© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

আইফোন বিক্রি থেকে শুরু, এখন সাড়ে ৮ লাখ টাকার বিড়াল বিক্রি করেন মোহন!

শেয়ার করুন:
আইফোন বিক্রি থেকে শুরু, এখন সাড়ে ৮ লাখ টাকার বিড়াল বিক্রি করেন মোহন!

ছবি: সংগৃহীত

সাব্বির আহমেদ, মোজো এডিটর-এট-লার্জ
১২:৩৯ পিএম | ১০ এপ্রিল, ২০২৬
হাতে ছিল ইউরোপের সোনার হরিণ—ইতালির ভিসা! বিমানে ওঠার প্রস্তুতিও ছিল প্রায় চূড়ান্ত! কিন্তু শেষ মুহূর্তে সব হিসেব ওলটপালট করে দিল চারপেয়ে কিছু লোমশ বন্ধু। ইতালির জাঁকজমকপূর্ণ জীবনের চেয়ে খাঁটি মনে হলো বিড়ালের মিউ মিউ ডাক।

গল্পটা ঢাকার আফতাব নগরের এক তরুণের। যার দিন শুরু হয় বিড়ালের সাথে, রাত কাটে একই বালিশে মাথা রেখে। পাগলামিটা এতটাই চরমে যে, সকালে বিড়ালের বিষ্ঠার গন্ধ না পেলে নাকি তার ঘুমই ভাঙে না!



শুরুটা হয়েছিল নিজের শখের আইফোন বিক্রি করে প্রথম বিড়ালটি কেনার মধ্য দিয়ে। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। ইতালিতে গিয়ে যা আয়ের স্বপ্ন দেখেছিলেন, এখন ঢাকার বুকেই বিড়াল লালন-পালন ও ব্যবসার মাধ্যমে তার চেয়েও বেশি আয় করছেন তিনি। শখ যখন নেশা আর নেশা যখন পেশা হয়ে দাঁড়ায়, তখন জীবন কতটা রোমাঞ্চকর হতে পারে—তারই এক অনন্য উদাহরণ এই বিড়াল বন্ধু নুর মোহাম্মদ মোহন । তিনি ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির সোশ্যাল রিলেশনস বিভাগের পাবলিক হেলথ মেজর নিয়ে পড়াশোনা করছেন। বিড়ালের খাবার এবং উন্নত কেয়ারের জন্য আফতাব নগরে মোহন গড়ে তুলেছেন নিজের প্রথম শপ 'বিড়ঙ্গ পেট মার্ট'। এখানে ভেটেনারী, গ্রুমিং ও কেয়ার প্রোডাক্ট ও সব ধরনের বিড়াল পাওয়া যায়। 



সম্প্রতি বিড়ঙ্গ পেট মার্টে বসেই তিনি শুনিয়েছেন কীভাবে বিড়াল তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।

মোহানের পশুপাখির প্রতি ভালোবাসা সেই ছোটবেলা থেকেই। তবে ২০১৮ সালে এসএসসি শেষ করে ঢাকায় এসে প্রথম যখন বিদেশি বিড়াল দেখলেন, মোহ তৈরি হলো সেই তখনই।

পকেটে ছিল ভাইয়ের উপহার দেওয়া শখের আইফোন। দ্বিধা না করে আইফোনটি বিক্রি করে দিয়ে ঘরে তুললেন প্রথম পার্সিয়ান বিড়াল। পরিবার প্রথমে বকাঝকা করলেও থামেননি মোহন।

এক পর্যায়ে বাড়ি থেকে কৌশলে টাকা এনে একের পর এক বিড়াল কিনতে শুরু করেন। ২০১৯ সাল থেকে মাথায় আসে নতুন বুদ্ধি— শখের এই প্রাণীকে তো পেশা হিসেবেও নেওয়া যায়।

