ইরান সংকটের জন্য দায়ী ট্রাম্প: সাবেক সিআইএ প্রধান
ছবি: সংগৃহীত
০৫:৫৬ পিএম | ২২ মার্চ, ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও গোয়েন্দা সংস্থা সেন্ট্রাল ইনটেলিজেন্স এজেন্সি তথা সিআইএর সাবেক পরিচালক লিওন প্যানেটা বলেছেন, ইরানের সঙ্গে তিন সপ্তাহের যুদ্ধের পর প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এক কঠিন পরিস্থিতিতে আটকা পড়েছেন এবং এই পরিস্থিতিতে তিনি বিশ্বকে ‘দুর্বলতার বার্তা’ দিচ্ছেন।
প্যানেটা যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক দুই প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ও বারাক ওবামা প্রশাসনে কাজ করেছেন। তিনি আরও অনেকের মতোই বরাবর ইরানে মার্কিন আগ্রাসনের ব্যাপারে মার্কিন প্রশাসনকে সতর্ক করে এসেছেন।
কিন্তু বিশেষজ্ঞদের এসব সতর্কতা উপেক্ষা করে অবশেষে ইসরাইলের সঙ্গে মিলে ইরানে সামরিক আগ্রাসন শুরু করে ট্রাম্প প্রশাসন। জবাবে ইরানও পাল্টা হামলা শুরু করে। হামলার পাশাপাশি ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তেল-গ্যাস পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালীও বন্ধ করে দেয়।
দ্য গার্ডিয়ানকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন-জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তারা সবসময় জানতেন, ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে জ্বালানি সংকট তৈরি করতে পারে। এখন সেটাই ঘটছে, ফলে ট্রাম্পের সামনে বাস্তবসম্মত কোনো বের হওয়ার পথ নেই।
তিনি বলেন, ‘তিনি (ট্রাম্প) বিষয়গুলো কীভাবে ঘটতে পারে, সে বিষয়ে কিছুটা সরল। তিনি মনে করেন, বারবার কিছু বললে তা সত্যি হয়ে যাবে। কিন্তু এটা শিশুদের আচরণ, প্রেসিডেন্টদের নয়।’
ইরানে ট্রাম্পের এই যুদ্ধ শুরু হয় গত ২৮ ফেব্রুয়ারি। শুরুতে ইসরাইলের আকস্মিক হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি নিহত হন। এরপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের আকাশের নিয়ন্ত্রণে নেয়। কিন্তু সময় যত গেছে, তাদের সেই সুবিধা কমে গেছে।
এ পর্যন্ত ১৩ জন মার্কিন সেনা এবং ইরানে ১৪ শতাধিক বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। খামেনির স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন তার ছেলে মোজতবা খামেনি। যুক্তরাষ্ট্রে তেলের দাম বাড়া, জনপ্রিয়তা কমা এবং রাজনৈতিক জোটে ভাঙনের কারণে ট্রাম্প এই যুদ্ধকে সমর্থনযোগ্য করে তুলতে পারছেন না।
প্যানেটা বলেন, ‘আমরা এক বৃদ্ধ নেতাকে সরালাম, যার সময় জনগণ পরিবর্তনের আশা করছিল। কিন্তু এখন আরও শক্তিশালী, তরুণ ও কঠোর অবস্থানের একজন নেতা এসেছেন। এটি ভালো ফল দেয়নি।’
ইরান পাল্টা হিসেবে হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে, যার মাধ্যমে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবহন হয়। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধাক্কা লেগেছে।
প্যানেটার মতে, এটি ট্রাম্পের নিজের তৈরি সংকট। তিনি বলেন, ‘এটা বোঝা কঠিন কিছু নয়-ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ করলে হরমুজ প্রণালী বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াবে এবং তেলের দাম আকাশচুম্বী হতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, ‘যদি ট্রাম্পের কোনো বের হওয়ার পথ থাকত, তাহলে তিনি বিজয় ঘোষণা করে যুদ্ধ শেষ করতেন। কিন্তু যুদ্ধবিরতি না হলে সেই ঘোষণা অর্থহীন।’
ট্রাম্প বলেছেন, তিনি ইরানে স্থলবাহিনী পাঠাতে চান না, তবে হাজার হাজার মেরিন সেনা মধ্যপ্রাচ্যে পাঠাচ্ছেন। অ্যাক্সিওস-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি ইরানের খার্গ দ্বীপ দখল বা অবরোধের কথাও ভাবছেন।
প্যানেটা বলেন, ট্রাম্পের সামনে দুই পথ-যুদ্ধ বাড়িয়ে হরমুজ প্রণালী খুলে দেয়া, অথবা সরে দাঁড়িয়ে ব্যর্থতা স্বীকার করা। তিনি আরও বলেন, ‘যুদ্ধ পরিকল্পনা করলে মিত্রদের সঙ্গে কথা বলা জরুরি। কিন্তু ট্রাম্প তা করেননি। এখন তিনি সেই মিত্রদের সাহায্য চাইছেন, যাদের সঙ্গে তার সম্পর্ক ভালো ছিল না।’
সাবেক এই গোয়েন্দা কর্মকর্তা কটাক্ষ করে বলেন, ‘এখন তার আগের কাজের ফল তিনি পাচ্ছেন।’ প্যানেটার পরামর্শ, হরমুজ প্রণালী খুলতে সামরিক পদক্ষেপ নেয়া ছাড়া উপায় নেই, যদিও এতে যুদ্ধ আরও বাড়বে এবং প্রাণহানি হবে। তবে এতে যুদ্ধবিরতির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বর্তমানে প্যানেটা ইনস্টিটিউট ফর পাবলিক পলিসি-এর চেয়ারম্যান প্যানেটা বলেন, অন্যথায় এই যুদ্ধ দীর্ঘ হবে, অর্থনৈতিক ক্ষতি বাড়বে এবং বৈশ্বিক মন্দার ঝুঁকি তৈরি হবে। তিনি প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের সমালোচনা করে বলেন, ‘তিনি প্রকৃত প্রতিরক্ষামন্ত্রী নন, বরং ট্রাম্প যা চান তা বাস্তবায়ন করেন।’
হোয়াইট হাউসের সাম্প্রতিক কিছু ভিডিও ও প্রচারণা নিয়েও তিনি সমালোচনা করেন, যেখানে যুদ্ধের ফুটেজের সঙ্গে বিনোদনের দৃশ্য মিলিয়ে দেখানো হয়েছে। প্যানেটা বলেন, ‘এগুলো শক্তির নয়, দুর্বলতার বার্তা দেয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্ব এখন যুক্তরাষ্ট্রকে নেতিবাচকভাবে দেখছে, আর তাই মিত্রদের সমর্থন পাওয়া কঠিন হচ্ছে।’
যুদ্ধের প্রথম দিনে একটি টমাহক মিসাইল ইরানের একটি মেয়েদের স্কুলে আঘাত হানলে অন্তত ১৭৫ জন নিহত হয়, যাদের বেশিরভাগই শিশু। ট্রাম্প এর দায় ইরানের ওপর চাপান। এ নিয়ে পানেটা বলেন, ‘অন্য কোনো প্রেসিডেন্ট হলে ভুল স্বীকার করে দুঃখ প্রকাশ করতেন। কিন্তু তিনি তা করেন না। এতে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’
এমআই/টিকে