© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

ইতিহাসে যার যেখানে স্থান তাঁকে সেটা দিতেই হবে: মোস্তফা সরয়ার ফারুকী

শেয়ার করুন:
ইতিহাসে যার যেখানে স্থান তাঁকে সেটা দিতেই হবে: মোস্তফা সরয়ার ফারুকী

ছবি: সংগৃহীত

মোজো ডেস্ক
০৩:২৫ পিএম | ০৮ মার্চ, ২০২৬
ইতিহাসকে সম্পূর্ণভাবে বোঝার জন্য শুধু স্মরণ নয়, প্রশ্ন তোলা এবং আলোচনাই মূল চাবিকাঠি। ৭ মার্চকে স্মরণ করতে গিয়ে উঠে আসে অনেক প্রশ্ন। চলচ্চিত্র নির্মাতা ও লেখকরা এই ইতিহাসকে প্রশ্ন করার মাধ্যমে দেখাতে চেয়েছেন, কিভাবে স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলো প্রায়শই মিডিয়া ও সাংস্কৃতিক কাঠামোর কারণে অন্ধকারে রয়ে গেছে।

মোস্তফা সরয়ার ফারুকী আজ রবিবার তার ফেসবুক পোস্টে এমনই একগুচ্ছ লেখা শেয়ার করেন যা ইতিহাসে ৭ মার্চ এর গুরুত্ব এবং সমসাময়িক সময়ে এই দিনটিকে ঘিরে জনমানুষের চিন্তাধারা ও ভাবপ্রকাশ সম্পর্কে আলোচনার জন্ম দেয়।

বাংলাদেশ টাইমসের পাঠকদের জন্য তার লেখাটি হুবহু তুলে ধরা হলো: 

ইতিহাসে যার যেখানে স্থান তাঁকে সেটা দিতেই হবে। শেখ মুজিবের ৭ মার্চের ভাষণের প্রশংসা করে এর আগেও আমি লিখেছি। কেউ কেউ এই লেখা দেখিয়েই সাব‍্যস্ত করেছে নিশ্চয় উনি আওয়ামী সমর্থকই হইবেন। এবং প্রশ্ন করেছেন আওয়ামী লীগ সমর্থন করে কেনো হাসিনার পতন চাইলাম?

যেনো সাত মার্চের প্রশংসা করলে জুলাই গণহত্যায় সমর্থন দিতে হবে, গুম-খুন-লুটপাটে সমর্থন দিতে হবে। বাহ!

আমি ফিল্মমেকার। আমি নিজের দল ছাড়া কোনো দল করি না। কোনো দল বা মতের প্রতি চিরস্থায়ী সমর্থনের বন্দোবস্ত আমার কাছ থেকে আশা করা ভুল। কিন্তু যারা আমার ৭ মার্চের প্রশংসা নিয়া লেখালেখি করলো তারা বেমালুম চাপিয়া গেলো- ২০১৪ সালে আমি লিখছিলাম ‘এই চেতনা লইয়া আমরা কি করিবো’। যেখানে বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং বিপরীতে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ কেন্দ্রিক ফ‍্যাসিবাদী রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বিপদ নিয়ে লিখছিলাম।

যখন শাহবাগে ওহি নাজিল হইলো ‘কিন্তু এবং যদি বললেই রাজাকার’, ঐ সময় প্রবন্ধ লিখছিলাম ‘কিন্তু এবং যদির খোঁজে’। আমি বিপ্লবী না। কিন্তু আওয়ামী লীগ বিরোধী সব আন্দোলনেই চেষ্টা করে গেছি শক্তি জোগাতে। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের পররাষ্ট্রনীতি নীতি, গুন্ডাতন্ত্র নিয়ে বহুবার লিখেছি।

কিন্তু যে ভুলটা আমি বা আমার মতো অনেকেই করেছেন সেটা হচ্ছে বাহাত্তর থেকে পঁচাত্তর নিয়ে কোনো কথা না বলা। সাত মার্চ দিয়ে স্বাধীনতার যে একক ইতিহাস রচনায় আমরা সাহায্য করেছিলাম, সেটা দীর্ঘ মেয়াদে এই দেশে এক নিষ্ঠুর ফ‍্যাসিবাদ কায়েমে সাহায্য করেছে।

