দ্বৈত নাগরিকত্ব এবং প্রক্রিয়াগত সঙ্গতি

দ্বৈত নাগরিকত্ব এবং প্রক্রিয়াগত সঙ্গতি

শিরোনামের বিষয়বস্তুর ওপর নিচে আমার সংক্ষিপ্ত মতামত তুলে ধরলাম। আমিই যে ঠিক-এমন দাবি করছি না। তাই সহমত বা দ্বিমত প্রকাশ করে আমাকে আলোকিত করলে খুশি হব।

(ক) নির্বাচন কমিশনের এখতিয়ার

নির্বাচন কমিশন (ইসি) কেবল প্রশাসনিক ও বিধিবদ্ধ অ‍্যাপিল এখতিয়ার প্রয়োগ করতে পারে। সাংবিধানিক প্রশ্ন নিষ্পত্তি করার কোনো ক্ষমতা ইসির নেই। এ ক্ষমতা আছে কেবল বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালতের।

ইসিকে অবশ্যই নির্বাচন সংক্রান্ত আইন, বিধি ও নিজস্ব প্রকাশিত নির্দেশনার সীমার মধ্যে অবস্থান করতে হবে। কোনোভাবেই তারা সংবিধানিক আদালতের ভূমিকা গ্রহণ করতে পারবে না।

(খ) নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা

দ্য রিপ্রেজেন্টেশন অব দ্য পিপল অর্ডার, ১৯৭২ (আরপিও), সংশ্লিষ্ট অন‍্যান‍্য আইন ও বিধিসমূহ এবং নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব প্রকাশিত নির্দেশনা দ্বারা ইসি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত।

আরপিও এবং ইসির নির্দেশনা অনুযায়ী, একজন প্রার্থীকে নাগরিকত্ব ও দ্বৈত নাগরিকত্ব সম্পর্কিত বিষয়ে কেবল একটি শপথকৃত হলফনামা (affidavit) দাখিল করতে হয়। হলফনামা একটি আইনস্বীকৃত ও বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ, যা বিপরীত কিছু প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত সত্য বলে গণ্য হবে।

নমিনেশন পেপার দাখিলের সময় হলফনামার বাইরে নাগরিকত্ব ত্যাগ সংক্রান্ত কোনো অতিরিক্ত নথি (যেমন-certificate of renunciation) জমা দেওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। অন‍্যদিকে, শিক্ষাগত যোগ্যতার দলিল দাখিলের বিষয়টি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। হলফনামার মধ্যেই এ পার্থক্য সুস্পষ্ট, যা আইনগতভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।

প্রযোজ্য আইন, বিধি বা তার নিজস্ব নির্দেশনার বাইরে গিয়ে ইসি দলিলগত নতুন শর্ত আরোপ করতে পারে না এবং সে আলোকে নতুন কোনো অযোগ্যতার ভিত্তি সৃষ্টি করতে পারে না।

(গ) পূর্ণ আইনগত পরিপালন

একজন সম্ভাব্য প্রার্থী প্রযোজ্য সকল আইন, বিধি ও নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত নির্দেশনা সম্পূর্ণভাবে পরিপালন করলে রিটার্নিং অফিসার আইনসম্মতভাবেই তার নমিনেশন বৈধ বলে বিবেচনা করবে।

অ‍্যাপিল শুনানির পর্যায়ে ইসি পূর্বে অনাবশ্যক ছিল এমন কোনো নতুন শর্ত আরোপ করতে পারবে না। অর্থাৎ কোনো আইন, বিধি বা প্রকাশিত নির্দেশনায় আবশ‍্যক নয়-এমন নথি অনুপস্থিত থাকার কারণে নমিনেশন বাতিল করা আইনসম্মত হবে না। উল্লেখ‍্য যে, নাগরিকত্ব সংক্রান্ত বিষয়ে শপথকৃত হলফনামার বাইরে অন্য কোনো দলিল চাওয়ার কোনো প্রকাশিত চেকলিস্ট ইসির নেই।

যা-ই হোক, যে কোনো অবস্থায়, কোনো সম্ভাব্য প্রার্থী যদি মিথ্যা তথ্য প্রদান করে, প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী তিনি অবশ্যই নির্বাচনের অযোগ্য হবেন।

(ঘ) প্রমাণের ভার

দ্য এভিডেন্স অ্যাক্ট, ১৮৭২-এর ধারা ১০১ অনুযায়ী, যে পক্ষ কোনো বিষয় দাবি করে, প্রমাণের দায়ভার তার ওপরই বর্তায়। নির্বাচনি আইনেও এ নীতি প্রযোজ্য।

অতএব, নমিনেশন চ্যালেঞ্জকারী, অ‍্যাপিলকারী বা অবজেক্টরের ওপরই প্রমাণের দায়ভার বর্তায়। অর্থাৎ তাকে প্রমাণ করতে হবে যে, সম্ভাব্য প্রার্থী এখনও বিদেশি নাগরিকত্ব ধারণ করছেন। নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রমাণ দাখিল করা হয়নি-শুধু এই অভিযোগ আইনগতভাবে যথেষ্ট নয়। বিদেশি নাগরিকত্ব বিদ্যমান আছে-এটি প্রমাণ করা অ‍্যাপিলকারীর দায়িত্ব।

(ঙ) নতুন প্রমাণ দাবি করার আইনগত ভিত্তি

অ‍্যাপিল পর্যায়ে নাগরিকত্ব ত্যাগের সনদ দাবি করার আইনগত ভিত্তি কী?

