ইতেকাফের করণীয় ও বর্জনীয়
ছবি: সংগৃহীত
১১:২৪ এএম | ১৫ মার্চ, ২০২৬
ইতেকাফ আরবি শব্দ। যার অর্থ নিজেকে আবদ্ধ করে নেওয়া। পরিভাষায় রমজানের ২০ তারিখ সূর্যাস্তের আগ থেকে ঈদুল ফিতরের চাঁদ দেখা পর্যন্ত কিংবা রমজানের ৩০ তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত পুরুষ মসজিদে এবং নারী বাসার নির্ধারিত নামাজের জায়গায় ইবাদতের উদ্দেশ্যে পাবন্দির সাথে অবস্থান করাকে ইতেকাফ বলে। ফজিলতপূর্ণ এ ইবাদতের প্রচলন রয়েছে পূর্ববর্তী সব নবী-রসুলদের থেকে।
আল্লাহ তায়ালা কোরআন মাজিদেও এর আলোচনা করেছেন। তিনি ইবরাহিম ও ইসমাঈল (আ.)-কে বায়তুল্লাহ নির্মাণের পর তাওয়াফকারী, ইতেকাফকারী এবং নামাজ আদায়কারীদের জন্য তাদের বাইতুল্লাহ পবিত্র পরিচ্ছন্ন রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন,
আমি ইবরাহিম ও ইসমাঈলকে আদেশ করলাম, আমার ঘরকে পবিত্র রাখ তওয়াফকারী, ইতেকাফকারী ও রুকু সেজদাকারীদের জন্য। (সুরা বাকারা, আয়াত : ১২৫)। বুঝা গেল তওয়াফ ও নামাজের মতো ইতেকাফও আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য লাভের বিশেষ মাধ্যম। তিনি দুজন বিশিষ্ট পয়গম্বরকে ইতেকাফকারীদের খেদমত এবং তাদের সম্মানে মসজিদে হারামের পরিচ্ছন্নতা ও খেদমতের নির্দেশ দিয়েছেন।

রমজানের শেষ দশকে ইতেকাফ করা রসুল (সা.)-এর স্বতন্ত্র সুন্নত। এর ফজিলত ও গুরুত্বের জন্য আর কি দরকার যে, নবীজি নিজেই এর অনেক গুরুত্ব দিতেন। আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) বলেন, ‘নবী (সা.) তার মৃত্যু পর্যন্ত রমজানের শেষ দশকে ইতেকাফ করতেন।অতঃপর নবী (সা.)-এর পর নবীজির স্ত্রীগণও ইতেকাফ করছিলেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১১৭২)।
এই ইতেকাফ অবস্থায় স্বতন্ত্র কোনো বিশেষ কিংবা অধিক ফজিলতপূর্ণ আমল নেই। তারপরও রসুল (সা.) হাদিসে ইতেকাফের একটি বিশেষ কারণ হিসেবে শবে কদর অনুসন্ধানের কথা বলেছেন। এজন্য সুন্নত ইতেকাফের সময় রাতের ইবাদতে খুব গুরুত্ব দেওয়া।
আরও পড়ুন: কোরআন-সুন্নাহ ও বিজ্ঞানের আলোকে বিশ্বে একই দিনে রোজা-ঈদ পালন কি সম্ভব?
এছাড়া ইতেকাফের আরও কিছু করণীয় হলো : ১. সুন্নত ইতেকাফে রোজা রাখা। রোজা ছাড়া ইতেকাফই শুদ্ধ হবে না। ২. ইতেকাফরত অবস্থায় পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজ জামাতে তাকবিরে উলার সঙ্গে আদায় করার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া। ৩. তারাবি ও বিতরের নামাজ জামাতের সঙ্গে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যত্ন সহকারে আদায় করা।
৪. খুব বেশি কোরআন তিলাওয়াত, ইস্তেগফার ও দরুদের আমল করা।
৫. জিকির-আজকার, তসবিহ-তাহলিল, বিভিন্ন নফল নামাজ যেমন তাহাজ্জুদ, ইশরাক, চাশত ও সালাতুত তাসবিহ প্রমুখ নফল ইবাদত যত পারা যায় করা। ৬. খুব বেশি দোয়ার আমল করা।
৭. দীন শেখা ও শেখানোর মধ্যে সময় ব্যয় করা।
৮. কাজা নামাজ থাকলে সেগুলো আদায় করা।
৯. আল্লাহর দরবারে পড়ে থেকে গুনাহ মার্জনা করানো এবং ভবিষ্যতে তাঁর সন্তুষ্টি মোতাবেক জীবন পরিচালনার দৃঢ় ইচ্ছা পোষণ করা ইতেকাফের করণীয় যেমন রয়েছে তেমনি রয়েছে কিছু বর্জনীয়। যেমন ১. শুধু রাতদিন চুপ করে বসে না থাকা। চুপ করে থাকা কোনো ইবাদত নয়।২. অনর্থক বেহুদা কথাবার্তা থেকে বিরত থাকা।৩. খুব বেশি প্রয়োজন ছাড়া মোবাইল ফোন ব্যবহার না করা। হামদ-নাত, গজল ও ওয়াজ ইত্যাদি শোনার জন্যও না। ভিডিও দেখা, গেম খেলা এগুলোর তো প্রশ্নই আসে না। তবে এগুলোতে লিপ্ত হলে ইতেকাফ নষ্ট না হলেও ইতেকাফের মাকসাদ ও প্রাণ নষ্ট হয়ে যাবে। ৪. মসজিদে কোনো কিছু বেচাকেনা না করা। ৫. তামাক-জদ্দা, বিড়ি-সিগারেট ইতেকাফে বসে না খাওয়া। ৬. ইতেকাফের জন্য এত পরিমাণ জায়গা না নেওয়া যাতে অন্য ইতেকাফকারী কিংবা মুসল্লিদের কষ্ট হয়।
৭. বিনিময় নিয়ে লেখালেখি করা। ৮. কাপড় সেলাই করা। ৯. টিউশনি করা ইত্যাদি কাজগুলোকে ফোকাহায়ে কেরাম মাকরুহ বলেছেন। মোটকথা, একাগ্রতা নষ্ট হয় এমন কিছুই না করা।
এছাড়া ইতেকাফ একেবারে নষ্ট হয়ে যায় এমন কিছু তো অবশ্যই না করা। যেমন, ১. শরিয়তসম্মত কোনো ওজর ছাড়া মসজিদের বাইরে না যাওয়া। ২. রোজা না রাখা কিংবা রোজা ভেঙে ফেলা।৩. যৌনকার্য করা। ৪. ইতেকাফ অবস্থায় নারীর ঋতুস্রাব হয়ে যাওয়া। ৫. কোনো ওজরে বাইরে গিয়ে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সময় ব্যয় করা। ৬. রোগী দেখতে যাওয়া। ৭. জানাজায় অংশগ্রহণ করা। ৮. ডাক্তার দেখাতে যাওয়া ইত্যাদি কাজগুলো দ্বারা ইতেকাফ নষ্ট হয়ে যায়। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে সঠিকভাবে ইতেকাফ করার তৌফিক দান করুন। আমিন।
লেখক: শিক্ষাসচিব ও সিনিয়র মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুল উলুম বাগে জান্নাত, চাষাড়া, নারায়ণগঞ্জ
পিআরি/টিকে