দৈনিক ১০০ কোটি ডলারের সামরিক অভিযান এখন ট্রাম্পের গলার কাঁটা: দ্য টেলিগ্রাফ
ছবি: সংগৃহীত
০১:২৯ পিএম | ০৯ মার্চ, ২০২৬
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই এর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর।
প্রতিদিন বিপুল সামরিক ব্যয়, জ্বালানির দামের ঊর্ধ্বগতি এবং জনমতের বিরূপ প্রতিক্রিয়া- সব মিলিয়ে যুদ্ধটি এখন ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য নতুন মাথাব্যথা হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে থাকায় এই যুদ্ধ ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্যও বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।
সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ বলছে, ভার্জিনিয়ার আরলিংটনের উপকণ্ঠে লিবার্টি গ্যাস স্টেশনে গত প্রায় এক সপ্তাহ ধরে জ্বালানির দাম বেড়েই চলেছে। স্টেশনের কাউন্টারের পেছনে বসে থাকা পাম্প কর্মী ৫৬ বছর বয়সী ইয়াম সিতৌলা বলেন, ‘আজ ১০ সেন্ট বেড়েছে, গতকালও ১০ সেন্ট বেড়েছিল’।
হোয়াইট হাউস থেকে কয়েক মাইল পশ্চিমে অবস্থিত এই স্টেশনে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র ইরানে হামলা শুরু করার পর থেকে প্রায় প্রতিদিনই সিতৌলার বস ফোন করে বাইরে থাকা বড় সাইনবোর্ডে জ্বালানির দাম হালনাগাদ করতে বলছেন। সিতৌলা বলেন, ‘অনেক গ্রাহক জিজ্ঞেস করছেন কেন দাম বাড়ছে। আমার বস মনে করেন, আগামী এক সপ্তাহে আরও ১.৫০ ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে।’
গ্যাস স্টেশনে এই আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধিকে অনেকেই বলছেন ‘জাম্প অ্যাট দ্য পাম্পস’, যা সরাসরি ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানবিরোধী যুদ্ধের প্রভাব।
বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবহন হয় হরমুজ প্রণালি দিয়ে। গত সোমবার ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস অতি গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথকে ‘বন্ধ’ ঘোষণা করে। এতইসঙ্গে তারা সতর্ক করেছে যে কোনও জাহাজ এই পথ দিয়ে যেতে চাইলে তা ‘আগুনে পুড়িয়ে দেয়া হবে’।
অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে উপসাগরীয় যুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় সামরিক মোতায়েন করার পর যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদিন বিপুল অর্থ ব্যয় করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মোট ব্যয় প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। এই বিপুল ব্যয় এখন ট্রাম্পের ‘মাগা’ সমর্থকদের একটি অংশের মধ্যেও অসন্তোষ তৈরি করছে। তারা আগে থেকেই ট্রাম্পের ঐতিহ্যগত ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ ও বিচ্ছিন্নতাবাদী নীতি থেকে সরে যাওয়ায় উদ্বিগ্ন।
জনমত জরিপেও দেখা যাচ্ছে, ট্রাম্পের এই যুদ্ধ সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও খুব জনপ্রিয় নয়, বিশেষ করে এমন এক বছরে তো নয়ই যখন মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন তিনি।
