চিফ প্রসিকিউটর / ১/১১-তে মানবতাবিরোধী অপরাধ ঘটলে তদন্ত করবে ট্রাইব্যুনাল
ছবি: সংগৃহীত
০৯:২৫ এএম | ০১ এপ্রিল, ২০২৬
এক–এগারোর সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে যাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে, স্বপ্রণোদিতভাবে তা ট্রাইব্যুনাল (তদন্ত সংস্থা) তদন্ত করবে বলে জানিয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, যদি সাক্ষ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়, ট্রাইব্যুনালে বিচারের সম্মুখীন করা হবে।
গতকাল মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন চিফ প্রসিকিউটর।
আমরা এক কথায় কি বলতে পারব যে ক্রসফায়ারের সব ঘটনা ট্রাইব্যুনাল তদন্ত করবে।
যেটা এখানে বিচার হওয়ার মতো সেখানে হবে, বাকিটা অন্য…, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে জবাবে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘যেসব ক্রসফায়ারের ঘটনা ঘটেছে...বৈষম্যবিরোধী–সংক্রান্ত যে মামলাগুলো হয়েছে, ইভেন দেন (এমনকি) এক–এগারোর সময় যেসব মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনা ঘটেছে; সেগুলো যদি আমাদের এই ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ারভুক্ত হয়, সেগুলো আমরা তুলে নিয়ে আসব।’
এক–এগারোর একজন কুশীলব বরখাস্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. আফজাল নাছের, তাকে কি ট্রাইব্যুনালে কোনো মামলায় আনা হবে? আরেক সাংবাদিকের এমন প্রশ্নে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, এক–এগারোর সময় বা মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে যাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে, ট্রাইব্যুনাল সুয়োমোটো (স্বপ্রণোদিত) সেগুলো ইনভেস্টিগেশন (তদন্ত) করবে। যদি সাক্ষ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়, ট্রাইব্যুনালে বিচারের সম্মুখীন করা হবে।
২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সেনা হস্তক্ষেপে দেশে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়।
তখন রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ একই সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টারও দায়িত্বে ছিলেন। তাকে প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। এরপর সেনা–সমর্থিত নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়, যা এক–এগারো (১/১১) নামে পরিচিত।
এক-এগারোর পটপরিবর্তনের প্রধান উদ্যোক্তা বা মূল কুশীলব হিসেবে মনে করা হয় লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে।
তাকে ২৩ মার্চ গভীর রাতে গ্রেপ্তার করে ডিবি। অন্যদিকে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সাবেক মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদকে গত ২৫ মার্চ রাতে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে দুজনকেই ট্রাইব্যুনালে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের পৃথক দুই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
ক্রসফায়ারের মামলার তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে
সারা দেশে যত ক্রসফায়ারের ঘটনা ঘটেছে, সব মামলার কপি ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা সংগ্রহ করছে বলেও জানান চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, ক্রসফায়ারের যে মামলাগুলো হয়েছে, সেগুলো তাঁরা যাচাই-বাছাই করবেন।
এ জন্য একটা কমিটি গঠন করা হবে।
যাচাই-বাছাইয়ের পর ক্রসফায়ারের অপরাধগুলোর মধ্যে যেগুলো ট্রাইবুনালের বিচারের আওতাভুক্ত হবে, সেসব বিচার ট্রাইবুনালে করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান চিফ প্রসিকিউটর।
শাপলা চত্বরের মামলায় জলিল মণ্ডল কারাগারে
২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় পুলিশের সাবেক উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) আবদুল জলিল মণ্ডলকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। গতকাল দুপুরে তাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১–এ হাজির করা হয়। পরে প্রসিকিউশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল।
এই মামলায় গত বছরের ১৪ মে জলিল মণ্ডলের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিলেন ট্রাইব্যুনাল। আর গত সোমবার সন্ধ্যায় রাজধানীর সবুজবাগ এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
এ মামলার বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর সাংবাদিকদের বলেন, শাপলা চত্বরে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় করা মামলার তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে। তার (জলিল মণ্ডল) সার্বিক পরিকল্পনাতেই (শাপলা চত্বরে) সব ঘটনা ঘটেছে—এ রকম তদন্তে আসছে। এই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন খুব তাড়াতাড়ি যেন জমা হয়, সে বিষয়ে তারা তৎপর আছেন।
