বিশ্বব্যাপী জ্বালানির আরও মূল্যবৃদ্ধি, শেয়ারবাজার পতন ও বৈশ্বিক মন্দার শঙ্কা
ছবি: সংগৃহীত
০৬:৫৫ পিএম | ১৯ মার্চ, ২০২৬
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাত এবং তেহরানের পাল্টা হামলায় নড়বড়ে হয়ে পড়েছে বৈশ্বিক অর্থনীতি। জ্বালানি বাজার, শেয়ারবাজার ও উৎপাদন খাতে বড় ধাক্কা লেগেছে। বাড়ছে মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কাও। বিষয়টি নিয়ে একটি এক্সপ্লেইনার আর্টিকেল প্রকাশ করেছে আলজাজিরা।
যেখানে তুলে ধরা হয়েছে বর্তমান সংকট এবং সম্ভাব্য আরও নানা শঙ্কা।
জ্বালানি দামে অস্থিরতা:
২৮ ফেব্রুয়ারি হামলা শুরুর পর থেকেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত। ইরান ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় বিভিন্ন স্থানে। এতে উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল স্থাপনা ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলও কমে যায়। এই প্রণালী দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস সরবরাহ হয়।
ফলে তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যায়। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭২ ডলার থেকে বেড়ে ১০৬ ডলারে পৌঁছায়। এলএনজি দামে প্রায় ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি হয়েছে। কাতার এনার্জি উৎপাদন স্থগিত করায় বাজারে চাপ আরও বাড়ে। পেট্রোল, ডিজেল ও জেট ফুয়েলের দামও বাড়ছে।
এশিয়ায় সরবরাহ সংকট:
হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাওয়া তেল ও গ্যাসের বড় অংশই এশিয়ার জন্য। চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল। সরবরাহ কমে যাওয়ায় এসব দেশ বিকল্প উৎস খুঁজছে। এতে খরচ আরও বাড়ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যুদ্ধ দীর্ঘ হলে তেলের দাম ১৩০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। এমনকি গড়ে ১৫০ ডলারও হতে পারে।
উৎপাদন কমার শঙ্কা:
জ্বালানির দাম বাড়ায় অনেক দেশে উৎপাদন কমছে। অন্তত ৮৫টি দেশে পেট্রোলের দাম বেড়েছে। কম্বোডিয়ায় ৬৮ শতাংশ পর্যন্ত দাম বেড়েছে। ভিয়েতনাম, নাইজেরিয়া, লাওস ও কানাডাতেও বড় বৃদ্ধি দেখা গেছে।
খরচ কমাতে বিভিন্ন দেশ পদক্ষেপ নিচ্ছে। পাকিস্তান ও ফিলিপাইনে চার দিনের কর্মসপ্তাহ চালু হয়েছে। থাইল্যান্ডে বাসা থেকে কাজ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। মিয়ানমারে গাড়ি একদিন পরপর চালানোর নিয়ম করা হয়েছে। শ্রীলঙ্কায় জ্বালানি কিনতে অনলাইন নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
এসব পদক্ষেপ উৎপাদনশীলতা কমাচ্ছে। সেবা ও উৎপাদন খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
শেয়ারবাজারে ধস:
যুদ্ধ শুরুর পর বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে বড় পতন হয়েছে। বিশ্বজুড়ে শেয়ারের মূল্য গড়ে ৫.৫ শতাংশ কমেছে। জাপানের নিক্কেই সূচক ১১ শতাংশ কমেছে। ভারতের নিফটি ৫০ সূচক ৭ শতাংশ পড়েছে। লন্ডন ও ইউরোপের বাজারেও পতন দেখা গেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এশিয়ার বাজার বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কারণ তারা জ্বালানির ওপর বেশি নির্ভরশীল। তবে রাশিয়ার শেয়ারবাজার উল্টো বাড়ছে। দেশটি বিকল্প জ্বালানি সরবরাহকারী হওয়ায় লাভবান হচ্ছে।
মুদ্রাস্ফীতি ও মন্দার ঝুঁকি:
দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত হলে বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি বাড়তে পারে। অতীতে তেলের দাম বাড়লে মন্দা দেখা গেছে। ১৯৭৩, ১৯৭৮ ও ২০০৮ সালে এমন ঘটনা ঘটেছিল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উন্নয়নশীল দেশগুলো ঋণ সংকটে পড়তে পারে। সুদের হার বাড়লে ঝুঁকি আরও বাড়বে। ইউরোপ ইতোমধ্যে উচ্চ জ্বালানি দামের চাপে রয়েছে। নতুন এই সংকট পরিস্থিতি আরও খারাপ করতে পারে।
জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে প্রভাব:
যুদ্ধ স্বল্প সময়ে শেষ হলে বড় প্রভাব নাও পড়তে পারে। তবে দীর্ঘ হলে ইউরোপের প্রবৃদ্ধি ০.৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে। চীনের প্রবৃদ্ধিও ৩ শতাংশের নিচে নামতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র তুলনামূলক ভালো অবস্থায় থাকতে পারে। ২০২৬ সালে তাদের প্রবৃদ্ধি ২.২৫ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
ভ্রমণ খাতে ধাক্কা:
যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে বিমান খাতেও। জেট ফুয়েলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ থেকে ২০০ ডলারে পৌঁছেছে। ফলে বিমানের ভাড়া বেড়েছে। অনেক এয়ারলাইন্স ভাড়া বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে।
গালফ অঞ্চলের আকাশপথ আংশিক বন্ধ থাকায় ফ্লাইট ঘুরিয়ে চালানো হচ্ছে। এতে সময় ও খরচ দুটোই বাড়ছে। এতে পর্যটন খাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার শঙ্কা রয়েছে।
সব মিলিয়ে ইরান যুদ্ধ বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দিয়েছে। পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে সংকট আরও গভীর হতে পারে।
এমআর/টিকে