গাজার জন্য গঠিত ‘বোর্ড অব পিস’-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার এবং যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর নাম ঘোষণা করেছে ট্রাম্প প্রশাসন।
শুক্রবার হোয়াইট হাউজের এক বিবৃতিতে জানানো হয়, ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং প্রেসিডেন্টের জামাতা জ্যারেড কুশনার এই বোর্ডে ‘প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী সদস্য’ হিসেবে থাকবেন। বোর্ডটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করবেন স্বয়ং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
হোয়াইট হাউজ জানায়, ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যকার যুদ্ধ বন্ধে ট্রাম্প একটি ২০ দফা পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন।
এই বোর্ড সাময়িকভাবে গাজার শাসনব্যবস্থার তত্ত্বাবধান করবে এবং যুদ্ধ–পরবর্তী পুনর্গঠন কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব নেবে। বোর্ডের নির্বাহী সদস্যদের মধ্যে আরো থাকছেন বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান কেকেআরের প্রধান নির্বাহী মার্ক রোয়ান, বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙগা এবং যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা রবার্ট গ্যাব্রিয়েল।
হোয়াইট হাউজের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বোর্ডের প্রতিটি সদস্যের ওপর গাজাকে স্থিতিশীল করা এবং দীর্ঘমেয়াদে সফলভাবে পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থাকবে। এর আগে বৃহস্পতিবার ট্রাম্প নিজেই বোর্ড গঠনের ঘোষণা দেন এবং একে ‘যেকোনো সময় ও যেকোনো স্থানের জন্য সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ বোর্ড’ বলে উল্লেখ করেন।
হোয়াইট হাউজ জানিয়েছে, বোর্ডের বাকি সদস্যদের নাম আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে প্রকাশ করা হবে।
স্যার টনি ব্লেয়ার ১৯৯৭ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তার নেতৃত্বেই ২০০৩ সালে যুক্তরাজ্য ইরাক যুদ্ধে অংশ নেয়। পরে তিনি যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, রাশিয়া ও জাতিসংঘের পক্ষে মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশেষ দূত হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
বোর্ড অব পিস ঘোষণার আগেই গাজা পরিচালনার জন্য ১৫ সদস্যের একটি ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাট কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটির নাম ‘ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা’ (এনসিএজি)। যুদ্ধ–পরবর্তী সময়ে গাজার দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজ পরিচালনা করবে এই কমিটি। এর নেতৃত্বে থাকবেন পশ্চিম তীরভিত্তিক ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সাবেক উপমন্ত্রী আলি শাথ।
হোয়াইট হাউজ জানায়, বুলগেরিয়ার সাবেক রাজনীতিক ও জাতিসংঘের সাবেক মধ্যপ্রাচ্য দূত নিকোলে ম্লাদেনভ বোর্ডের প্রতিনিধি হিসেবে গাজায় এনসিএজির সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবেন।
ট্রাম্প প্রশাসনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, গাজায় ‘ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স’ (আইএসএফ) মোতায়েন করা হবে। এই বাহিনী ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে। নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা, শান্তি বজায় রাখা এবং সন্ত্রাসমুক্ত পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে বাহিনীটির নেতৃত্ব দেবেন যুক্তরাষ্ট্রের মেজর জেনারেল জ্যাসপার জেফারস।
এ ছাড়া গাজা পরিচালনায় সহায়তার জন্য একটি আলাদা ‘গাজা নির্বাহী বোর্ড’ গঠনের কথাও জানিয়েছে হোয়াইট হাউজ। গাজার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি পরিকল্পনা প্রথম ঘোষণা করা হয় গত বছরের অক্টোবরে। বর্তমানে পরিকল্পনাটি দ্বিতীয় ধাপে প্রবেশ করেছে। তবে গাজার ভবিষ্যৎ এবং সেখানে বসবাসরত প্রায় ২১ লাখ ফিলিস্তিনির ভাগ্য নিয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
প্রথম ধাপে হামাস ও ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি, বন্দি বিনিময়, ইসরায়েলি সেনাদের আংশিক প্রত্যাহার এবং গাজায় ত্রাণ সহায়তা বাড়াতে সম্মত হয়েছিল। চলতি সপ্তাহের শুরুতে স্টিভ উইটকফ জানান, দ্বিতীয় ধাপে গাজা পুনর্গঠন ও পুরোপুরি অসামরিকীকরণ করা হবে। এর আওতায় হামাসসহ অন্যান্য ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিরস্ত্রীকরণও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র আশা করে হামাস সম্পূর্ণভাবে তাদের দায়বদ্ধতা পালন করবে। এর মধ্যে সব নিহত ইসরায়েলি জিম্মির মরদেহ ফেরত দেওয়াও রয়েছে। এতে ব্যর্থ হলে ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে।’ এদিকে যুদ্ধবিরতি এখনো অত্যন্ত ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। দুই পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ করছে।
গাজার হামাস–নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও অন্তত ৪৫০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে ইসরায়েল জানিয়েছে, এই সময়ে তাদের তিনজন সেনা নিহত হয়েছে। জাতিসংঘ বলছে, গাজায় মানবিক পরিস্থিতি এখনো চরমভাবে বিপর্যস্ত।
জরুরি সহায়তা নির্বিঘ্নে প্রবেশ নিশ্চিত করার ওপর তারা বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস ইসরায়েলে হামলা চালানোর মধ্য দিয়ে গাজা যুদ্ধের সূচনা হয়। ওই হামলায় শতাধিক ইসরায়েলি নিহত হয় এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়। এর জবাবে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে এখন পর্যন্ত ৭১ হাজার ২৬০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
সূত্র : বিবিসি বাংলা।
এমআর/টিএ