মধ্যপ্রাচ্যের এক জিপসি নৃগোষ্ঠীর অলিখিত ও অজানা ইতিহাস
ছবি: সংগৃহীত
১২:৪৮ পিএম | ১০ এপ্রিল, ২০২৬
মানবসভ্যতার ইতিহাসে কিছু সম্প্রদায় রয়েছে যাদের কণ্ঠস্বর কখনোই মূলধারার ইতিহাসের পাতায় স্থান পায়নি। তারা সময়ের স্রোতে ভেসে যেতে থাকে। প্রান্তিকতার দূরতম অন্ধকারে নিমজ্জিত হতে হতে মূলস্রোতের স্মৃতি ও চর্চা থেকে হারিয়েই যায়। মধ্যপ্রাচ্যের ডোম (Dom) জনগোষ্ঠী সেই নিরালোকিত সম্প্রদায়গুলির একটি। এই অনালোকিত যাযাবর বা জিপসি নৃগোষ্ঠীর ইতিহাস বহুলাংশে অলিখিত ও অজানা থেকে গেছে। অথচ এই অনন্য জনগোষ্ঠীর রয়েছে উৎস, সংস্কৃতি, ভাষা ও জীবনসংগ্রামের বর্ণাঢ্য কাহিনি।
ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, নবম শতাব্দীতে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের বৃহত্তর পাঞ্জাব অঞ্চলে নানা উত্থান-পতনের ঘটনা ঘটে। তখন ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে অভিবাসনের প্রথম ঢেউ হিসেবে ডোম জনগোষ্ঠী মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। কালপ্রবাহের পরিক্রমায় এই জনগোষ্ঠী ভৌগোলিক অবস্থানভেদে বিভিন্ন নামে পরিচিতি লাভ করে। ইউরোপে তারা 'রোমা' (Roma) নামে পরিচিত, স্পেনের উত্তর আনাতোলিয়ায় তাদের ডাকা হয় 'লোম' (Lom) নামে। তবে মধ্যপ্রাচ্যে তারা সাধারণভাবে 'ডোম' নামেই অভিহিত।
সামাজিক গবেষখগণ অনুমান করেন যে, বর্তমানে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ৫০ লক্ষ ডোম জনগোষ্ঠী বসবাস করছে। সিরিয়া, জর্ডান, ইরান, লেবানন, ইরাক, ইসরায়েল, গাজা, পশ্চিম তীর, মিশর এবং তুরস্ক- এই দেশগুলোতেই তাদের বসবাস রয়েছে। এছাড়া উপসাগরীয় দেশগুলোতেও তাদের ছোট ছোট সম্প্রদায়ের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। তবে এদের সঠিক পরিসংখ্যান নির্ণয় করা অত্যন্ত কঠিন। কারণ অনেক ডোম সম্প্রদায়ই সরকারি নিবন্ধন ও আদমশুমারির আওতার বাইরে অবস্থান করে এবং যাযাবর জীবন-যাপনের জন্য সরকারি হিসাবে আওতা থেকে অনেক সময় সরে থাকে।
ডোম জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষাকে শিক্ষায়তনিক পরিমণ্ডলে 'ডোমরি' (Domari) নামে অভিহিত করা হয়। এই ভাষাটি মূলত স্থানীয় উপভাষা ও আরবির একটি অনন্য মিশ্রণে গঠিত।
দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এই ভাষার কোনো লিখিত নথিপত্র নেই। উচ্চ নিরক্ষরতার কারণে এটি কেবল মৌখিক চর্চার মাধ্যমেই টিকে আছে। বর্তমান প্রজন্মের অনেকে আরবি বা তুর্কির মতো প্রধান ভাষার প্রভাবে নিজেদের মাতৃভাষার চর্চা ধীরে ধীরে ভুলে যাচ্ছে।
