রাষ্ট্র পরিচালনায় অভিজ্ঞ দলকে ভোট দেওয়ার আহ্বান ঢাবি সাদা দলের
ছবি: সংগৃহীত
০৬:০৭ পিএম | ০৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশপ্রেমিক, মুক্তিযুদ্ধ এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ধারণকারী সর্বোপরি রাষ্ট্র পরিচালনায় অভিজ্ঞ দলকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দল।
রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির পক্ষ থেকে এই আহ্বান জানানো হয়।
ঢাবি সাদা দলের যুগ্ম আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম লিখিত বক্তব্যে বলেন, আমরা আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি যখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গতিপথ নির্ধারণে সঠিক নেতৃত্ব নির্বাচন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের পর ২৪ এর জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে জনগণ তাদের বহুল প্রতীক্ষিত ভোটাধিকার ফিরে পেয়েছে এবং আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ব্যালটের মাধ্যমে তাদের মতের প্রতিফলন ঘটাবে।
তিনি বলেন, আমাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো- একটি স্থিতিশীল, সমৃদ্ধ, গণতান্ত্রিক ও মর্যাদাপূর্ণ বাংলাদেশ বিনির্মাণ করা। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সেই সুযোগকে অবারিত করে দিয়েছে। আমরা মনে করি, রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব এমন এক দলের হাতে থাকা উচিত যাদের অতীতে রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা রয়েছে এবং একটি দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি আরো বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে, জনগণের ইচ্ছাকে উপেক্ষা করে কোনো শাসনব্যবস্থা টেকসই হতে পারে না। আমরা স্পষ্টভাবে মনে করি, রাষ্ট্র পরিচালনায় ফ্যাসিবাদী প্রবণতা, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকোচন এবং নির্বাচনব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার যে চর্চা তা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থি। একইসঙ্গে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির নামে অসহিষ্ণুতা, নারীবিরোধী মানসিকতা এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামোর সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ যে রাজনৈতিক ধারা- তার বিরুদ্ধেও আমাদের অবস্থান নীতিগতভাবে স্পষ্ট। আমরা বিশ্বাস করি দুটি প্রধান স্তম্ভ বাংলাদেশের মূল ভিত্তি একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান। এই দুই ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রসূত চেতনার সম্মিলনেই গড়ে উঠবে বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ।
অধ্যাপক আব্দুস সালাম বলেন, আমরা একটি উন্নয়ন দর্শনে বিশ্বাস করি। সেই উন্নয়নে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে ন্যায়বিচার ও কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা থাকবে। আমরা সেই রাজনৈতিক শক্তির পক্ষে, দেশের অর্থনীতিকে টেকসই ও মজবুত করতে যাদের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে। কেবল সাময়িক উন্নয়ন নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক মুক্তিই আমাদের লক্ষ্য।
বাংলাদেশের জনসংখ্যার অর্ধেকই নারী। দেশের উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় নারীদের যথাযথ মূল্যায়ন, নিরাপত্তা এবং কর্মক্ষেত্রে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা কেবল সামাজিক প্রয়োজন নয়, বরং অর্থনৈতিক অনিবার্যতায় পরিণত হয়েছে। আমরা সেই শক্তিকে সমর্থন করি যারা নারীদের পূর্ণ সম্মানের সঙ্গে দেশ গড়ার কাজে সম্পৃক্ত করবে। তাদের কাজের জন্য নিরাপদ পরিবেশ ও সম্মানজনক ব্যবস্থা তৈরি করবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতি হতে হবে বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে। কোনো দেশি বা বিদেশি শক্তির ইচ্ছা নয়, বরং জনগণের স্বার্থই হবে রাষ্ট্রনীতির মূল চালিকাশক্তি। অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি, নিরাপত্তা কিংবা সংস্কৃতি সব ক্ষেত্রেই সবার আগে বাংলাদেশ এই নীতিই হওয়া উচিত আমাদের সম্মিলিত অঙ্গীকার। আমরা এমন একটি নেতৃত্বের আহ্বান জানাই যারা জাতীয় স্বার্থকে সবার উপরে রাখবে এবং বিশেষ কোনো দেশ বা শক্তির প্রতি নতজানু না হয়ে সমমর্যাদার ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বজায় রাখবে।
ঢাবি সাদা দলের এই যুগ্ম আহ্বায়ক বলেন, এই প্রেক্ষাপটে আমরা লক্ষ্য করেছি যে, সম্প্রতি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) একটি ৩১ দফাভিত্তিক একটি সুসংগঠিত পরিকল্পনা জাতির সামনে উপস্থাপন করেছে, যা রাষ্ট্রব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কার, নির্বাচনব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং অর্থনৈতিক স্বচ্ছতার প্রশ্নগুলোকে গুরুত্ব দিয়েছে।