সাত মার্চ দিয়ে পঁচিশ মার্চ পরবর্তী সময়ে আওয়ামী নেতৃত্বের সিদ্ধান্তহীনতাকে ঢাকা যায় না, জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণাকে ঢাকা যায় না, রক্ষীবাহিনী গঠন করে হাজার হাজার মানুষ খুন ঢাকা যায় না, স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বিহারী-চাকমা-জাসদের উপর বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় মব জায়েজ করা যায় না, যে গণতন্ত্রের সংগ্রাম থেকে স্বাধীনতার সংগ্রাম শুরু হলো বাকশালের নামে সেই গণতন্ত্র হত্যা জায়েজ করা যায় না, সকল পত্রিকা নিষিদ্ধ করা জায়েজ করা যায় না।

ইতিহাস শুধু মাত্র এক ব‍্যক্তি আর এক দল নির্ভর করে ফেলার বিপদ হচ্ছে তখন জাতির সামনে এক বানানো সত‍্য হাজির করা হয়। যার উদ্দেশ্যই ঐ মত বা দলকে বিকল্পহীন প্রমাণ করা। যেটা হাসিনার আমলে আমরা দেখেছি।

চব্বিশ সবচেয়ে বড় যে কাজটা করেছে সেটা হচ্ছে ইতিহাসকে প্রশ্ন করতে শিখিয়েছে। ইতিহাসের বহু অধ্যায় কেনো অন্ধকার করে রাখা হয়েছে সেই প্রশ্নটাই হাজির করছে।

এখনই সময় আমাদের ইতিহাসের সব বিষয় নিয়ে কথা শুরু করার। প্রশ্ন করতে হবে আমাদের সকল ইতিহাস আলোচনা বায়ান্ন থেকে কেনো শুরু করা হয়? সাতচল্লিশ কেনো আসলো এই দেশে? এর প্রেক্ষাপট কি? অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা এবং তার কৃষক প্রজা পার্টি আমাদের মেইনস্ট্রিম ইতিহাস থেকে প্রায় নাই করে দেয়া হলো কেনো? শেরে বাংলার জন্ম বা মৃত্যু দিবস আপনাকে টের পাইতে দেয় আমাদের মিডিয়া?

আমাদের পূর্বপুরুষকে জমিদারী শোষণ থেকে বের করে আনলো যে নায়ক তার উপর লাইট অফ করে রাখলো কে? মওলানা ভাসানী কেনো মধ্যবিত্তের ডার্লিং হয়ে উঠতে পারলো না? এই না পারার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে মিডিয়া এবং কালচারাল ইন্ডাস্ট্রি (যার একজন সদস্য আমি নিজেও) যে ‘মধ্যবিত্ত মন’ তৈরি করেছে তার কোনো ভূমিকা আছে? এই মধ‍্যবিত্ত মন কেনো ইলিয়াস আলী বা সুমন বা সালাহউদ্দিন আহমেদ বা আরমানের গুমে কাঁদে না বা রাস্তায় নামে না?

ভাসানী বা তিতুমির বা আরো অনেকে কি আপনা আপনি আমাদের যৌথ স্মৃতি থেকে প্রায় নাই হয়ে গেলো? আর যদি এটা পরিকল্পিত একটা কাজ হয়, তাহলে কোন উদ্দেশ্য নিয়ে সেটা করা হয়েছে? জিয়াউর রহমানকে সো কলড কালচারাল এলিট এস্টাবলিশমেন্ট (অর্থনৈতিক অর্থে নট নেসেসারিলি) একটা নেতিবাচক চরিত্র হিসাবে আঁকলো কেনো? এই প্রশ্ন সবই উঠে আসতে হবে। আমি কে? আমি কোত্থেকে এখানে আসলাম?

এটা জানার প্রক্রিয়া এক দিনে শেষ হবে না। কিন্তু আমাদের শুরুটা করতে হবে। ফ‍্যাসিবাদ বা হেজেমনি আকাশ থেকে এসে পড়ে না। এর সাংস্কৃতিক ব্লু প্রিন্ট থাকে। এবং আমরা অনেকেই জান্তে বা অজান্তে এই ব্লু প্রিন্টের অংশ হই।

সাত মার্চে স্বাধীনতা আন্দোলনের রাজনৈতিক নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে স্মরণ করতে করতে এইসব কথা মনে আসলো। আরো মনে আসলো সাত মার্চকে সাত মার্চ হিসাবে রাখাই ভালো। এটাকে ২৬ মার্চ করে তোলার চেষ্টা করে লাভ নাই।

এসকে/টিকে

মন্তব্য করুন