‘খালার হোটেল’ নিয়ে হাসনাত আবদুল্লাহর আবেগঘন স্ট্যাটাস ভাইরাল
ছবি: সংগৃহীত
০৯:১৩ পিএম | ২৫ মার্চ, ২০২৬
নিজ এলাকার ‘খালার হোটেলে’ খাবার খাওয়া নিয়ে স্মৃতিচারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগঘন স্ট্যাটাস দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক এবং কুমিল্লা-৪ (দেবিদ্বার) আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। বুধবার (২৫ মার্চ) সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুকে এ নিয়ে স্ট্যাটাস দেন তিনি।
ফেসবুকে দেয়ার এক ঘণ্টার মধ্যেই ছবিসহ দেয়া স্ট্যাটাসটি ভাইরাল হয়েছে। ইতোমধ্যে ৮০ হাজারের বেশি মানুষ স্ট্যাটাসটিতে নানা রিয়েকশন দেয়ার প্রায় সাড়ে ৩ হাজার মানুষ এর মন্তব্যের ঘরে নানা মন্তব্য করেছেন।
স্ট্যাটাসে হাসনাত আবদুল্লাহ লিখেছেন, ছবির এই মানুষটিকে দেবিদ্বারের সবাই ‘খালা’ নামে চেনে, দিবানিশি ভাতের হোটেলের মালিক হলো এই ‘খালা’। খালার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ২০২৫ সালের শুরুতে। ’২৪-এর পর যখন দেবিদ্বারে যাওয়া শুরু করি, তখন নানা কাজকর্মে খাওয়া-দাওয়ার কোনো ঠিকঠাক ছিল না। সকালে বের হতাম, গভীর রাতে বাসায় ফিরতাম, খাওয়ার ফুরসতই মিলত না।
স্ট্যাটাসে তিনি আরও লিখেছেন, ‘একদিন রাতে এক বন্ধু খালার হোটেলের কথা বলল। এত রাতে খোলা থাকবে কি না, এই শঙ্কা নিয়েই গেলাম। গিয়ে দেখি, ‘হোটেল’ নাম হলেও আসলে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অনেক দিনের স্মৃতি বয়ে বেড়ানো এক জীর্ণ চৌচালা ঘর। রাতে খালাকে ডেকে তুললাম। তিনি উঠে আমাদের দেখে পরম যত্নে ভিতরে বসালেন। সেদিন যা বেঁচে ছিল, টমেটো দেয়া ঘন মসুর ডাল, ডিমভাঁজা, তাই খেলাম কিন্তু তৃপ্তিটা ছিল ভরপুর। সেদিন থেকেই দেবিদ্বারে আমার একটা স্থায়ী খাবারের জায়গা হয়ে গেল। এরপর থেকে আমি খালার নিয়মিত মেহমান।’
হাসনাত আবদুল্লাহ আরও লিখেছেন, ‘প্রায়ই আমরা সঙ্গে করে মাংস কিনে নিয়ে যেতাম। বসে বসে তার রান্না দেখতাম। খালা প্রথমে মাংস ধুয়ে ঝরিয়ে নিতেন, আলু কেটে রাখতেন। কড়াইতে তেল গরম হতেই গরম মসলা, তেজপাতা আর পেঁয়াজ কুচি দিয়ে নাড়তেন। পেঁয়াজ লালচে হয়ে এলে এমন গন্ধ উঠত যে বাইরে দাঁড়ানো লোকেরও ক্ষুধা বেড়ে যেত। মাংস কড়াইতে পড়তেই তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধ ছড়িয়ে পড়ত। তিনি ধীরে ধীরে মসলা কষাতেন, খেয়াল রাখতেন যেন না পুড়ে, না কাঁচা থাকে। তার হাতের নাড়ায় একটা তাল ছিল, অভ্যাস আর অভিজ্ঞতার মিশেল।’
