অস্কারে হ্যাটট্রিকের পথে এমা স্টোন
ছবি: সংগৃহীত
০৮:৫৫ পিএম | ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
অভিনয়শিল্পীদের জন্য বিশ্বমঞ্চে স্বীকৃতির সর্বোচ্চ ত্রয়ী–অস্কার, বাফটা ও গোল্ডেন গ্লোব–এই তিনটিই জিতেছেন এমা স্টোন। ‘লা লা ল্যান্ড’ ও ‘পুওর থিংস’-এ অভিনয়ের জন্য দুবার অস্কারজয়ী এই তারকা এবার দাঁড়িয়ে আছেন ইতিহাসের দোরগোড়ায়। ২০২৬ সালের অস্কারে ‘বুগোনিয়া’ চলচ্চিত্রের জন্য সেরা অভিনেত্রী এবং সেরা ছবি। দুই বিভাগেই মনোনয়ন পেয়ে তিনি সম্ভাব্য হ্যাটট্রিকের আলোচনায়।
অভিনয় ও প্রযোজনা। দুটি ভূমিকাতেই তাঁর উপস্থিতি যেন ঘোষণা করছে, এমা স্টোন এখন কেবল পর্দার চরিত্র নন; বরং গল্প বেছে নেওয়া এবং গল্প নির্মাণেরও এক গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠ। এই জায়গায় পৌঁছানোর গল্প শুরু হয়েছিল অনেক আগেই; এক ছোট্ট মেয়ের জেদের ভেতর দিয়ে।

প্রজেক্ট অব হলিউড: এক কিশোরীর স্বপ্ন
এমার পুরো নাম এমিলি জিন স্টোন। স্কটসডেইল, অ্যারিজোনার এক সাধারণ পরিবারে বড় হওয়া মেয়েটির বয়স তখন মাত্র চার। সেই তখন থেকে মঞ্চে দাঁড়িয়ে অভিনয় করতে ভালোবাসে। ১১ বছর বয়সে তিনি যোগ দেন একটি থিয়েটার দলে। পরিবার চায়নি, তাদের আদরে মেয়েটি অভিনয়ের দিকে পা বাড়াক। তখন এমা যা করলেন, তা আজও হলিউডে এক অনুপ্রেরণার গল্প। তিনি একটি পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন বানালেন। নাম দিলেন ‘প্রজেক্ট অব হলিউড’। সেখানে তিনি বিশদভাবে ব্যাখ্যা করলেন, কেন অভিনয়ই তাঁর স্বপ্ন, কীভাবে তিনি সেটি বাস্তবায়ন করতে চান। এই পরিকল্পিত স্বপ্ন উপস্থাপনেই বাবা-মা রাজি হলেন। তাঁকে পাঠানো হলো লস অ্যাঞ্জেলেসে। যেন এক কিশোরীর কল্পনা ধীরে ধীরে বাস্তবের দিকে হাঁটতে শুরু করল। এমার হলিউডযাত্রা সহজ ছিল না। অডিশনে বারবার বাদ পড়তে হয়েছে।
শৈশবে অতিরিক্ত কান্নার কারণে তাঁর কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিল কর্কশ। চিকিৎসকরা বলেছিলেন, এটি এক ধরনের সমস্যা। সেই কণ্ঠই হয়ে উঠল প্রত্যাখ্যানের কারণ। তাঁকে বলা হয়েছিল ‘এমন কণ্ঠে কাজ হবে না।’ পাশাপাশি তাঁকে বলা হয়েছিল ‘লাল চুলে তুমি আলাদা করে চোখে পড়বে না।’ আজ সেই কর্কশ কণ্ঠই তাঁর সিগনেচার। লালচে চুল তাঁর ব্র্যান্ড। নিজের ব্যর্থতা পরিচয়ের অংশ বানিয়ে নেওয়ার যে শিল্প, এমা তা খুব অল্প বয়সেই আয়ত্ত করেছিলেন।
ছোট চরিত্র থেকে বিশ্বমঞ্চে উত্থান