এছাড়া বিশ্ববাজারও হোয়াইট হাউসের ওপর চাপ তৈরি করছে। সপ্তাহান্তে ইরানের জ্বালানি স্থাপনায় প্রথমবারের মতো হামলা হওয়ায় তেহরানের আকাশে ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা গেছে এবং বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
ক্যাপিটল হিলের এক্সন গ্যাস স্টেশনের ভেতরে কাউন্টারে থাকা ম্যানেজার প্রস্তুত করা একটি বক্তব্য পড়ে শোনাচ্ছিলেন। তিনি বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে তেলের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফলে তেলের দাম বাড়ছে এবং এর প্রভাব পড়ছে খুচরা জ্বালানির দামেও।’
মনে হচ্ছিল, তিনি পুরো সপ্তাহজুড়ে একই বক্তব্য পড়ে যাচ্ছেন। মূলত যুক্তরাষ্ট্রে বহু দশক ধরেই প্রেসিডেন্টরা জ্বালানির দামকে গুরুত্ব দিয়ে দেখেন। অনেকেই মনে করেন, এটি পুনর্নির্বাচনের সম্ভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
প্লাইমাউথ ইনস্টিটিউট ফর ফ্রি এন্টারপ্রাইজের ভাইস প্রেসিডেন্ট রিচার্ড স্টার্ন বলেন, ‘বারাক ওবামা একবার বলেছিলেন, তার জরিপের ফলাফল কেমন হবে- তা বোঝার সবচেয়ে বড় সূচক ছিল গ্যাসের দাম’। তিনি বলেন, ‘বাস্তবতাও তাই। প্রতিদিনের জনমত অনেক সময় গ্যাসের দামের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ওঠানামা করে। তাই হোয়াইট হাউস কর্মকর্তারা নিশ্চয়ই উদ্বিগ্ন।’
মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে রিপাবলিকানদের মধ্যেও ফিসফাস শোনা যাচ্ছে যে ট্রাম্প বিদেশনীতি নিয়ে এত ব্যস্ত যে অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মনোযোগ কমে যাচ্ছে। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালে তার দ্বিতীয় মেয়াদ তদন্ত, সম্ভাব্য অভিশংসন ও আইন প্রণয়নে অচলাবস্থার মধ্যে পড়তে পারে।
হোয়াইট হাউস ঘনিষ্ঠ এক রিপাবলিকান সূত্র পলিটিকোকে বলেন, ‘ইরানিদের ওপর হামলায় আমার সমস্যা নেই। কিন্তু যুদ্ধ মানে সময়ের ৭৫ শতাংশ সেখানেই চলে যায়, এটা একটা সমস্যা।’
গত বৃহস্পতিবার ট্রাম্পের চিফ অব স্টাফ সুজি ওয়াইলস তার দলকে জ্বালানির দাম, বিশেষ করে গ্যাসোলিনের দাম কমানোর উপায় খুঁজতে বলেন। পলিটিকোর প্রতিবেদনে বলা হয়, কর্মকর্তাদের এখন ‘ভালো কোনো খবর বের করতে চিৎকার করে চাপ দেয়া হচ্ছে’।
প্রশাসন এখন ফেডারেল গ্যাসোলিন কর সাময়িকভাবে বাতিল করার কথাও ভাবছে। বর্তমানে এই কর প্রতি গ্যালনে ১৮.৩ সেন্ট। তবে এটি কার্যকর করতে কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন এবং এতে ভোক্তারা সত্যিই সাশ্রয় পাবেন কি না তা নিশ্চিত নয়।
রিচার্ড স্টার্ন বলেন, ‘মূল্য নিয়ন্ত্রণের মতো পদক্ষেপ ভবিষ্যতে আরও ক্ষতি ডেকে আনতে পারে।’
এছাড়া মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে জ্বালানির দাম গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জরিপে দেখা যাচ্ছে মার্কিন ভোটারদের প্রধান উদ্বেগ এখন জীবনযাত্রার ব্যয়। ওয়াশিংটন পোস্টের জন্য গত মাসে করা এক জরিপে ২৫০০ জনের বেশি মানুষের মধ্যে ৩০ শতাংশেরও কম বলেছেন যে তারা আর্থিকভাবে এগোচ্ছেন। আর ৪৫ শতাংশ বলেছেন খাদ্যের দাম এখন নাগালের বাইরে মনে হচ্ছে।
