আজ ২ এপ্রিল, কেরানীগঞ্জ গণহত্যা দিবস
ছবি: সংগৃহীত
০৫:৫০ এএম | ০২ এপ্রিল, ২০২৬
আজ বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) কেরানীগঞ্জে গণহত্যা দিবস। ১৯৭১- এর এইদিনে ২৫ মার্চ রাতে ঢাকা শহরের নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালানোর পরে পাকহানাদার বাহিনী দ্বিতীয় হামলা (২ এপ্রিল) চালায় কেরানীগঞ্জে। সে হামলায় প্রায় ৫ হাজার নিরীহ, নিরস্ত্র ও ঘুমন্ত মানুষকে গুলি করে ও বেয়নেট দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে পাক হানাদার বাহিনী। কেরানীগঞ্জবাসীর জন্য এটি একটি ভয়াবহ স্মৃতি বিজড়িত দিন।
দিবসটি উপলক্ষে কেরানীগঞ্জের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান উপজেলা প্রশাসন, কেরানীগঞ্জ প্রেস ক্লাবসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নানা কর্মসূচি পালন করে আসছে। ২ এপ্রিলের প্রথম প্রহরে স্থানীয় মন্যু ব্যাপারীর ঢাল এলাকার স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের মাধ্যমে দিনের কর্মসূচি শুরু হয় কেরানীগঞ্জবাসীর।
ঢাকা শহরের নিকটবর্তী বুড়িগঙ্গা নদীর তীরঘেষে কেরানীগঞ্জ উপজেলার অবস্থান। ঢাকা শহরের অতি নিকটবর্তী হওয়ার কারণে কেরানীগঞ্জ ছিল একাত্তরে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়স্থল।
ঢাকা শহরের আতঙ্কিত নিরস্ত্র-নিরীহ লোকজন নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে দলে দলে কেরানীগঞ্জে আসতে শুরু করেন। এ বিষয়টি আঁচ করতে পেরেই ২৫ মার্চের কালো রাতের পর ২ এপ্রিল কাক ডাকা ভোরে পাকবাহিনী দ্বিতীয় হামলা চালায় কেরানীগঞ্জের নিরীহ, ঘুমন্ত মানুষের উপর। সে হামলায় নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধাসহ প্রায় ৫ হাজার মানুষকে হত্যা হয়েছে বলে এলাকাবাসী জানান।
এলাকাবাসীর দাবি, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর একাধিকবার মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতার ৫০ বছর পেরিয়ে গেলেও ২ এপ্রিল পাক হানাদারদের হাতে কেরানীগঞ্জের শহীদদের তালিকা করেনি কোনো সরকার বা সামাজিক প্রতিষ্ঠান। কেরানীগঞ্জের এ দিবসটিকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় পালনের জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি করেছেন এলাকাবাসী ও শহীদ পরিবার।
২ এপ্রিলে পাকহানাদার বাহিনীর হাতে কেরানীগঞ্জের যেসব নিরীহ লোক শহীদ হয়েছেন সেসব শহীদদের পরিবার খেয়ে না খেয়ে অর্ধাহারে অনাহারে কীভাবে বেঁচে আছে তার খোঁজ-খবর কেউ নেয়নি। এমনই একটি পরিবার নজরগঞ্জের সর্দারবাড়ি। সেদিন পরিবারের অন্যসব সদস্যের সামনেই হানাদার বাহিনী ৩ সহোদর আফজালুল হক, এরফানুল হক, ফায়েকুল হক ও চাচাত ভাই তৎকালীন ফুড ইন্সপেক্টর ওবায়দুল হককে ঘর থেকে টেনেহিঁচড়ে বাড়ির উঠানে নিয়ে চেয়ারে বসিয়ে গুলি করে। এরপর বন্দুকের ব্যানেড দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা নিশ্চিত করা হয়।
এসকে/টিএ
সূত্রে জানা যায়, দেশ স্বাধীনের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বেঁচে থাকাকালীন সময়ে ২ হাজার টাকা করে অনুদান দিয়েছিলেন এসব শহীদ পরিবারকে। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের পর থেকে সে অনুদানও বন্ধ হয়ে যায়। এরপর আর কোনো সরকার বা সামাজিক সংগঠন এসব পরিবারের প্রতি কোনো রকম সাহায্য সহযোগিতার হাত বাড়ায়নি।
কেরানীগঞ্জ উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার মো. শাহজাহান বলেন, ৭১-এর ২ এপ্রিলের ঘটনায় নির্মমতায় পাথর হয়ে গিয়েছিল সাধারণ মানুষ। সেদিন মানুষের কান্নায় কেরানীগঞ্জের আকাশ বাতাস ভারি হয়ে উঠেছিল। আশপাশের কবরস্থানগুলোতে গর্ত খুঁড়ে একই কবরে ১০/১২টি করে লাশ দাফন করতে হয়েছিল। শুধু নজরগঞ্জ কবরস্থানের একটি কবরেই কেরানীগঞ্জে আশ্রয় নিতে আসা নাম না জানা ৫৪ জনকে দাফন করা হয়েছিল।
তিনি আরো বলেন, সে রাতে পাক সেনাদের অতর্কিত গুলির প্রচণ্ড শব্দে ঘুম ভেঙে যায়। খোঁজ-খবর নিয়ে জানতে পারি, পাক সেনারা ঘুমন্ত কেরানীগঞ্জবাসীর উপর অতর্কিত গুলি চালিয়ে নির্বিচারে মানুষ হত্যা ও ঘরবাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। এই হামলার ১০ দিন পরও অনেক জায়গা থেকে আগুনের উত্তাপ উঠছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সেদিনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যান কেরানীগঞ্জে আশ্রয় নেওয়া শাজাহান সিরাজ, নুরে আলম সিদ্দিকীসহ আরো অনেক নেতাকর্মী। সেদিনের সে নির্মম হত্যাকাণ্ডে, জিনজিরা, মন্যু বেপারীর ঢাল, নজরগঞ্জ, গোলজারবাগ, মান্দাইল, কুশিয়ারবাগ, বড়িশুর, মাদারীপুর এলাকা লাশের স্তূপে পরিণত হয়েছিল।
এ ব্যাপারে কেরানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ উমর ফারুক বলেন, দিবসটি উপলক্ষে প্রথম প্রহরে উপজেলা পরিষদের পক্ষ থেকে জিনজিরা মন্যু বেপারীর ঢাল এলাকায় স্মৃতি স্তম্ভে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করা হবে। পরে উপজেলা পরিষদ মিলনায়তন আলোচনা সভার আয়োজন করা হবে। এ ছাড়া ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে উপজেলার মসজিদ, মাদরাসাগুলোতে শহীদদের জন্য দোয়া প্রার্থনার আয়োজন করার কথা হয়েছে।