ফরহাদ মজহার / ৫ আগস্টে সরকার পতন, বদলায়নি রাষ্ট্রকাঠামো- বিজয় নাকি পরাজয়?
ছবি: সংগৃহীত
১১:৫৩ পিএম | ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার বলেছেন, ২৩ ও ২৪ ফেব্রুয়ারি দেশের একটি গণমাধ্যম- এ প্রকাশিত রাষ্ট্রপতির সাক্ষাৎকার ঘিরে নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি বলেছেন, ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর কিছু শক্তি অসাংবিধানিকভাবে তাঁর পদ চ্যালেঞ্জ করেছিল। তবে তিনি সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছেন এবং রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীলতার হাত থেকে বাঁচিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক দলগুলোর একটি অংশ এবং তিন বাহিনীর পক্ষ থেকেও তিনি সমর্থন পেয়েছেন।
বুধবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে এক পোস্টে তিনি এসব কথা বলেন।
পাঠকের সুবিধার্থে স্ট্যাটাসটি হুবুহু তুলে ধরা হলো- ২৩ ফেব্রুয়ারি ও পরদিন দেশের একটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত রাষ্ট্রপতির সাক্ষাৎকারে তিনি মূলত তিনটি কথা বলেছেন- (১) ৫ আগস্টের গণ-ভ্যুত্থানের পর কিছু শক্তি অসাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপতির পদ চ্যালেঞ্জ করেছিল, (২) তিনি সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছেন এবং (৩) রাজনৈতিক দলগুলোর একটি অংশ সেই ধারাবাহিকতাকে সম্মান জানিয়েছে। এখানেই মূল রাজনৈতিক প্রশ্ন তৈরি হয়।
জুলাই-৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান ছিল বিদ্যমান রাষ্ট্র ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জনগণের বিস্ফোরিত প্রত্যাখ্যান।
মানুষ প্রাণ দিয়েছে, দমন সহ্য করেছে এবং শেষ পর্যন্ত একটি সরকার পতন হয়েছে। সাধারণ মানুষের চোখে এটি ছিল ‘ব্যবস্থা বদলের’ মুহূর্ত। এখন প্রশ্ন হচ্ছে:- জনগণের আত্মত্যাগ কি শুধু সরকার বদলের জন্য ছিল? নাকি ছিল নতুন গঠনতন্ত্র প্রনয়ণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসাবে গঠন করবার ইচ্ছা?
রাষ্ট্রপতির বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, তিনি শুরু থেকেই একটি অবস্থান নিয়েছিলেন- পুরানা সংবিধানের ধারাবাহিকতা ভাঙা যাবে না। অর্থাৎ, গণ-অভ্যুত্থান হলেও পুরানো ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র ব্যবস্থাই অপরিবর্তিত থাকবে এবং তার বৈধতা প্রশ্নাতীত থাকবে।
তিনি নিজেই বলেছেন, তাকে সরানোর চেষ্টা হয়েছিল, কিন্তু তিনি সফলভাবে দায়িত্বে বহাল থেকেছেন এবং সাংবিধানিক প্রক্রিয়া টিকিয়ে রেখেছেন। এর অর্থ দাঁড়ায়- যে মুহূর্তে গণআন্দোলনের ফলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার শীর্ষে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তখন তিনি নিজেকে পুরানা সংবিধান বহাল রাখার ধারাবাহিকতার কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন।
রাষ্ট্রপতির অবস্থান রাজনৈতিক সাহিত্যে ‘সাংবিধানিক প্রতিবিপ্লব’ হিসাবে গণ্য হয়। কথাটি রাজনৈতিক বিশ্লেষণের ভাষা। এর সহজ অর্থ হলো: জনগণ যদি একটি ব্যবস্থাকে প্রত্যাখ্যান করে, কিন্তু সেই ব্যবস্থার আইনগত কাঠামো অক্ষুণ্ণ রেখে আবার নতুন করে ক্ষমতা সাজানো হয়, তাহলে তা বিপ্লবের নৈতিক শক্তিকে সীমিত করে।
রাষ্ট্রপতি নিজেই বলেছেন যে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব তাঁর পাশে ছিলেন , আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তিনি আমামদের দিয়েছেন: “ তিন বাহিনীর পক্ষ থেকে আমাকে সর্বোচ্চ সমর্থন দিয়েছে”।
অর্থাৎ, আন্দোলনের পরে ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব এবং তিন বাহিনীর প্রধান তাঁকে সমর্থন দিয়েছে। এটিকে কেউ দেখবেন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা হিসেবে; আবার কেউ বলবেন- এটি ছিল জনগণের প্রত্যাশিত মৌলিক রূপান্তরের স্পষ্ট বিরোধিতা এবং ঘটনাঘনের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে পু্রানা লু্টেরা ও চরম গণবিরোধী ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা।
সরল ভাষায় বিষয়টি এমন: মানুষ যদি একটি বাড়ি ভেঙে নতুন করে গড়তে চায়, কিন্তু কর্তৃপক্ষ বলে- দেয়ালগুলো ঠিকই আছে, শুধু রং বদলান- তাহলে সেটি কি পুরা বদল? গণঅভ্যুত্থানের পর জনগণের প্রত্যাশা ছিল নতুন গঠনতন্ত্র, নতুন রাষ্ট্রের ভিত্তি নির্মান। কিন্তু রাষ্ট্রপতির অবস্থান ছিল জনগণের অভিপ্রায়ের বিরোধী—পুরোনো সংবিধানের মধ্যেই সমাধান হবে। তিনি এটিকে কৃতিত্ব হিসেবে দেখছেন- পুরানা সংবিধান টিকিয়ে রাখা গেছে, রাষ্ট্র ভেঙে পড়েনি।
রাষ্ট্রপতির সাক্ষাৎকারে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হলো- তিনি জনগণের আন্দোলনকে পরোক্ষভাবে “অস্থিতিশীলতার সম্ভাবনা” হিসেবে দেখছেন, আর সাংবিধানিক ধারাবাহিকতাকে “রক্ষাকবচ” হিসেবে তুলে ধরছেন। এখানেই বিতর্কের কেন্দ্র। গণসার্বভৌমত্ব মানে জনগণের ইচ্ছা সর্বোচ্চ; কিন্তু সাংবিধানিক রাষ্ট্র বলে- ইচ্ছা আইন মেনে চলবে। যখন এই দুইয়ের সংঘাত হয়, তখন যিনি আইনকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন, তিনি বলবেন তিনি স্থিতিশীলতা রক্ষা করছেন; আর যিনি জনগণের ইচ্ছাকে অগ্রাধিকার দেন, তিনি বলবেন আইনকে জনগণের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের সাধারণ পাঠকের জন্য সহজ সত্যটি হলো: ৫ আগস্ট মানুষ রাস্তায় নেমে একটি সরকার সরিয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রব্যবস্থা বদলায়নি। রাষ্ট্রপতি বলেছেন, সেটাই তাঁর সাফল্য। এখন প্রশ্ন- এটি কি জনগণের বিজয়? নাকি পরাজয়?
এসকে/টিকে