার্কের নেতৃত্বে ন্যাটোর যৌথ অভিযানের অংশ হিসেবে গ্রিনল্যান্ডে সেনা মোতায়েনের বিষয়ে যুক্তরাজ্যের সম্মতি দেয়া উচিত। তার অভিযোগ, ট্রাম্পের ‘অযৌক্তিক হুমকি’ রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের হাতই শক্ত করছে।
বর্তমান চুক্তির আওতায় ডেনমার্কের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। চাইলে সেখানে প্রয়োজনমতো সেনা পাঠানোর অধিকারও যুক্তরাষ্ট্রের আছে। এছাড়া সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গ্রিনল্যান্ডের প্রাকৃতিক সম্পদের প্রতি আগ্রহ বেড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বরফ গলতে থাকায় বিরল খনিজ, ইউরেনিয়াম, লোহাসহ বিভিন্ন সম্পদ সহজলভ্য হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, সেখানে উল্লেখযোগ্য তেল ও গ্যাসের মজুতও থাকতে পারে।
তবে শনিবার ওয়াশিংটনে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, বিদ্যমান চুক্তিগুলো যথেষ্ট নয়। তিনি বলেন, ‘আমি চীনের মানুষকে ভালোবাসি, রাশিয়ার মানুষকেও ভালোবাসি। কিন্তু গ্রিনল্যান্ডে তাদের প্রতিবেশী হিসেবে চাই না, এটা হবে না। আর ন্যাটোকেও এটা বুঝতে হবে।’
এর আগে ইউরোপের বড় দেশগুলো ও কানাডাসহ ডেনমার্কের ন্যাটো মিত্ররা একযোগে সমর্থন জানিয়ে বলেছে, ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড ছাড়া অন্য কেউ তাদের সম্পর্ক সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।
কেএন/টিকে