নির্বাচনি আইন, বিধি অথবা নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত নির্দেশনার মধ্যে যা নেই, তার বাইরে গিয়ে কোনো দলিল জমা দিতে বলা বেআইনি।

যদি কোনো আইনি ভিত্তি থাকে, তা দেখানোর দায় অ‍্যাপিলকারী বা নির্বাচন কমিশনের (যদি আপিলকারীর অবস্থানের সঙ্গে তারা একমত হয়)। কিন্তু এমন কোনো স্পষ্ট আইনগত বিধান না থাকলে, সম্ভাব্য প্রার্থীর দাখিলকৃত হলফনামাই পূর্ণাঙ্গ, যথেষ্ট ও আইনগতভাবে বৈধ বলে গণ্য হবে।

প্রযোজ্য আইন, বিধি বা নিজস্ব প্রকাশিত নির্দেশনার সীমা লংঘন করে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে ইসির জন্য তা হবে ultra vires ও স্বেচ্ছাচারী, যা আইনত টেকসই নয়।

পাদটীকা-উপরে শুধু পদ্ধতিগত সঙ্গতি নিয়ে খানিকটা মতামত দিলাম। সংবিধানিক ইস‍্যু বা বিষয়াদি নিয়ে যথাসময়ে প্রয়োজনীয় যুক্তি ও উপস্থাপন করা যাবে।

-ব্যারিস্টার আবু সায়েম

টিকে/

Share this news on:

সর্বশেষ

img
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে ফ্যাসিবাদ মাথাচাড়া দিতে পারবে না : ধর্ম উপদেষ্টা Jan 19, 2026
img
প্যান-ইন্ডিয়া ছবির শুটিংয়ে অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতা প্রকাশ করলেন পূজা হেগড়ে Jan 19, 2026
img
আগামী শনিবার সিরাজগঞ্জ যাচ্ছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান Jan 19, 2026
img
কোনো দলের পক্ষ নেওয়া যাবে না, ভোট হবে নিরপেক্ষ : সেনাপ্রধান Jan 19, 2026
img
সীমান্তের ওপারে স্বৈরাচারের দোসররা গণভোট নিয়ে প্রশ্ন তুলছে: উপদেষ্টা আদিলুর Jan 19, 2026
আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের ফাইনালে মরক্কোকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন সেনেগাল Jan 19, 2026
img
প্রতারণার মামলায় ইভ্যালির রাসেল-শামীমার ১৫ মাসের কারাদণ্ড Jan 19, 2026
আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের ফাইনালে মরক্কোকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন সেনেগাল Jan 19, 2026
img
দেশের অর্থনীতি আর ভঙ্গুর অবস্থায় নেই: অর্থ উপদেষ্টা Jan 19, 2026
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারী প্রার্থী মাত্র ৪ শতাংশ! Jan 19, 2026
img
দেশের সুষ্ঠু পুনর্গঠনে গণভোট অত্যন্ত জরুরি: উপদেষ্টা শারমীন Jan 19, 2026
img
প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে এনসিপির বৈঠক বিকেলে Jan 19, 2026
img
১৭ বছরের ছোট নায়িকার সঙ্গে পরকীয়া, জানতে পেরে অজয়কে সংসার ভাঙার হুমকি কাজলের Jan 19, 2026
img
বাংলাদেশ ইস্যুতে নিজেদের বিশ্বকাপ প্রস্তুতি স্থগিত করল পাকিস্তান Jan 19, 2026
img
টাঙ্গাইলে প্রশিক্ষণের সময় পুলিশ সদস্য গুলিবিদ্ধ Jan 19, 2026
img
শাকসু নির্বাচন বন্ধ হলে দেশব্যাপী কঠোর ও লাগাতার কর্মসূচির হুঁশিয়ারি শিবিরের Jan 19, 2026
img
ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে পরাজিত করেছে: খামেনি Jan 19, 2026
img
অভিনেতা মারুফের বাসায় অমিত হাসানের সঙ্গে শাবনূরের নাচ ভাইরাল Jan 19, 2026
img
স্বতন্ত্র বেতন স্কেল প্রবর্তনের দাবিতে জবি শিক্ষক সমিতির মানববন্ধন Jan 19, 2026
img
মার্কিন ভিসা পেতে বন্ড জমার তারিখ প্রকাশ করল দূতাবাস Jan 19, 2026