শুরু করলেন বিড়াল বিক্রি।



২০২০ সালে এইচএসসি পরীক্ষার পর যখন সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির যুদ্ধে ব্যস্ত, মোহনের ব্যস্ততা তখন রাশিয়া, চীন ও মালয়েশিয়া থেকে উন্নত জাতের বিড়াল আনা নিয়ে। বিড়ালের প্রতি মায়া আর নেশা এতটাই জেঁকে বসেছিল যে, একবার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি ফরম তুললেও বিড়ালের যত্ন নিতে গিয়ে পরীক্ষায় আর বসাই হয়নি তার। মোহন হাসিমুখে বলেন, “গত ৬-৭ বছরে এমন একটি দিনও যায়নি যে আমি বিড়াল ছাড়া ছিলাম। এমনকি বাড়িতে ঈদ করতে গেলেও চাঁদ রাতে যাই আর ঈদের পরদিন দুপুরে ঢাকায় ফিরে আসি। মা-বাবা আগে রাগ করলেও এখন তারা আমার কাজের ভক্ত।”

২০২৪ সালের শুরুর দিকে মোহনের সামনে আসে জীবনের বড় সুযোগ। ইতালির ভিসা হয়ে গিয়েছিল তার। বেলজিয়াম প্রবাসী ভাই পরামর্শ দিলেন চলে আসার। কিন্তু মোহনের হিসেবে তখন অন্য অঙ্ক। তিনি জানতে পারলেন ইতালিতে গিয়ে সব খরচ শেষে মাসে ১ লাখ টাকার মতো সঞ্চয় হতে পারে।

এদিকে দেশেই তিনি বিড়ালের ব্যবসা করে তার চেয়ে অনেক বেশি আয় করছেন। মোহন বলেন, “৪-৫ বছর পর সেখানে বেতন হয়তো ৪ লাখে পৌঁছাত, কিন্তু আমি তো এখনই দেশের মাটিতে এর চেয়ে ভালো আছি। তাই ইতালির বিলাসিতা ছেড়ে বিড়ালের মায়ায় দেশেই থেকে গেলাম।”

মোহন কেবল বিড়াল বিক্রিই করেন না, বিক্রির পর সেগুলো কেমন আছে তার নিয়মিত খোঁজও রাখেন। এমনকি কেউ সমস্যায় পড়লে বিড়াল ফেরতও নেন। তার অভিজ্ঞতায় আছে এক আবেগঘন গল্প। এক সিঙ্গেল মাদার মোহনের কাছ থেকে চড়া দামে বিড়াল কিনেছিলেন। সেই নারী এর আগে তিনবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু বিড়ালটি পালার পর তিনি মোহনকে বলেন, “এখন আর মরে যাওয়ার কথা ভাবি না। কারণ আমি মরে গেলে আমার বিড়ালটাকে দেখার কেউ থাকবে না।”

বর্তমানে মোহনের কাছে ব্রিটিশ শর্টহেয়ার গোল্ডেন ও রাগডলের মতো দামি জাতের বিড়াল রয়েছে। তার হাত ধরে একটি বিড়াল সর্বোচ্চ সাড়ে ৮ লাখ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে। বর্তমানে তার সংগ্রহে আছে প্রায় ৪২টি বিড়াল। এর মধ্যে ‘বন্ধু’ নামের রাশিয়ান স্কটিশ গোল্ড বিড়ালটি মোহনের সবচাইতে প্রিয়। রাতে ঘুমানোর সময় বালিশের অর্ধেকটা মোহনের, বাকি অর্ধেকটা থাকে ‘বন্ধু’র দখলে।

বাংলাদেশে বিড়ালের সঠিক চিকিৎসার অভাব মোহনের মনে পীড়া দেয়। তাই তিনি নিজেই গড়ে তুলেছেন বিড়ালের খাবার ও সেবা দেওয়ার আধুনিক শপ। যেখানে সুস্থ ও অসুস্থ বিড়ালের জন্য রাখা হয়েছে আলাদা ব্যবস্থা। তার ভবিষ্যৎ লক্ষ্য, বিড়ালের চিকিৎসার জন্য সব আধুনিক যন্ত্রপাতি বিদেশ থেকে আনা। মোহন বলেন, “আমি বাংলাদেশের বিড়ালগুলোকে সর্বোচ্চ সেবা দিয়ে বাঁচাতে চাই। মানুষ এখন বিড়ালকে পশু নয়, সন্তান মনে করে পালে। তাদের জন্য কাজ করতে পারাটাই আমার আনন্দ।”

মন্তব্য করুন