খামেনির শেষ কড়া হুঁশিয়ারি, গোপন অস্ত্র বের করবে ইরান?
ছবি: সংগৃহীত
১০:৫৩ পিএম | ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
সম্প্রতি পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন রণতরী মোতায়েনকে কেন্দ্র করে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির দেওয়া একটি কড়া হুঁশিয়ারি বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন করে শঙ্কার সৃষ্টি করেছে। খামেনির এই বক্তব্যকে আমেরিকার জন্য একটি চূড়ান্ত সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, মার্কিন বিমানবাহী রণতরীগুলো ইরানের জলসীমার কাছাকাছি এলে সেগুলোকে সমুদ্রের তলদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার মতো বিধ্বংসী ক্ষমতা তেহরান অর্জন করেছে।
গত কয়েক দশকে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এমন সরাসরি সামরিক হুমকি খুব কমই দেখা গেছে। খামেনির এই মন্তব্যের পর থেকে আন্তর্জাতিক মহলে জল্পনা শুরু হয়েছে, ইরানের হাতে আসলে এমন কী গোপন অস্ত্র রয়েছে যা দিয়ে তারা আমেরিকার বিশালকার রণতরী বহরকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে।
ইরানের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই জল্পনা-কল্পনা ছিল, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তারা তাদের ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিতে অসামান্য উন্নতি প্রদর্শন করেছে। বিশেষ করে ফাত্তাহ সিরিজের হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র উন্মোচনের পর থেকে পশ্চিমাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। ইরানের দাবি অনুযায়ী, এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো শব্দের চেয়েও কয়েক গুণ বেশি দ্রুতগতিতে চলতে পারে। এগুলো যেকোনো আধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিয়ে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম।
খামেনির বক্তব্যে এই প্রযুক্তির প্রতি ইঙ্গিত ছিল বলেই ধারণা করা হচ্ছে। তিনি বুঝাতে চেয়েছেন, বিশাল আয়তনের মার্কিন রণতরীগুলো বর্তমানে ইরানের জন্য সহজ লক্ষ্যবস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাগরের বিশাল বুক চিরে এগিয়ে চলা এই দানবীয় জাহাজগুলো ইরানের হাইপারসনিক গতিবেগের সামনে কতটা টিকতে পারবে, তা নিয়ে এখন বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
শুধু হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র নয়, ইরান গত কয়েক বছরে তাদের ড্রোন প্রযুক্তিতেও ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। আত্মঘাতী ড্রোন থেকে শুরু করে নজরদারি চালানোর জন্য অত্যন্ত আধুনিক ড্রোন এখন তাদের ভাণ্ডারে রয়েছে। এর বাইরে ইরান তাদের নৌ-প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে একঝাঁক শক্তিশালী আক্রমণাত্মক বোট এবং সাবমেরিন তৈরি করেছে। এগুলো হরমুজ প্রণালীর মতো সংকীর্ণ এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় গেরিলা কায়দায় আক্রমণ চালাতে সক্ষম। খামেনির হুমকি মূলত এই সম্মিলিত শক্তির বহিঃপ্রকাশ। ইরান মনে করে, সরাসরি সম্মুখ সমরে আমেরিকার বিশাল নৌবহরের সাথে টেক্কা দেওয়া কঠিন হলেও, আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন ব্যবহার করে তারা আমেরিকার অহংকার এই রণতরীগুলোকে অচল করে দিতে পারে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র এই হুমকিকে হালকাভাবে নিচ্ছে না। তারা এই অঞ্চলে তাদের সামরিক উপস্থিতি আরও জোরদার করেছে। আমেরিকার দাবি, তাদের বিমানবাহী রণতরীগুলো বিশ্বের সবচেয়ে সুরক্ষিত যুদ্ধজাহাজ এবং এগুলোর চারপাশে থাকা সুরক্ষা বলয় ভেদ করা প্রায় অসম্ভব। তবে সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সময়ে যুদ্ধের কৌশল বদলেছে। অতীতে যা ছিল দুর্ভেদ্য, আধুনিক প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় তা এখন অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সাগরের নীল জলরাশির ওপর মোতায়েন করা এই বিশাল ইস্পাতের জাহাজগুলো যদি সত্যিই কোনো অতর্কিত ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয়, তবে তা বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যে এক বিশাল পরিবর্তন নিয়ে আসবে।
খামেনির এই হুঁশিয়ারি কেবল কথার লড়াই নয়, বরং এক ভয়াবহ সংঘাতের পূর্বাভাস বলে অনেকে মনে করছেন।
এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির প্রভাব কেবল সামরিক খাতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি বিশ্ব অর্থনীতি এবং তেলের বাজারেও বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। পারস্য উপসাগর দিয়ে বিশ্বের সিংহভাগ খনিজ তেল পরিবাহিত হয়, ফলে এখানে কোনো সংঘাত শুরু হলে তার আঁচ লাগবে প্রতিটি মহাদেশে। খামেনির এই হাড়হিম করা বার্তা তাই কেবল আমেরিকার জন্য নয়, সারা বিশ্বের জন্যই গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এমআর/টিকে