শাপলা চত্বরে হেফাজতের সমাবেশে কত মানুষ মারা গেছে—এ–সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘মৃত ব্যক্তিদের তালিকাও আমরা অলমোস্ট পেয়েছি। এবং...আমরা অনুসন্ধান করছি, আরও আছে কি না। পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট আপনারা ইনশা আল্লাহ পেয়ে যাবেন, আগামী তারিখের (৫ এপ্রিল এ মামলার পরবর্তী দিন ধার্য আছে) মধ্যে।’
সেই তালিকায় কতজনের তথ্য (হত্যার শিকার) আছে, এমন প্রশ্নে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘১৫-২০ জন হতে পারে।’
‘৫ আগস্টের পর করা মামলা যাচাই–বাছাই করা হবে’
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সারা দেশে যত মামলা হয়েছে, তা যাচাই–বাছাই করা হবে বলে জানান চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থাকে নির্দেশ দিয়ে তিনি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের পর সারা দেশে যত মামলা হয়েছে, সবগুলোর তথ্য চেয়েছেন। তার কাছে ইতিমধ্যে পাঁচ–সাত শ মামলার কপি গত সোমবার জমা হয়েছে। তিনি আশা করছেন, এক–দুই দিনের মধ্যে সারা দেশের এসব মামলার কপি তার কাছে আসবে। এগুলো একটি টিম যাচাই–বাছাই করবে।
সব মামলা তারা যাচাই–বাছাই করে দেখবেন।
তিনি আরো বলেন, সারা দেশে যে মামলাগুলো হচ্ছে, যেগুলো আসলে ইন ফ্যাক্ট আমাদের এই ট্রাইব্যুনালের আওতাধীন অপরাধ; সেখানে একেকটা মামলায় হয়তো ৪০০ থেকে ৫০০ আসামি হচ্ছে। সব আসামি দোষী—এটা আমরা কিন্তু মনে করি না। আমরা মনে করি যে এর মধ্যে দোষী ব্যক্তি যেমন আছে, অনেক নিরপরাধ মানুষও আছে।…অনেক সময় যারা প্রকৃত দোষী, তাদের ছেড়ে দিচ্ছে। আবার অনেক নিরাপরাধ মানুষ জেল খাটতেছে।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, আমরা নজর রাখব যে, সারা দেশের যেসব থানায় মামলাগুলো হচ্ছে, সেখানে যাতে কোনো দোষী ব্যক্তি ছাড়া না পেয়ে যায়। কোনো নির্দোষ মানুষও যেন অহেতুক জেলে না যায়। বিষয়টিকে কেন্দ্র করে যাতে কোনো বিশেষ মহল মামলা বাণিজ্যের নামে যে ব্যবসা, এটা না করতে পারে। যদি কেউ হয়রানি করার জন্য মিথ্যা মামলা করে, তাহলে প্রচলিত আইনে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সুপারিশ করব।
শত শত ক্রসফায়ারের ঘটনা আছে। প্রতিটা ক্রসফায়ারের কাহিনি মোটামুটি একই রকম। তাহলে যত ক্রসফায়ার আগে হয়েছে, সব কটির বিচার ট্রাইবুনালে হওয়া সম্ভব? সাংবাদিকের এমন প্রশ্নে জবাবে তিনি বলেন, একটি ‘কমন ডিজাইনে’ সারা বাংলাদেশে এই ক্রসফায়ারের মতো অমানবিক কর্মকাণ্ড করেছে তৎকালীন সরকার। সেই সরকারের মতের সঙ্গে অমিল হলে বা স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে মতের অমিল হলে তারা পুলিশকে ব্যবহার করেছেন। পুলিশ আবার তাদের সহযোগী হয়েছে। পুলিশ ভুক্তভোগীদের ক্রসফায়ার দিয়ে হত্যা করে মিথ্যা গল্প জাতির সামনে উপস্থাপন করেছে।
আমিনুল ইসলাম বলেন, প্রতিটা ক্রসফায়ারের একই রকম গল্প। এটা অবশ্যই সিস্টেমেটিক ক্রাইম (পরিকল্পিত অপরাধ) এবং একটি ওয়াইড স্প্রেড অ্যাটাক (ব্যাপক মাত্রায় আক্রমণ)। এটা মানবতাবিরোধী অপরাধের আওতাভুক্ত অপরাধ।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ইতিমধ্যে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থাকে নির্দেশ দিয়ে সারা দেশে যতগুলো ক্রসফায়ারের ঘটনা ঘটেছে, সব কটি মামলার কপি আমরা সংগ্রহ করছি। যে মামলাগুলো হয়েছে, সেগুলো যাচাই–বাছাই করা হবে। এ বিষয়ে একটি কমিটিও গঠন করা হবে। যাচাই–বাছাই করে ক্রসফায়ারের অপরাধগুলোর মধ্যে যেগুলো ট্রাইব্যুনালের বিচারের আওতাভুক্ত হবে, সেসব মামলার বিচারের ব্যবস্থা ট্রাইব্যুনালে করা হবে।
হাসানাত আবদুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিল
বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলা ছাত্রদল ও জাসাসের দুজন নেতাকে ২০১৫ সালে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় সাবেক সংসদ সদস্য আবুল হাসানাত আবদুল্লাহসহ চার আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে। হাসানাত আবদুল্লাহ হলেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাই।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ গতকাল এই অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন (রাষ্ট্রপক্ষ)।
বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার ভুক্তভোগী দুজন হলেন আগৈলঝাড়া উপজেলা ছাত্রদলের তৎকালীন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক টিপু হাওলাদার এবং একই উপজেলার জাসাসেন সাংগঠনিক সম্পাদক কবির মোল্লা।
টিজে/এসএন