খোদ ঈশ্বরই চাইছেন ইরানে বোমা ফেলুক আমেরিকা, দাবি ট্রাম্পের
ছবি: সংগৃহীত
০২:৫৫ এএম | ০৮ এপ্রিল, ২০২৬
পাঁচ সপ্তাহ অতিক্রান্ত। যুদ্ধের শেষ কোথায়, তা এখনও স্পষ্ট নয়। এর মধ্যেই গোটা ইরানে হামলার ঝাঁঝ আরও বাড়ানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেইসঙ্গে এই রক্তক্ষয়ী আগ্রাসনের সপক্ষে এক নতুন যুক্তি দাঁড় করেছেন তিনি। তার দাবি, খোদ ঈশ্বরই চাইছেন ইরানে বোমা ফেলুক আমেরিকা।
সোমবার ট্রাম্প বলেন, তার বিশ্বাস, ইরান যুদ্ধে আমেরিকার পদক্ষেপগুলোকে সমর্থন করছেন ঈশ্বর। মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়া এই যুদ্ধে ইতিমধ্যেই নিহত হয়েছেন কয়েক হাজার মানুষ, আহত আরও অনেকে। নিহত হয়েছেন ১৩ জন মার্কিন সেনাও।
হোয়াইট হাউসের এক সাংবাদিক সম্মেলনে ওয়াশিংটন পোস্টে প্রতিনিধির প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প ট্রাম্প বলেন, 'আমি তা-ই মনে করি। কারণ ঈশ্বর পরম করুণাময়। আর ঈশ্বর চান মানুষের ভালো হোক।'
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরানের বিষয়ে বারবার বয়ান বদলেছেন ট্রাম্প। কখনও দেশটিতে সরকার পরিবর্তনের কথা বলেছেন, কখনও বা দিয়েছেন অন্য অজুহাত। তবে গত কয়েকদিনে হামলার পরিধি বাড়ানোর ইঙ্গিতের সঙ্গেই বিষয়টিকে সুকৌশলে ধর্মীয় মোড়ক দিতে চাইছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
সোমবার সকালেই ইরানের বিদ্যুৎ ও পরিবহন অবকাঠামো গুঁড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে ট্রাম্প বলেন, হামলা এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হবে, যাতে দেশটি 'প্রস্তর যুগে' ফিরে যায়। তার আরও দাবি, ইরানের সাধারণ মানুষও সরকারের পতন চাইছেন। তাই তারা নাকি আমেরিকাকে আর্জি জানাচ্ছেন, যাতে এই বোমাবর্ষণ থামানো না হয়।
তিনি ঈশ্বরের কোনো নির্দেশনা চেয়েছেন কি না, এই প্রশ্নের সরাসরি কোনো উত্তর দেননি ট্রাম্প। তবে তার ইঙ্গিত, সহিংসতায় ঈশ্বর ব্যথিত হলেও আমেরিকার এই পদক্ষেপে তার সায় রয়েছে।
ট্রাম্প বলেন, 'যা ঘটছে, তা ঈশ্বরের পছন্দ নয়। আমারও পছন্দ নয়। সবাই বলে আমি যুদ্ধ উপভোগ করি। কিন্তু আমি মোটেও এটি উপভোগ করি না।'
নিজের শান্তিকামী ভাবমূর্তি তুলে ধরতে ট্রাম্প মনে করিয়ে দেন, আগের মেয়াদে তিনি 'আটটি যুদ্ধ বন্ধ' করেছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনে ট্রাম্প নিজেকে খ্রিস্টান হিসেবে পরিচয় দিলেও নিয়মিত উপাসনা বা বাইবেল পাঠের দাবি করেন না। তবে দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর থেকে তার গলায় বারবার ধর্মবিশ্বাসের কথা শোনা গেছে। এমনকি তার রাজনীতিতে ফিরে আসা এবং হত্যাচেষ্টা থেকে বেঁচে যাওয়ার পেছনে ঐশ্বরিক মহিমা রয়েছে বলেও তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, এই যুদ্ধ মূলত খ্রিস্টধর্ম ও ইসলামের মধ্যকার অস্তিত্ব রক্ষার এক লড়াই। ইস্টার সানডের সকালে সমাজমাধ্যমে করা এক পোস্টে তিনি সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়ে লেখেন, 'ওপেন দ্য ফাকিং স্ট্রেইট, ইউ ক্রেজি বাস্টার্ডস, অর ইউ উইল বি লিভিং ইন হেল-জাস্ট ওয়াচ! প্রেইজ বি টু আল্লাহ্।'
