বিশ্বব্যাপী হিলিয়াম সংকট / যুদ্ধের প্রভাবে এমআরআই সেবা বিলম্বিত হবার শঙ্কা
ছবি: সংগৃহীত
০৭:৪৮ পিএম | ২৬ মার্চ, ২০২৬
ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাতের জেরে বৈশ্বিক হিলিয়াম সরবরাহে বড় ধরনের ব্যাঘাত দেখা দিয়েছে। এর প্রভাব পড়তে পারে চিকিৎসা খাতসহ বিভিন্ন উচ্চপ্রযুক্তি শিল্পে। বিশেষ করে এমআরআই স্ক্যান সেবায় বিলম্বের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে একটি এক্সপ্লেইনার আর্টিকেল প্রকাশ করেছে আলজাজিরা।
বিশ্বব্যাপী ব্যবহৃত হিলিয়ামের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সরবরাহ এখন ঝুঁকির মুখে। এর প্রধান কারণ, উপসাগরীয় অঞ্চলে জাহাজ চলাচলে বাধা এবং কাতারের উৎপাদন কমে যাওয়া। হিলিয়াম মূলত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদনের সময় উপজাত হিসেবে পাওয়া যায়। ফলে এলএনজি উৎপাদন ব্যাহত হলে হিলিয়াম সরবরাহও কমে যায়।
২০২৫ সালে কাতার প্রায় ৬৩ মিলিয়ন ঘনমিটার হিলিয়াম উৎপাদন করেছে, যা বৈশ্বিক উৎপাদনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। তবে এই সরবরাহ নির্ভর করে সমুদ্রপথে রপ্তানির ওপর। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রায় সব হিলিয়াম রপ্তানি হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক উত্তেজনার কারণে এই পথে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
ইরানের পক্ষ থেকে প্রণালীতে চলাচলের জন্য নতুন শর্ত আরোপ করা হয়েছে। তাদের অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ চলাচল করতে পারছে না। ফলে সরবরাহ শৃঙ্খল কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।
এদিকে কাতারের জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে হামলার কারণে এলএনজি উৎপাদনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাস লাফান ও মেসাইদ শিল্পাঞ্চলে আঘাতের ফলে উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হয় দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান। এতে কাতারের এলএনজি রপ্তানির প্রায় ১৭ শতাংশ সক্ষমতা কমে গেছে।
এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে হিলিয়াম উৎপাদনে। কাতার জানিয়েছে, তাদের তরল হিলিয়াম রপ্তানি বছরে ১৪ শতাংশ কমবে। আগামী কয়েক বছর এই সংকট অব্যাহত থাকতে পারে।
হিলিয়াম পরিবহনও জটিল। এটি খুবই হালকা গ্যাস, তাই তরল আকারে বিশেষ কন্টেইনারে সংরক্ষণ করা হয়। তবে তরলীকরণের পর ৪৫ দিনের মধ্যে ব্যবহার না করলে তা আবার গ্যাসে পরিণত হয়ে নষ্ট হয়ে যায়। ফলে পরিবহন বিলম্বিত হলে ক্ষতির পরিমাণ বাড়ে।
এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, তাইওয়ান ও চীন। এসব দেশ কাতারের হিলিয়ামের বড় ক্রেতা। যদিও বেশিরভাগ সরবরাহ দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে হয়, তবুও সরবরাহ কমে গেলে বাজারে চাপ বাড়বে।
বিশ্লেষকদের মতে, ৩০ দিনের বিঘ্ন ঘটলে হিলিয়ামের দাম ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। আর ৬০ থেকে ৯০ দিনের সংকটে দাম ২৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
হিলিয়াম কেন এত গুরুত্বপূর্ণ:
এর উত্তর লুকিয়ে আছে হিলিয়ামের বৈশিষ্ট্যে। এটি অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রায় তরল থাকে। প্রায় শূন্য কেলভিনের কাছাকাছি তাপমাত্রায়ও এটি স্থিতিশীল। এছাড়া এটি নিষ্ক্রিয় গ্যাস, অর্থাৎ অন্য কোনো পদার্থের সঙ্গে বিক্রিয়া করে না।
এই কারণেই এমআরআই মেশিনে ব্যবহৃত সুপারকন্ডাক্টিং ম্যাগনেট ঠান্ডা রাখতে হিলিয়াম অপরিহার্য। এটি ছাড়া শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি সম্ভব নয়, যা শরীরের অভ্যন্তরের স্পষ্ট ছবি তৈরি করতে প্রয়োজন।
বিশ্বে ব্যবহৃত মোট হিলিয়ামের প্রায় এক-চতুর্থাংশই এমআরআই মেশিনে ব্যবহৃত হয়। ফলে সরবরাহ কমে গেলে চিকিৎসা খাতে বড় প্রভাব পড়তে পারে। এছাড়া সেমিকন্ডাক্টর শিল্পেও হিলিয়াম অপরিহার্য। স্মার্টফোন, গাড়ি, ডেটা সেন্টারসহ আধুনিক প্রযুক্তির প্রায় সব ক্ষেত্রেই এর ব্যবহার রয়েছে।
হিলিয়ামের বিকল্প এখনও কার্যকরভাবে তৈরি হয়নি। যদিও কিছু গবেষণায় হিলিয়ামবিহীন এমআরআই প্রযুক্তি ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে, তা এখনো ব্যাপকভাবে ব্যবহারযোগ্য হয়নি।
বিশ্বে এর আগে ২০০৬ সালের পর থেকে একাধিকবার হিলিয়াম সংকট দেখা গেছে। বর্তমান পরিস্থিতি সেই ধারাবাহিকতার পঞ্চম বড় সংকট হিসেবে দেখা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় হিলিয়াম উৎপাদক। তবে তারাও উপসাগরীয় অঞ্চলের সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। ইতোমধ্যে বড় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সরবরাহ কমানোর ঘোষণা দিয়েছে।
সব মিলিয়ে, চলমান সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে চিকিৎসা, প্রযুক্তি ও শিল্প খাতে এর প্রভাব আরও গভীর হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে এমআরআইসহ গুরুত্বপূর্ণ সেবায় বিলম্ব অনিবার্য হয়ে উঠবে।
এসএস/এসএন