পাশাপাশি এই দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান উপস্থাপিত 'আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান' শীর্ষক রাজনৈতিক রোডম্যাপটি ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রপরিচালনায় পরিকল্পনাভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গির একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তাই আমরা মনে করি, একমাত্র বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে দেশের আপামর জনসাধারণ তথা তরুণ প্রজন্মের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে সক্ষম হবে।
অধ্যাপক সালাম আরো বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জাতীয় ঐক্য ও সামাজিক সংহতি পুনর্গঠন। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিভাজন সমাজে অবিশ্বাস, প্রতিহিংসা ও সংঘাতের জন্ম দিয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত যে, বিএনপি বহুদলীয় গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ভিন্নমতের সহাবস্থানের রাজনীতিতে বিশ্বাস করে। বিএনপির রাজনৈতিক দর্শনে রাষ্ট্র কোনো একক মতাদর্শের নয়, বরং সব নাগরিকের। এই অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গিই জাতীয় ঐক্য বিনির্মাণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নির্বাচনী ইশতেহার কেবল ক্ষমতায় যাওয়ার অঙ্গীকার নয়; এটি একটি সংস্কারভিত্তিক রাষ্ট্রচিন্তার রূপরেখা। ইশতেহারে নারী, তরুণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষার মানোন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবায় রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা এবং সামাজিক নিরাপত্তা সম্প্রসারণের বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে যা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠনের প্রতিফলন। আমরা মনে করি, এই নির্বাচনী ইশতেহার ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ বিনির্মাণে একটি বাস্তবসম্মত, গণতান্ত্রিক ও জাতীয় স্বার্থনির্ভর রোডম্যাপ, যা জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, একইসঙ্গে বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সহনশীলতা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাংলাদেশের মুসলমান সমাজ নানামুখী চিন্তা ও ধারায় বিভক্ত। এই বৈচিত্রের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বজায় রাখতে হলে এমন একটি রাজনৈতিক শক্তি প্রয়োজন, যারা ধর্মকে বিভাজনের হাতিয়ার নয়, বরং সামাজিক সম্প্রীতির ভিত্তি হিসেবে দেখে। আমরা মনে করি, এই ভারসাম্যপূর্ণ ও সহনশীল রাজনৈতিক অবস্থান বজায় রাখার সক্ষমতা বিএনপির মধ্যেই বিদ্যমান।
সাদা দলের এই নেতা বলেন, জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নেও আমরা বাস্তববাদী অবস্থান গ্রহণ করি। জাতীয় নিরাপত্তা কেবল সামরিক শক্তির বিষয় নয়; এটি রাজনৈতিক স্থিতি, সামাজিক ঐক্য এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে একটি মধ্যপন্থি, ভূখণ্ডগত জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র গঠনই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ পথ। আমরা কোনোভাবেই চাই না বাংলাদেশ অন্য কোনো যুদ্ধবিধ্বস্ত রাষ্ট্রের পরিণতি বরণ করুক।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিদেশি প্রভাব একটি বাস্তব ও সংবেদনশীল বিষয়। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে আমরা দেখেছি, বিএনপি রাষ্ট্রীয় স্বার্থের প্রশ্নে পরাশক্তির চাপ উপেক্ষা করে স্বাধীন অবস্থান নেওয়ার সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে। একটি আত্মমর্যাদাশীল, স্বাধীন ও আত্মনির্ভরশীল রাষ্ট্র গঠনে এই রাজনৈতিক দৃঢ়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ড. আবদুস সালাম বলেন, দেশবাসীর প্রতি আমাদের আহ্বান- আসুন আমরা সবাই মিলে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের চেতনায় অনুপ্রাণিত হয়ে আমরা একটি গণতান্ত্রিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশ গঠনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করি। জাতীয় ঐক্য, ন্যায়ভিত্তিক উন্নয়ন, নারীর সম্মান ও জনগণের সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে অভিজ্ঞ, পরিকল্পনাভিত্তিক ও জনগণনির্ভর নেতৃত্ব নির্বাচন করি। গণতন্ত্র ও ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের স্বার্থে সচেতন নাগরিক সিদ্ধান্তই পারে দেশকে সঠিক পথে এগিয়ে নিতে। বাংলাদেশের রাজনীতি হোক ভয়মুক্ত, মানবিক ও ভবিষ্যৎমুখী। এই প্রত্যাশা নিয়েই আমরা আমাদের বক্তব্য শেষ করছি।
ঢাবি সাদা দলের সদস্য সচিব অধ্যাপক ড. মহিউদ্দিনের পরিচালনায় সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সাদা দলের যুগ্ম আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. আবুল কালাম সরকার, কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. ছিদ্দিকুর রহমান খান, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো. আলআমিন, কেন্দ্রীয় নেতা অধ্যাপক ড. আবদুর রশিদ, সমাজ বিজ্ঞান অনুষদের যুগ্ম আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. স ম আলী রেজা, অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান, অধ্যাপক ড. এমএ কাউছার, বাণিজ্য অনুষদের অধ্যাপক নাজমুল হাসান, অধ্যাপক ড. আসলাম হোসেন, অধ্যাপক ড. এবিএম শহীদুল ইসলাম, অধ্যাপক ড. আবদুল করিম, অধ্যাপক ড. মো. নূরুল আমিন।
এমআই/টিএ