যুদ্ধ বাধানোর সময় মার্কিন প্রেসিডেন্টরা প্রায়ই ধর্মের দোহাই দিয়ে থাকেন। তবে জর্জ ডব্লিউ বুশ ও বারাক ওবামার মতো নেতারা-যারা মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বাধিয়েছেন-তারা সচেতনভাবে প্রচার করতেন যে আমেরিকা কোনোভাবেই মুসলিম বা ইসলামের বিরুদ্ধে লড়াই করছে না; বরং তারা আমেরিকায় হামলা চালানো নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়ছেন।
ট্রাম্পের এই 'প্রেইজ টু বি' মন্তব্যকে ধর্মের প্রতি চরম অবমাননা হিসেবে গণ্য করে তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন অনেক মুসলিম নেতা। মিশিগানের ইমামস কাউন্সিলও এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে এই অঙ্গরাজ্যে মুসলিম ভোটারদের একটি বড় অংশের সমর্থন পেয়েছিলেন ট্রাম্প।
রোববারের এই পোস্টের আগেরদিনও ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যাল-এ অনেকটা একই সুরে লিখেছিলেন, 'সময় ফুরিয়ে আসছে। আর ৪৮ ঘণ্টা পর ওদের ওপর নরক নেমে আসবে। ঈশ্বরের জয় হোক!'
ক্যাথলিক নেতাদের একাংশও ইরানের ওপর এই হামলার কড়া সমালোচনা করেছেন। খোদ পোপ লিও পাম সানডের ভাষণে মনে করিয়ে দেন, ঈশ্বর কখনও যুদ্ধবাজদের প্রার্থনা শোনেন না। মার্কিন বংশোদ্ভূত প্রথম পোপ লিও সরাসরি ট্রাম্পের নাম করে যুদ্ধ থামানোর আহ্বান জানান।
ট্রাম্পের একদা ঘনিষ্ঠ রিপাবলিকান নেতা মার্জোরি টেলর গ্রিনও এখন তার ঘোর বিরোধী। প্রোটেস্ট্যান্ট এই নেতা স্পষ্ট জানিয়েছেন, ট্রাম্প মোটেও 'খ্রিস্টান' নন।
সোমবার ইরানের পাহাড়ি অঞ্চল থেকে এক মার্কিন সেনাকে উদ্ধার করার কৃতিত্বও ঈশ্বরকে দিয়েছেন ট্রাম্প। এই উদ্ধার অভিযানকে 'অলৌকিক' আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, 'ইস্টারের সময় ছিল বলেই ঈশ্বর আমাদের ওপর নজর রেখেছিলেন।'
সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্পের পাশে থাকা যুদ্ধমন্ত্রী পিট হেগসেথ এই উদ্ধার অভিযানের বর্ণনা দিতে গিয়ে যিশু খ্রিস্টের ক্রুশবিদ্ধ হওয়া ও পুনরুত্থানের প্রসঙ্গ টানেন।
হেগসেথ বলেন, 'দেখুন, শুক্রবার-গুড ফ্রাইডেতে তাকে গুলি করে নামানো হলো; সারা শনিবার তিনি একটি গুহায় লুকিয়ে রইলেন; আর রোববার তাকে উদ্ধার করা হলো। ইস্টার সানডের সকালে যখন সূর্য উঠছে, তখন তিনি ইরান থেকে উড়ে এলেন-যেন এক পাইলটের পুনর্জন্ম হলো।'
আরআই/টিকে