‘মিঞাঁ মুসলমানদের’ আসামে নয়, বাংলাদেশে গিয়ে ভোট দেয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছেন ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা। তিনি দাবি করেন, এই গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান নেয়ার ক্ষেত্রে কোনো লুকোচুরি নেই।
মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, এমনভাবে ব্যবস্থা নিতে হবে যাতে ‘মিঞাঁ মুসলমানরা’ উত্যক্ত বোধ করেন এবং আসাম ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হন। তার ভাষায়, এ ক্ষেত্রে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট এবং তারা এ বিষয়ে কোনো রাখঢাক করছে না।
ভারতে ‘মিঞাঁ’ শব্দটি আসামের বাংলাভাষী মুসলমানদের উদ্দেশে ব্যবহৃত একটি অবমাননাকর শব্দ বা কটু ক থা হিসেবে পরিচিত, যার মাধ্যমে তাদের বাংলাদেশি হিসেবে চিহ্নিত করার ইঙ্গিত দেয়া হয়। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে হিমন্ত বিশ্বশর্মা একাধিকবার এই সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন।
কয়েক মাসের মধ্যেই আসামে বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এর আগে রাজ্যে ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধনের কাজ চলছে। এটি ভোটের আগে নিয়মিত প্রক্রিয়া হলেও পশ্চিমবঙ্গসহ অন্য রাজ্যগুলোর নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া থেকে এটি ভিন্ন।
মুখ্যমন্ত্রী জানান, ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় বিজেপি কর্মীদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে যেন তারা সন্দেহভাজন বিদেশিদের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনে ‘সাত নম্বর ফর্ম’ জমা দেন। তার দাবি, ইতিমধ্যে প্রায় পাঁচ লাখ এমন ফর্ম জমা দেয়া হয়েছে। আইন অনুযায়ী, ভোটার তালিকায় কোনো নাম নিয়ে আপত্তি জানাতে যে কেউ এই ফর্ম দাখিল করতে পারেন।
বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) এই নির্দেশনার প্রতিবাদে আসামের কংগ্রেস নেতৃত্ব ভারতের প্রধান বিচারপতির কাছে চিঠি পাঠিয়েছে। তাদের অভিযোগ, নির্দিষ্ট একটি সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে।
মঙ্গলবার তিনসুকিয়া জেলার ডিগবইয়ে এক অনুষ্ঠানের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে হিমন্ত বিশ্বশর্মা বলেন, তাদের কাছে ‘ভোট চুরি’ বলতে বোঝায় কিছু ‘মিঞাঁ ভোট’ ঠেকানো। তিনি বলেন, আদর্শ ব্যবস্থা হতো যদি তাদের আসামে ভোট দেয়ার অনুমতি না দিয়ে বাংলাদেশে ভোট দিতে বলা হতো। আসামে তারা যাতে ভোট দিতে না পারেন, সে জন্য সরকার নিশ্চিত ব্যবস্থা নিচ্ছে।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি দাবি করেন, নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় চার থেকে পাঁচ লাখ ‘মিঞাঁ’ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেয়া সম্ভব হবে। সমালোচনা যতই হোক, হলো এই জনগোষ্ঠীর ওপর চাপ সৃষ্টি করা তার লক্ষ্য বলে জানান আসামের এই মুখ্যমন্ত্রী।
এর আগেও তিনি বিরূপ মন্তব্য করে বলেন, আইন মেনেই ‘মিঞাঁদের’ উত্যক্ত করা হবে। এমনকি সাধারণ মানুষকেও তাদের বিরক্ত করতে আহ্বান জানিয়েছিলেন তিনি। এছাড়া দৈনন্দিন লেনদেনেও যেন তাদের অস্বস্তিতে রাখা হয় সে আহ্বান করেন বিশ্বশর্মা। এই বক্তব্য ঘিরে তীব্র সমালোচনা শুরু হলে হিমন্ত বিশ্বশর্মা পাল্টা দাবি করেন, ‘মিঞাঁ’ শব্দটি তার সৃষ্টি নয়, বরং বাংলাদেশি মুসলমানরাই নিজেদের এভাবে পরিচয় দেন।
এদিকে, ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধনে ব্যাপক আপত্তি তোলার ঘটনায় গৌহাটি হাইকোর্টে একটি জনস্বার্থ মামলা দায়ের করা হয়েছে। পাশাপাশি কংগ্রেস, রাইজর দল, আসাম জাতীয় পরিষদ ও সিপিআইএম যৌথভাবে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে। তাদের অভিযোগ, একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে ভোটার তালিকা সংশোধনের অপব্যবহার করা হচ্ছে। আসামের বিরোধী দলনেতা দেবব্রত শইকিয়া বলেন, মুখ্যমন্ত্রীর প্রকাশ্য বক্তব্য নির্বাচন প্রক্রিয়ায় সম্প্রদায়ভিত্তিক হস্তক্ষেপের নজিরবিহীন উদাহরণ।
টিজে/এসএন