২০০৭ সালে ‘সুপারব্যাড’ দিয়ে বড়পর্দায় যাত্রা শুরু করেন এমা। চরিত্র ছোট, কিন্তু উপস্থিতি স্মরণীয়। তারপর ‘দ্য হাউস বানি’, ‘জম্বিল্যান্ড’, ‘ক্রেজি, স্টুপিড, লাভ’ একটার পর একটা কমেডি। তাঁর কমিক টাইমিং ছিল নিখুঁত, সংলাপ বলার ধরন আলাদা। প্রকৃত বাঁক আসে ‘ইজি এ’ সিনেমায়। এক জটিল সামাজিক পরিস্থিতির ভেতরে আটকে পড়া এক কিশোরীর চরিত্রে অভিনয় করে তিনি প্রমাণ করেন, তিনি শুধু কমেডির অভিনেত্রী নন। চরিত্রের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বও তিনি অনায়াসে ফুটিয়ে তুলতে পারেন। ‘দ্য অ্যামাজিং স্পাইডারম্যান’ তাঁকে এনে দেয় বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা। গুয়েন স্টেসি চরিত্রে তিনি হয়ে ওঠেন তরুণ প্রজন্মের প্রিয় মুখ। এরপর ‘বার্ডম্যান’। স্যাম থম্পসনের চরিত্রে অভিনয় করে পান প্রথম অস্কার মনোনয়ন। যেন ধীরে ধীরে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন বড় কোনো মুহূর্তের জন্য। সেই মুহূর্ত আসে ২০১৭ সালে। ‘লা লা ল্যান্ড’ সিনেমায় মিয়া চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে। মিয়া নামে এক অভিনেত্রীর চরিত্রে অভিনয় করে জিতে নেন সেরা অভিনেত্রীর অস্কার।
সিনেমার ভেতরের স্বপ্নবাজ মেয়েটি আর বাস্তবের এমা–এই দুইয়ের সীমারেখা যেন মুছে যায়। এরপর ২০২৪ সালে ‘পুওর থিংস’ সিনেমায় বেলা ব্যাক্সটার নামে এক অদ্ভুত, মুক্তমনা, সামাজিক কাঠামোর বাইরে দাঁড়ানো নারীর ভূমিকায় অভিনয় করেন এমা। চরিত্রটি ছিল সাহসী, বিতর্কিত, শারীরিক ও মানসিকভাবে জটিল। এমা কেবল অভিনয় করেননি, চরিত্রটিকে নিজের শরীর-ভাষায় পুনর্নির্মাণ করেছেন। অনেকেই বিস্মিত হয়েছেন তাঁর খোলামেলা দৃশ্যগুলো দেখে। কিন্তু এমার কাছে তা ছিল চরিত্রের সত্যতা রক্ষার অংশ। তিনি বলেছিলেন, ‘বেলার জন্য যা প্রয়োজন, আমি তাই করেছি।’ এই ছবির জন্য দ্বিতীয়বার অস্কার জেতেন তিনি। তখন থেকেই শুরু হয় আলোচনা–এমা কি তাঁর প্রজন্মের সবচেয়ে নির্ভীক অভিনেত্রী?
‘বুগোনিয়া’য় ইতিহাসের সম্ভাবনা
ইয়োর্গোস ল্যান্থিমোস পরিচালিত ‘বুগোনিয়া’ সিনেমাতে এমা শুধু অভিনেত্রী নন, প্রযোজকও। অর্থাৎ গল্প নির্বাচনের ক্ষমতাও এখন তাঁর হাতে। যদি তিনি তৃতীয়বার অস্কার জেতেন, তবে তা কেবল ব্যক্তিগত অর্জন হবে না; বরং আধুনিক হলিউডে নারী শিল্পীদের সৃজনশীল নেতৃত্বের এক শক্ত বার্তা হয়ে উঠবে।
৩৭ বছর বয়সে দাঁড়িয়ে এমা স্টোন দেখিয়েছেন গ্ল্যামার ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু শিল্পের সততা স্থায়ী। একসময় তাঁর হাসি নিয়ে সমালোচনা হয়েছিল। এখন সেই হাসি নিয়ে পরিচালক ডেমিয়েন শ্যাজেল বলেন ‘ওর হাসিতে একসঙ্গে দশটা আবেগ দেখা যায়।’ হলিউডে অনেক তারকা আসে, আলো ছড়ায়, মিলিয়ে যায়। কিছু মানুষ গল্প হয়ে থাকেন। এমা স্টোন এখন সেই গল্পের অংশ। এক কিশোরীর পাওয়ার পয়েন্ট থেকে অস্কারের মঞ্চ পর্যন্ত যাত্রার গল্প। অস্কারের হ্যাটট্রিক হবে কিনা, তা সময় বলবে। কিন্তু এটা বলা যায়–এমা স্টোন ইতোমধ্যেই নিজের অধ্যায় লিখে ফেলেছেন।
পিআর/টিএ