স্ট্যাটাসে তিনি আরও লিখেছেন, ‘মসলা কষে এলে আলু দিয়ে আবার নাড়তেন, তারপর পানি দিয়ে ঢেকে দিতেন। ধীরে ধীরে ঝোল ফুটত, উপরে লালচে তেল ভেসে উঠত। তজবি জপার মতো করে দুই আঙ্গুল দিয়ে অতি সন্তর্পণে মাঝে মাঝে ঢাকনা খুলে নুন-মরিচ মিলিয়ে নিতেন। তার চোখে তখন একাগ্রতা, যেন এই রান্নাটাই তার সবকিছু, রান্নাটাই যেন তার ইবাদত। রান্না শেষ হলে একটু ঝোল তুলে স্বাদ নিতেন। মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠত, মাংস নরম, আলুতে ঝোল ঢুকে গেছে, স্বাদ একেবারে মিশে গেছে। মাংসের সঙ্গে আলু ভর্তাও হতো। সেদ্ধ আলু ধীরে ধীরে চটকে, কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ কুচি, সরষের তেল, নুন আর ধনিয়া পাতা দিয়ে মাখতেন। সরষের তেলের ঝাঁজে চারপাশ বদলে যেত। তার আঙুলের ছোঁয়ায় ভর্তা মসৃণ হয়ে উঠত, না বেশি তেল, না কোনো দলা, একদম ঠিক মাপ। মনে হতো, এই সাধারণ ভর্তাতেই যেন তার সমস্ত যত্ন আর অভিজ্ঞতা মিশে আছে।’
স্ট্যাটাসে কুমিল্লা-৪ আসনের এই সংসদ সদস্য আরও লিখেছেন, ‘পাতের পাশে ভর্তা পেলে প্রথম লোকমাতেই চমকে উঠতাম। এত সাধারণ জিনিস এত মজার হতে পারে! এটাকেই বলে হাতের যশ।
খেতে বসার পর আর কথা বলার ফুরসত থাকত না। ভাত, টমেটো দেয়া ঘন মসুর ডাল আর মাংস ভুনার সেই স্বাদ, যেন অনেক দিন পর সত্যিকারের খাবারের স্বাদ পেতাম। খালা দূরে দাঁড়িয়ে শুধু দেখতেন, আর তার কাল গৌড় মুখখানিতে পাকা করমচার মতো হাসি ফুটে উঠত। লোকের তৃপ্তিতেই যেন তার নিজের পরিশ্রম সার্থক হয়ে উঠত।’
স্মৃতিচারণ করে স্ট্যাটাসে হাসনাত আবদুল্লাহ আরও লিখেছেন, ‘নির্বাচনের সময় সবাই যখন টাকা-পয়সা দিচ্ছিল, খালাকে একদিন জিজ্ঞেস করলাম, খালা আপনি আমাকে কী দিবেন? খালা চুপ থাকলেন। কিছুদিন পর গিয়ে দেখি খালা তার হোটেলটাই আমার নির্বাচনের ক্যাম্পেইনে বুথ হিসেবে দিয়ে দিয়েছেন। খালার এই কারবার দেখে সেদিন আমি নিশ্চুপ ছিলাম।’
হাসনাত আবদুল্লাহ আরও লিখেছেন, ‘জেতার পর আজ প্রথম খালার হোটেলে গেলাম। খালা খেতে দিলেন। খালা আগের মতোই ভাত পরিবেশন করলেন, ডাল ঢাললেন, টমেটোর চাসনি দিলেন, ডিম ভেঁজে দিলেন। হাতের সেই একই ছোঁয়া, একই যত্ন। খালার চোখে কোনো বিস্ময় নেই, কোনো বাড়তি আবেগও নয়, শুধু এক ধরনের নিঃশব্দ তৃপ্তি। মনে হলো, আমার এই জয়ের ভেতরেও কোথাও খালার এই চৌচালা ঘরটা ওতোপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে, নীরবে, অদৃশ্যভাবে। খালা ধীরে ধীরে নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। তার চোখে আমার কোনো নতুন পরিচয় নেই, আমি এখনও সেই আগের মানুষ। পোষা বেড়াল যেভাবে কোলে উঠে ওমের মধ্যে মুখ ডুবিয়ে বসে ঠিক সেভাবে আমিও ক্ষুধা নিয়ে এসে তার কাছে বসি, রান্না দেখি, রান্না হলে খাই।’
স্ট্যাটাসে তিনি আরও লিখেছেন, ‘হঠাৎ মনে হলো, এই নিঃশব্দ স্বীকৃতিই হয়তো সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। এখানে কোনো অর্জনের হিসাব নেই, কোনো প্রমাণের প্রয়োজন নেই, আছে শুধু এক ধরনের সহজ গ্রহণ। খালার কাছে আমি কৃতজ্ঞ।’
ইউটি/টিএ