ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ও দমন অভিযানে প্রায় দুই হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে স্বীকার করেছে দেশটির সরকার। মঙ্গলবার বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এই তথ্য জানান। টানা দুই সপ্তাহ ধরে চলা বিক্ষোভে প্রাণহানির বিষয়ে এটিই প্রথম কোনো আনুষ্ঠানিক স্বীকারোক্তি।
ওই কর্মকর্তা জানান নিহতদের মধ্যে বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য উভয়ই রয়েছেন। তবে কতজন বিক্ষোভকারী এবং কতজন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য নিহত হয়েছেন সে বিষয়ে তিনি কোনো নির্দিষ্ট তথ্য দেননি। তাঁর দাবি যাদের তিনি সন্ত্রাসী হিসেবে উল্লেখ করেছেন তারাই সহিংসতার জন্য দায়ী এবং উভয় পক্ষের মৃত্যুর পেছনেও তাদের ভূমিকা রয়েছে।
তবে সরকারি এই হিসাবকে চ্যালেঞ্জ করে প্রবাসী সংবাদমাধ্যম ইরান ইন্টারন্যাশনাল দাবি করেছে সাম্প্রতিক দমন অভিযানে অন্তত ১২ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে প্রকৃত চিত্র আড়াল করতেই দেশজুড়ে ইন্টারনেট বন্ধ রাখা হয়েছে এবং তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয় ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন করা যোগাযোগব্যবস্থা অচল রাখা সংবাদমাধ্যম বন্ধ এবং সাংবাদিক ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভয়ভীতি দেখানোর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয়ভাবে তথ্য গোপন করা হচ্ছে। ফলে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা নিরূপণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
ইরান ইন্টারন্যাশনাল জানায় তারা ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন তথ্য যাচাই করে একটি সামগ্রিক হিসাব দাঁড় করিয়েছে। দীর্ঘ যাচাই প্রক্রিয়ার পর তাদের প্রতিবেদনে বলা হয় গত ৮ ও ৯ জানুয়ারি টানা দুই রাতে সংঘটিত এই দমন অভিযান ইরানের সাম্প্রতিক ইতিহাসে সবচেয়ে বড় হত্যাযজ্ঞ।
সংবাদমাধ্যমটি দাবি করে সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের ঘনিষ্ঠ সূত্র প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের দুটি সূত্র মাশহাদ কেরমানশাহ ও ইসফাহানে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর অভ্যন্তরীণ সূত্র নিহতদের পরিবার প্রত্যক্ষদর্শী চিকিৎসক ও নার্সদের তথ্য মিলিয়ে এই হিসাব করা হয়েছে। নিহতদের বেশিরভাগই ৩০ বছরের কম বয়সী তরুণ এবং তাদের বড় অংশকে আইআরজিসি ও বসিজ বাহিনী গুলি করে হত্যা করেছে বলে অভিযোগ করা হয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে এই অভিযান ছিল পরিকল্পিত এবং ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির সরাসরি নির্দেশে তা পরিচালিত হয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ থেকে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল বলেও দাবি করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে ইরানের এই অস্থিরতার পেছনে রয়েছে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট। গত কয়েক বছরের মধ্যে এটি শাসকগোষ্ঠীর জন্য সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গত বছর ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর আন্তর্জাতিক চাপ বৃদ্ধি।
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে ক্ষমতায় থাকা ইরানের ধর্মীয় নেতৃত্ব বিক্ষোভ মোকাবিলায় দ্বিমুখী কৌশল নিয়েছে। একদিকে তারা অর্থনৈতিক দাবিতে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকে বৈধ বলে উল্লেখ করছে অন্যদিকে নিরাপত্তা বাহিনী দিয়ে কঠোর দমন অভিযান চালাচ্ছে। সরকারের অভিযোগ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এই অস্থিরতা উসকে দিচ্ছে এবং তথাকথিত সন্ত্রাসীরাই বিক্ষোভকে সহিংসতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
ইউটি/টিএ