© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

কিভাবে চায়ের দেশ থেকে কফির দেশে রূপান্তর হলো জাপান?

শেয়ার করুন:
কিভাবে চায়ের দেশ থেকে কফির দেশে রূপান্তর হলো জাপান?

ছবি: সংগৃহীত

মোজো ডেস্ক
০৬:২৮ পিএম | ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
বাংলাদেশের মতো জাপানও একসময় চায়ের দেশ হিসেবে পরিচিত ছিল। তবে আমাদের মতো দুধ-চিনি দেওয়া চা নয় জাপানিরা মূলত হারবাল চা পান করেন। বিশেষ করে খাবারের পরে হজমে সাহায্যের জন্য। অনেক হোটেলে হাতে-ধরা ছাড়াই সিরামিক কাপেই এই চা পরিবেশন করা হয় অতিথিদের, যাতে উষ্ণতা অনুভব করে ধীরে ধীরে মন স্থির করা যায়।

জাপানি চা-অনুষ্ঠান—চানোইউ বা চাদো—একটি ধ্যানমগ্ন প্রক্রিয়া। এখানে আয়োজক অত্যন্ত নিখুঁতভাবে চা প্রস্তুত করেন, উপকরণ পরিষ্কার করেন। তবে আগে মিষ্টান্ন পরিবেশন করেন, তারপর ম্যাচা চা দেন। এই অনুষ্ঠানের মূল ভাবনা হলো পবিত্রতা, সামঞ্জস্য, প্রশান্তি ও পারস্পরিক সম্মান।

অনেক জাপানি ‘সেনসেই’-এর কাছে শিখে একজন ভালো আয়োজক হওয়ার পথে এগোতে থাকেন।

চায়ের দেশ থেকে কফির দেশে
ভাবুন তো—এমন এক সমৃদ্ধ চা-সংস্কৃতির দেশ ধীরে ধীরে কফির দেশে পরিণত হচ্ছে! অবাক লাগছে? তথ্য বলছে তাই। জুলাই ২০২৩-এ প্রকাশিত জাপান টুডে-এর এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, জাপানিরা এখন চায়ের চেয়ে বেশি কফি পান করেন। ২০২১ সালে যেখানে কফি খাওয়া হয়েছে প্রায় ৪৩৩ মিলিয়ন টন, সেখানে চায়ের পরিমাণ ছিল মাত্র ১ লাখ টন।

এই চা-থেকে-কফি যাত্রার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক খাদ্য ও পানীয় সংস্থা নেসলে।

জাপানে চা-পানের শুরু
জাপানের ইতিহাসে চায়ের প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় নারা যুগে (৬৪৬–৭৯৪)। অষ্টম শতকে চীন থেকে সবুজ চা আসে। হেইয়ান যুগে (৭৯৪–১১৮৫) বৌদ্ধ ভিক্ষুরা চীনে পড়াশোনা করে চা-বীজ ও পাতা জাপানে নিয়ে আসেন, যা রাজদরবারে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তখন চা-পাতা শক্ত ব্লকে চাপা হতো এবং চীনের তাং রাজবংশে লেখা লু ইউ-এর গ্রন্থ ‘চা চিং’ (দ্যা ক্লাসিক অব টি) অনুসারে প্রস্তুত করা হতো।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জাপানিরা নিজেদের মতো করে চা চাষ ও প্রস্তুতপ্রণালী উদ্ভাবন করে।

ভিক্ষুরা ‘সুং স্টাইল’-এ চা বানানোর রীতিও নিয়ে আসেন পাতা গুঁড়া করে তাতে গরম পানি ঢেলে পান করা হতো। এটি জাগ্রত থাকতে সাহায্য করত এবং ওষধিগুণও ছিল। এই চা ধীরে ধীরে জাপানি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে আজও তা রয়ে গেছে।

জাপানে প্রবেশের পথে নেসলে
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর আগে ১৯৩৮ সালে নেসলে চালু করে নেসক্যাফে। ১৯৬০-এর দশকে জাপানে নেসক্যাফে আনা হয় বড় প্রত্যাশা নিয়ে। বিজ্ঞাপন, ফ্রি স্যাম্পল, সহজলভ্যতা সবই করা হয়েছিল। তবু চা-প্রেমী জাপানে কফি জায়গা করে নিতে পারেনি। জাপানিরা কফি অপছন্দ করত না—তারা শুধু শতাব্দীপ্রাচীন উষ্ণ, আরোগ্যদায়ী চায়ের সঙ্গে বেশি আবেগীভাবে যুক্ত ছিল। কফি সেই আবেগের জায়গায় পৌঁছাতে পারেনি।

১৯৭৫ সালে নেসলে ফরাসি মনোবিশ্লেষক ক্লোতের রাপাইয়েকে নিয়োগ করে। তিনি খুঁজে পান, শিশুকালেই জাপানিরা উৎসব, পারিবারিক ভোজ, স্কুল-পরবর্তী নাসতার সঙ্গে চায়ের অভিজ্ঞতা পায়। কফির কোনো স্মৃতি নেই।

সমাধান : শিশুদের দিয়ে শুরু করা
নেসলে শিশুদের জন্য কফি-স্বাদের ক্যান্ডি ও চকলেট আনে। এর মধ্যে কিটকাট-ও ছিল। উদ্দেশ্য ছিল ভবিষ্যৎ কফি-পানকারীদের স্বাদে অভ্যস্ত করা। এই শৈশব-স্মৃতিই বড় হয়ে আবেগে পরিণত হয়।

কফি-প্রেমে নতুন জাপান
এক দশক পর নেসক্যাফে আবার কফি পানীয় হিসেবে জোরালোভাবে ফিরে আসে। ফলাফল? কফি-স্বাদের মিষ্টি খেয়ে বড় হওয়া প্রজন্ম দোকানে গিয়ে কফি কিনতে শুরু করে। ২০১৪ সালে জাপান বছরে ৫ লাখ টনের বেশি কফি আমদানি করে। ২০২৩ সালে ভোগ ছিল প্রায় ৪৬৪ হাজার মেট্রিক টন, যা ২০২৮ সালে আরো বাড়বে বলে পূর্বাভাস।

আজ জাপানে কফি শুধু পানীয় নয়—দৈনন্দিন সংস্কৃতি। সুপারমার্কেটে ম্যাচা-ইনফিউজড, ক্যানড, ভ্যানিলা, ক্যারামেল ম্যাকিয়াটো, দারুচিনি, হ্যাজেলনাট—নানারকম কফি পাওয়া যায়।

জাপানের সেভেন-ইলেভেন স্টোরগুলোতেও আছে সাশ্রয়ী, স্বয়ং-পরিসেবা কফি মেশিন। আইসড কফির ক্ষেত্রে তারা ‘ফ্ল্যাশ-চিলিং’ বা ‘ফ্ল্যাশ-ব্রুইং’ নামে বিশেষ কোল্ড-ব্রুইং কৌশল ব্যবহার করে। পর্যটকরা এখন বড় চেইনের পরিবর্তে স্থানীয় স্বাধীন কফিশপ বা ‘কিস্সাতেন’-এ যান খাঁটি জাপানি কফির স্বাদ নিতে।

একটি কৌশলী সিদ্ধান্তই বদলে দিয়েছে জাপানের পানীয় সংস্কৃতি। চায়ের দেশ নীরবে হয়ে উঠেছে কফি-প্রেমিক জাতি।

সূত্র : এনডিটিভি

এমকে/টিএ

মন্তব্য করুন