ডোমদের ইতিহাস এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে লোকগাঁথা, গল্প ও গানের মাধ্যমে স্থানান্তরিত হযয়েছে। তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রাণ হচ্ছে নৃত্য ও সংগীত। 'ঘাওয়াজি' এবং 'খাওয়ালি'- এ ধরনের নৃত্যশৈলী তাদের পরিচিতির বড় অংশ। সঙ্গীত ও নৃত্যের মাধ্যমেই তারা তাদের আবেগ, বেদনা ও ইতিহাসকে ধারণ করে রাখে।

ডোম সম্প্রদায় মূলত যাযাবর বা আধা-যাযাবর জীবনযাপন করে। তারা সাধারণত মূল জনপদ থেকে দূরে বিচ্ছিন্নভাবে বসবাস করতে পছন্দ করে। প্রাচীনকাল থেকে তারা কিছু ঐতিহ্যবাহী পেশার সাথে যুক্ত। যেমন, ধাতব কাজ, দন্তচিকিৎসা, ঝুড়ি তৈরি, ভাগ্য গণনা এবং গান-বাজনা। আধুনিক অর্থনীতির পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে না পারায় তাদের জীবিকা ক্রমশ সংকটাপন্ন হয়ে পড়ছে।
ডোমদের সমাজ ব্যবস্থা বেদুইনদের মতো উপজাতীয় কাঠামোতে সংগঠিত। প্রতিটি গোষ্ঠী ৫ থেকে ১৫টি পরিবার নিয়ে গঠিত হয়। প্রতিটি গোষ্ঠীর একজন নেতা বা প্রধান থাকেন, যিনি অভ্যন্তরীণ বিরোধ নিষ্পত্তি ও সম্প্রদায়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
ডোম জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় বিশ্বাস অত্যন্ত নমনীয়। তারা সাধারণত যে দেশে বাস করে সেখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্ম গ্রহণ করে। যেমন- ইরাকি ডোম বা 'ঘাজার' নামে পরিচিত সম্প্রদায়টি মূলত শিয়া মুসলিম, অন্যদিকে কুর্দি ডোম বা 'কারাজ' সম্প্রদায়টি মূলত সুন্নি মুসলিম। এই ধর্মীয় অভিযোজনযোগ্যতা তাদের টিকে থাকার কৌশলের একটি অংশ।
ডোম জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন এবং প্রান্তিক অবস্থায় রয়েছে। অনেক দেশে তাদের নাগরিকত্ব নেই, যার ফলে তারা শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক আবাসের অভাবে তারা বহু দেশেই 'অনুপস্থিত নাগরিক' হিসেবে বেঁচে থাকতে বাধ্য হচ্ছে।
আরব বিশ্বে ডোম জনগোষ্ঠীকে প্রায়ই 'নাওয়ার' (Nawar) নামে ডাকা হয়, যা একটি অবজ্ঞাসূচক ও কলঙ্কজনক সম্বোধন। তাদের নিয়ে নানা কুসংস্কার ও নেতিবাচক ধারণা প্রচলিত। সমাজের চোখে তারা প্রায়ই 'অপবিত্র', 'অপরাধপ্রবণ' বা 'অবিশ্বস্ত' হিসেবে চিহ্নিত হয়। এই বৈষম্যের কারণে তারা সমাজের মূলস্রোতে মিশতে পারেন না।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ ডোম জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রাকে আরও বিপর্যস্ত করে তুলেছে। যুদ্ধের কারণে তাদের যাযাবর জীবনযাপন আরও অনিশ্চিত। অনেক ডোম পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়ে ঘরবাড়ি-সম্পদ হারিয়েছে। সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। কারণ তাদের কাছে যুদ্ধের কবল থেকে বাঁচার মতো কোনো নির্দিষ্ট আশ্রয়স্থল নেই।
বিপুল প্রতিকূলতার মধ্যেও ডোম সম্প্রদায়ের জন্য কিছু আশার খবর রয়েছে।
এসকে/এসএন