এমনকি তরুণ ভোটাররাও চাপ অনুভব করছেন। ২২ বছর বয়সী প্যারালিগ্যাল এইডেন মুলিনস বলেন, ‘এখানে আজ দাম ৩.২ ডলার, গত সপ্তাহে ছিল ২.৮। এটা বড় মূল্যবৃদ্ধি’। তার ভাষায়, ‘এটা আমাকে ক্ষুব্ধ করে, কারণ গ্যাসের পেছনে টাকা খরচ করতে ভালো লাগে না।’
ভার্জিনিয়ার ২৫ বছর বয়সী স্টক ম্যানেজার টনি জেলিয়া বলেন, ‘দেখছেনই তো দাম ২ ডলারের বেশি থেকে ৩ ডলারের ওপরে উঠছে। এটা ভালো নয়। কারণ এখন বাজারের খরচ, বিল সবকিছু নিয়েই চিন্তা করতে হয়।’
গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরো জানায়, ফেব্রুয়ারিতে দেশটিতে ৯২ হাজার চাকরি কমেছে, যেখানে অর্থনীতিবিদরা আশা করেছিলেন এটা ৬০ হাজার হতে পারে।
ভার্জিনিয়ার এক গ্যাস স্টেশনে গাড়িতে জ্বালানি ভরতে আসা ৬৫ বছর বয়সী ডগ লিন্ডহোম বলেন, ‘আমি আমেরিকানদের ক্রয়ক্ষমতা নিয়ে উদ্বিগ্ন’। তিনি বলেন, ‘নতুন চাকরির রিপোর্ট দেখেছেন? ৯২ হাজার কমেছে। প্রশ্ন হলো- এর কারণ কী? ট্রাম্পের ব্যর্থ নীতি, নাকি যুদ্ধের অনিশ্চয়তা?’
তার মতে, সম্ভবত দুটোই দায়ী। এরপর তিনি হতাশ হয়ে বলেন, ‘কখনও কখনও বলতে লজ্জা লাগে যে আমি আমেরিকান।’
এনার্জি পলিসি রিসার্চ ফাউন্ডেশনের ফেলো ডায়ানা ফুর্শটগট-রথ বলেন, ‘কেউই বেশি দাম পছন্দ করে না। মাগা আন্দোলনের কেউই করে না, ডেমোক্র্যাটরাও না’। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্টরা বিশেষভাবে উচ্চ জ্বালানি দাম পছন্দ করেন না, কারণ কর্মস্থলে যাওয়ার পথে মানুষ বারবার এই দাম দেখেন।
তবে তার মতে, এই উচ্চ দাম ‘সাময়িক’। তিনি বলেন, ‘ইরানে গণতান্ত্রিক সরকার এলে দাম আবার কমে যাবে’। তবে সবাই এতটা আশাবাদী নন।
কাতারের জ্বালানি মন্ত্রী সাদ শেরিদা আল-কাবি ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেন, সংঘাত চলতে থাকলে কয়েক দিনের মধ্যেই পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল উৎপাদন বন্ধ হয়ে যেতে পারে এবং বিশ্ব অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তার মতে, তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১৫০ ডলারে পৌঁছাতে পারে, যা ট্রাম্পের হামলার আগের দামের দ্বিগুণেরও বেশি।
গ্যাসবাডি অ্যাপের বিশ্লেষক প্যাট্রিক ডি হান বলেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল নিরাপদ করার ব্যবস্থা না নিলে দাম আরও বাড়বে। যুদ্ধের খরচও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। ফোর্বসের হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম চার দিনেই মার্কিন হামলায় ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি খরচ হয়েছে।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ জানায়, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র প্রথম ১০০ ঘণ্টায় প্রায় ৩.৭ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে, অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় ৮৯১ মিলিয়ন ডলার।
