© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

রাষ্ট্র কি আইনের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিয়ন্ত্রণ করছে- প্রশ্ন জিল্লুর রহমানের

শেয়ার করুন:
রাষ্ট্র কি আইনের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিয়ন্ত্রণ করছে- প্রশ্ন জিল্লুর রহমানের

ছবি: সংগৃহীত

মোজো ডেস্ক
১২:২৭ পিএম | ১০ এপ্রিল, ২০২৬
বাংলাদেশের রাজনীতি আবারও এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে সাম্প্রতিক একটি আইন প্রণয়ন ঘিরে রাষ্ট্রের চরিত্র, আইনের শাসন এবং গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। একটি অধ্যাদেশ, যা প্রথমে অন্তর্বর্তী সরকারের জরুরি পদক্ষেপ হিসেবে জারি করা হয়েছিল, এখন জাতীয় সংসদে পাস হয়ে আইনে পরিণত হওয়ার পথে এগিয়েছে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কার্যত একটি রাজনৈতিক দলকে রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে বাইরে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে, যা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সম্প্রতি নিজের ইউটিউব চ্যানেলে দেওয়া বক্তব্যে সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক জিল্লুর রহমান এই বিষয়টিকে শুধু দলীয় দ্বন্দ্ব হিসেবে না দেখে বৃহত্তর রাষ্ট্রীয় প্রেক্ষাপটে মূল্যায়নের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এটি কেবল আওয়ামী লীগ বনাম বিএনপির রাজনৈতিক লড়াই নয়; বরং প্রশ্ন হচ্ছে—রাষ্ট্র কি আইনের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিয়ন্ত্রণ করছে, নাকি এটি একটি ব্যতিক্রমী পরিস্থিতির সিদ্ধান্ত?’
 
জিল্লুর রহমান বলেন, “আওয়ামী রাজনীতি নিষিদ্ধের বিষয়ে পুরো বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে সন্ত্রাসবিরোধী আইন ২০০৯-এর ধারা ১৮(১), যা সরকারকে ‘যুক্তিসংগত কারণ’ দেখিয়ে গেজেট প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি বা সত্তাকে সন্ত্রাসী ঘোষণা এবং তাদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা দেয়। প্রথম নজরে এটি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় মনে হলেও এই ধারার মধ্যেই ন্যায়বিচারের একটি মৌলিক সংকট রয়েছে। কারণ, ‘যুক্তিসংগত কারণ’ নির্ধারণের ক্ষমতা সরকারের হাতে কেন্দ্রীভূত-এখানে কোনো প্রকাশ্য বিচার, স্বাধীন আদালতের শুনানি বা প্রমাণ যাচাইয়ের বাধ্যবাধকতা নেই। যা ‘প্রেজাম্পশন অব ইনোসেন্স’ নীতির সঙ্গে সংঘাত তৈরি করে।

আইনের এই কাঠামো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘প্রেজাম্পশন অব ইনোসেন্স’ বা অপরাধ প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত নির্দোষ ধরা এই মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। জাতি সংঘের মানবাধিকার ঘোষণাপত্র এবং আইসিসিপিআর অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে দোষী সাব্যস্ত করতে হলে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালতে প্রমাণ উপস্থাপন অপরিহার্য।”
 
তিনি আরো বলেন, ‘বাংলাদেশ ২০০০ সালে এসব আন্তর্জাতিক সনদ অনুমোদন করায়, এই নীতিগুলো শুধু নৈতিক নয়, আইনি বাধ্যবাধকতাও বটে। ২০০০ সালে প্রণীত এই ধারা বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১, ৩২ ও ৩৫ অনুচ্ছেদের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক, যেখানে আইনের সুরক্ষা, ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং ন্যায্য বিচারের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। এমনকি সুপ্রিম কোর্টও বিভিন্ন রায়ে অপরাধ প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত কাউকে নির্দোষ ধরে নেওয়ার নীতিকে সমর্থন করেছেন।’

জিল্লুর রহমান বলেন, “আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা সাধারণত ‘শেষ অবলম্বন’ হিসেবে বিবেচিত হয়। ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করে জার্মানিতে কোনো দল নিষিদ্ধ করতে হলে প্রমাণ করতে হয় যে তারা সক্রিয়ভাবে গণতন্ত্র ধ্বংসের চেষ্টা করছে। মিশরে মুসলিম ব্রাদারহুড নিষিদ্ধ হওয়ার পর সংগঠনটি নির্মূল না হয়ে আরো জটিল রূপ নেয়। একইভাবে থাইল্যান্ড ও স্পেনের অভিজ্ঞতাও দেখায়, দল নিষিদ্ধ করা সব সময় কাঙ্ক্ষিত ফল দেয় না।

বাংলাদেশেও অতীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার নজির রয়েছে, যার ফলাফল সব সময় ইতিবাচক ছিল না।”

জিল্লুর রহমান আরো বলেন, “বর্তমান পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের চেয়ে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এই প্রবণতাকে ‘পিউনেটিভ গভর্নেন্স’ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে, যেখানে শাসনের মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় নিয়ন্ত্রণ, ন্যায্যতা নয়।”

তিনি বলেন, “আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধের এই প্রেক্ষাপটে বিএনপির অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক দমন-পীড়নের সমালোচক দলটি এখন একই ধরনের আইনি কাঠামোর মধ্যে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে যা তাদের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থানকে প্রভাবিত করতে পারে।’
 
ভবিষ্যতের প্রশ্নে জিল্লুর রহমান বলেন, ‘এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি দলকে নিষিদ্ধ করার বিষয় নয়; এটি ভবিষ্যতের রাজনৈতিক কাঠামো নির্ধারণ করবে। যদি আইন নিরপেক্ষ থাকে, তবে তা ন্যায়বিচারের হাতিয়ার হবে। কিন্তু যদি তা ক্ষমতার সঙ্গে একীভূত হয়ে পড়ে, তাহলে এটি রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করবে।’

এসএস/এসএন 

মন্তব্য করুন