© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র শান্তি আলোচনায় ঝুঁকি নিয়েও কেন মধ্যস্থতার চেষ্টায় পাকিস্তান?

শেয়ার করুন:
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র শান্তি আলোচনায় ঝুঁকি নিয়েও কেন মধ্যস্থতার চেষ্টায় পাকিস্তান?

ছবি: সংগৃহীত

মোজো ডেস্ক
১০:২৩ এএম | ০৩ এপ্রিল, ২০২৬
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল আক্রমণ শুরু করার পর থেকে গেল এক মাসে, দ্রুত তীব্রতর হওয়া এই সংঘাতে অন্তত নয়টি দেশে কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। প্রতিদিনই এই যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিকে বিলিয়ন ডলারের ক্ষতির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। বিশ্ব এখন একটি বড় ধরনের জ্বালানি সংকটেরও মুখোমুখি। আর এই যুদ্ধের ব্যাপ্তি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সংঘাত শুরুর পর সৌদি আরবের পাশাপাশি জিসিসি’র সদস্য দেশ কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ওমানের ওপর ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। তবে এখন পর্যন্ত এই দেশগুলোর কেউই তেহরানের বিরুদ্ধে পাল্টা হামলা চালায়নি।

একসময় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদে থাকা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ সাঈদ বলেছেন, ‘সৌদি আরব অত্যন্ত ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছে।’

তার ভাষ্য, 'সৌদি আরব যদি সামরিকভাবে প্রতিক্রিয়া জানায়, তারা একা থাকবে না। তাহলে পুরো অঞ্চলই আগুনে জ্বলে উঠবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, 'সৌদি আরবের সরাসরি এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া শুধু উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর জন্যই নয়, এর প্রভাব আরও বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হবে।' 

২০২৫ সালে, সৌদি ও পাকিস্তান একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে। সম্প্রতি ইসলামাবাদে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী তার মিত্রের ‘উল্লেখযোগ্য সংযম’- এর জন্য ধন্যবাদ জানান। তিনি আরও আশ্বস্ত করেন, ‘পাকিস্তান সবসময় সৌদি আরবের পাশে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়াবে।’

পরোক্ষভাবে এর অর্থ হলো, ইরান যদি সৌদি আরবকে ‘অতিরিক্ত চাপের মধ্যে’ ফেলে, তাহলে পারমাণবিক অস্ত্রধারী প্রতিবেশী পাকিস্তানকে তা রিয়াদের পক্ষে দাঁড়াতে বাধ্য করতে পারে।
তবে পাকিস্তান কোনো যুদ্ধে জড়াতে আগ্রহী নয় বলেই জানিয়ে আসছেন দেশটির নেতারা।

এক বছরেরও কম সময় আগে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারত ও পাকিস্তান চার দিনের সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছিল। একইসঙ্গে, আফগানিস্তানের সীমান্তে তালেবানের সঙ্গে কয়েক মাস ধরে সংঘর্ষে লিপ্ত রয়েছে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী। এমন পরিস্থিতিতে সংঘাত প্রশমনে পাকিস্তানের যথেষ্ট আগ্রহ রয়েছে। অন্যদিকে প্রতিবেশী বিভিন্ন দেশে হামলা চালানোর পর, ওই অঞ্চলে ইরানের বন্ধুও খুব বেশি অবশিষ্ট নেই।

ওয়াশিংটনের মিডল ইস্ট পলিসি কাউন্সিলের সিনিয়র রেসিডেন্ট ফেলো কামরান বোখারি বলেন, 'কৌশলগত পরিমণ্ডলে (ইরানের) সবচেয়ে কম সমস্যাযুক্ত সম্পর্কটি পাকিস্তানের সঙ্গে। অন্য কোনো চ্যানেল নেই।'

পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের ভাষায়, 'বর্তমান সংঘাত যে আরও ‘মৃত্যু ও ধ্বংস’ ডেকে আনবে- এই উপলব্ধিই তুরস্ক, সৌদি আরব ও মিশরের শীর্ষ কূটনীতিকদের ইসলামাবাদে তার সঙ্গে সংকটকালীন বৈঠকে বসতে উদ্বুদ্ধ করেছে। সেই আলোচনার পর, দার জানান যে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনা হতে পারে।'

তিনি বলেন, ‘ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ই আলোচনার আয়োজন করতে পাকিস্তানের প্রতি আস্থা প্রকাশ করেছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই এমন বৈঠক সম্ভব হতে পারে।’

এক বিবৃতিতে ইসহাক দার চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই- এর সঙ্গে তার সাম্প্রতিক কথোপকথনের বিষয়টিও উল্লেখ করেন। বলেন, ‘ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা আয়োজনে পাকিস্তানের উদ্যোগে চীনের পূর্ণ সমর্থন আছে।’

মিশরের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকের সময় পড়ে গিয়ে কাঁধে হালকা চোট পেলেও, পাকিস্তানি এই কূটনীতিক মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) আলোচনার জন্য চীন সফরে যান। তবে পাকিস্তানের এই সংকটকালীন কূটনীতি আরও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

গত সপ্তাহান্তে, ইরান-সমর্থিত হুতিরা সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে এবং এই দফার লড়াইয়ে প্রথমবারের মতো ইসরাইলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে, যা আঞ্চলিক যুদ্ধকে আরও বিস্তৃত করেছে।

এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে হাজার হাজার সেনা মোতায়েন করছে, যা ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য স্থল অভিযানের আশঙ্কা বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে, ইরানের ভেতর থেকেও দীর্ঘ সময় ধরে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি শোনা যাচ্ছে।

সিএনএন-এর ফ্রেড প্লেটগেনকে ইরানের একজন ঊর্ধ্বতন নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেছেন, 'এটা আমাদের যুদ্ধ, এবং ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুকে একটি ঐতিহাসিক শিক্ষা না দেয়া পর্যন্ত আমরা প্রতিরোধ চালিয়ে যাব।'

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, 'আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে পাকিস্তান আয়োজিত সাম্প্রতিক কোনো বৈঠকে ইরান অংশ নেয়নি। তার মতে, এই বৈঠকগুলো এমন একটি কাঠামোর আদলে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যাতে তেহরানের সম্মতি নেই।'

তিনি বলেন, ‘পাকিস্তান প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে যে বৈঠকগুলো করছে, সেগুলো তাদের নিজস্ব কাঠামোর মধ্যে। আমরা এতে অংশ নিইনি।’ তার মতে, 'যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানসহ বিভিন্ন মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে আলোচনা ও প্রস্তাবের অনুরোধ জানালেও, চলমান হামলা থেকে আত্মরক্ষা করাই ইরানের বর্তমান অগ্রাধিকার।'

তবে চলমান পরিস্থিতি অত্যন্ত পরিবর্তনশীল ও বিপজ্জনক। ট্রাম্প প্রশাসন এবং ইরান, উভয় পক্ষই বিজয়ের দাবি করছে। অথচ একইসঙ্গে একে অপরের ওপর হামলাও চালিয়ে যাচ্ছে।

তবুও, এই সংঘাতে জড়িত পক্ষগুলো কখনো কখনো সংযমেরও পরিচয় দিয়েছে। আর এই যুদ্ধ আরও অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাস্তব এবং অত্যন্ত গুরুতর বলেই মত বিশ্লেষকদের।

সূত্র: সিএনএন

এসকে/এসএন

মন্তব্য করুন