এর মধ্যে বেশিরভাগ ব্যয় আগে থেকে বাজেটে ছিল না। অপারেশনাল খরচ প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলার, অস্ত্র প্রতিস্থাপনে ৩ বিলিয়নের বেশি এবং ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো মেরামতে ৩৫০ মিলিয়নের বেশি ডলার লাগছে।
হোয়াইট হাউস কর্মকর্তারা এখন আশা করছেন, যুদ্ধের জন্য হাজার হাজার বিলিয়ন ডলারের বাজেট অনুমোদন চাইতে হবে।
অন্যদিকে যুদ্ধের মানবিক মূল্যও সামনে আসছে। শনিবার রাতে ডেলাওয়্যারে ছয় মার্কিন সেনার মরদেহ তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেন ট্রাম্প। মায়ামিতে লাতিন আমেরিকান নেতাদের এক সম্মেলনে তিনি বলেন, নিহত সেনারা নায়ক, তারা ‘যেভাবে বাড়ি ফিরবেন ভেবেছিলেন, সেভাবে নয়- ভিন্নভাবে ফিরছেন।’
তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে মার্কিন সেনাদের মৃত্যুহার কমিয়ে রাখার প্রতিশ্রুতিও দেন। তবে এই মৃত্যু ট্রাম্পের মাগা সমর্থকদের মধ্যেও ক্ষোভ তৈরি করেছে। সাবেক ফক্স নিউজ উপস্থাপক ও পডকাস্টার মেগিন কেলি বলেন, ‘বিদেশি দেশের জন্য কারও মৃত্যুবরণ করা উচিত নয়।’
তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় না তারা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য মারা গেছেন, তারা ইরান ও ইসরায়েলের জন্য মারা গেছেন।’
এছাড়া পডকাস্টার টাকার কার্লসন ইরানের ওপর হামলাকে ‘ঘৃণ্য ও অনৈতিক’ বলে মন্তব্য করেছেন। জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ম্যাথিউ ড্যালেক বলেন, ট্রাম্পের সমর্থকদের একটি অংশ তার এই বড় সামরিক অভিযানের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
রক্ষণশীল জরিপ সংস্থা অনমেসেজের এক জরিপে দেখা গেছে, ৪৯ শতাংশ আমেরিকান যুদ্ধকে সমর্থন করেন, আর ৪৮ শতাংশ এর বিরোধিতা করেন। একই জরিপে ট্রাম্প সম্পর্কে ৫৪ শতাংশের নেতিবাচক মতামত রয়েছে, আর ইতিবাচক মতামত দিয়েছেন ৪৫ শতাংশ।
ড্যালেকের মতে, সাধারণত যুদ্ধের শুরুতে যে ‘র্যালি অ্যারাউন্ড দ্য ফ্ল্যাগ’ প্রভাব দেখা যায়, অর্থাৎ জনগণ একযোগে সরকারকে সমর্থন করে, এখানে তার কোনও প্রমাণ নেই।
এমন অবস্থায় মেরিল্যান্ডে একটি গ্যাস স্টেশনে গাড়ির লাইন দীর্ঘ হচ্ছে, অনেকেই দাম আরও বাড়ার আগে জ্বালানি মজুত করতে চাইছেন। ৮৪ বছর বয়সী লিন রথবার্গ বহু বছর গাড়ি চালান না। কিন্তু জ্বালানির দাম বাড়ছে শুনে তিনি তার লাল হোন্ডা নিয়ে ট্যাংক ভরতে এসেছেন।
তিনি বলেন, ‘আমাকে সবচেয়ে ভয় দেখাচ্ছে যুদ্ধ আর এত মানুষের মৃত্যু’। তিনি বলেন, ‘আমার খুব বেশি টাকা নেই। তবু আজ ১৮ ডলার দিয়ে ট্যাংক ভরেছি, কারণ দাম আরও অনেক বেড়ে যেতে পারে।’
সংঘাতের শেষ এখনও দেখা যাচ্ছে না। তাই দাম আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অ্যাডভান্সিং আমেরিকান ফ্রিডমের ফেলো অ্যান্ড্রু হেল বলেন, ‘মধ্যবর্তী নির্বাচনের সময় এটা বড় উদ্বেগ হয়ে উঠতে পারে।’
এসকে/টিকে