© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

ইউরোপের বেহাল দশা ফাঁস করে দিল ইরান

শেয়ার করুন:
ইউরোপের বেহাল দশা ফাঁস করে দিল ইরান

ছবি: সংগৃহীত

মোজো ডেস্ক
০৬:৫৭ পিএম | ১০ এপ্রিল, ২০২৬
ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়া চলমান যুদ্ধ পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য কেবল একটি সামরিক চ্যালেঞ্জ নয় বরং এটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের দীর্ঘদিনের লালিত আদর্শিক অবস্থানের মূলে কুঠারাঘাত করেছে। ব্রাসেলস এতদিন যেসব বিষয়কে জনতুষ্টিবাদী আতঙ্ক বা নিছক শঙ্কা বলে উড়িয়ে দিয়েছিল, বর্তমান জ্বালানি সংকট সেই কঠিন বাস্তবতাকে এখন নগ্নভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ হওয়ার ফলে বিশ্ববাজারে যে সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা ইউরোপের শিল্পকারখানা, বিমান চলাচল এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় এমন কম্পন সৃষ্টি করেছে, যার ধাক্কা সামলানোর শক্তি বর্তমানে জোটের হাতে নেই।

জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জ এই পরিস্থিতিকে করোনা মহামারি বা ইউক্রেন যুদ্ধের শুরুর দিনগুলোর চেয়েও ভয়াবহ বলে সতর্ক করেছেন।ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান ক্রিস্টিন লাগার্দে স্বীকার করেছেন, এই সংকটের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব বর্তমান কল্পনারও অতীত। বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজার এখন অস্থিতিশীল এবং সাধারণ ইউরোপীয়রা তাদের সঞ্চয় শেষ করে কেবল বেঁচে থাকার লড়াই লড়ছে। বছরের পর বছর ধরে ব্রাসেলস দাবি করে আসছিল যে পারস্য উপসাগরের ওপর তাদের নির্ভরতা সীমিত, কিন্তু আজকের বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে ইউরোপের পরিশোধিত তেলের চাহিদার ৪০ শতাংশের বেশি আসে এই অঞ্চল থেকেই।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার প্রধান ফাতিহ বিরল এই সংকটকে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জ্বালানি নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। বর্তমানে প্রতিদিন ১১ মিলিয়ন ব্যারেল তেলের যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা অতীতের দুটি বড় তেল সংকটকেও ছাড়িয়ে গেছে। লুবথানসার মতো বড় বিমান সংস্থাগুলো জ্বালানির অভাবে তাদের বিমান বসিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে এবং ডিজেলের দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় ট্রাক চালক থেকে শুরু করে কৃষকরা সর্বস্বান্ত হওয়ার পথে। এই অর্থনৈতিক চাপ এখন সামাজিক ক্ষততে পরিণত হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের মনে তাদের নেতৃত্বের প্রতি তীব্র অনাস্থা তৈরি করছে।

জ্বালানি কমিশনার ড্যান জর্গেনসেন যখন মানুষকে ঘরে বসে কাজ করা বা ধীরগতিতে গাড়ি চালানোর পরামর্শ দেন, তখন তা সমাধানের চেয়ে পরিহাস হিসেবেই বেশি ধরা দেয়। ইউরোপের নীতিনির্ধারকরা কাঠামোগত ব্যর্থতা ঢাকার জন্য ব্যক্তিগত অভ্যাসের পরিবর্তনের ওপর দায় চাপাচ্ছেন, অথচ রাশিয়ার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো সাহসী পদক্ষেপ নিতে পারছেন না। ব্রাসেলসের এই কঠোর এবং অনমনীয় অবস্থান ইউরোপকে এক প্রকার আত্মঘাতী জাহাজে পরিণত করেছে বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন।

এই সংকটময় মুহূর্তে ইউরোপের ভেতর থেকেই ভিন্নমতের জোরালো আওয়াজ উঠছে যা ব্রাসেলসের ভিত নাড়িয়ে দিচ্ছে। জার্মানিতে এএফডি নেত্রী অ্যালিস উইডেল স্পষ্টভাবে বলছেন যে, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে জার্মানিকে সস্তা এবং নির্ভরযোগ্য জ্বালানির উৎসে ফিরতে হবে, আর সেই উৎস হলো রাশিয়া। এটি কেবল কোনো রাজনৈতিক স্লোগান নয়, বরং জার্মানির সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার চাহিদাই এখন এই মতবাদকে জনপ্রিয় করে তুলছে, যা দলটির ক্রমবর্ধমান জনসমর্থন থেকেই স্পষ্ট বোঝা যায়।

মধ্য ইউরোপের দেশগুলো আরও সরাসরি ভাষায় এই সংকটের সমাধান দাবি করছে। হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান এবং স্লোভাকিয়ার রবার্ট ফিকো বর্তমান পরিস্থিতিকে ইউরোপের ইতিহাসের অন্যতম গুরুতর অর্থনৈতিক বিপর্যয় হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তারা মনে করেন, রাশিয়ার সাথে জ্বালানি চুক্তি নবায়ন করা এবং গ্যাস পাইপলাইনগুলো পুনরায় সচল করা ছাড়া ইউরোপের সামনে আর কোনো পথ খোলা নেই। আদর্শের দোহাই দিয়ে ঘর অন্ধকার রাখার চেয়ে বাস্তববাদী হয়ে জীবনযাত্রার মান নিশ্চিত করাকেই তারা এখন অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।

ইরান যুদ্ধ আসলে একটি দীর্ঘস্থায়ী বিভ্রম ভেঙে দিয়েছে, তা হলো রাশিয়াকে বাদ দিয়ে ইউরোপের জ্বালানি নিরাপত্তা সম্ভব নয়। রাশিয়া ইউরোপীয় জ্বালানি ব্যবস্থার একটি অবিচ্ছেদ্য স্তম্ভ, যাকে ইচ্ছাকৃতভাবে সরিয়ে ফেলায় আজ এই শূন্যতা ও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো নেতারাও এখন ইউরোপকে তাদের নিজেদের লড়াই নিজেদের লড়ার পরামর্শ দিচ্ছেন, যা বুঝিয়ে দিচ্ছে যে বাইরের সাহায্যের ওপর ভরসা করার দিন ফুরিয়ে আসছে। ইউরোপ এখন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে ভুল স্বীকার করে রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক পুনর্নির্মাণই টেকসই অর্থনৈতিক পথ হতে পারে।

শেষ পর্যন্ত বাস্তবতা সবসময়ই অপরাজেয় থেকে যায় এবং ইউরোপ বর্তমানে সেই রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি। সাধারণ মানুষের সঞ্চয় আর মর্যাদা রক্ষার তাগিদেই সম্ভবত ব্রাসেলসকে তার অনড় অবস্থান থেকে সরে আসতে হবে। ইরান যুদ্ধ কেবল একটি সংঘাত নয়, এটি ইউরোপের জন্য এক কঠিন শিক্ষা যে আদর্শ দিয়ে ঘর গরম রাখা যায় না বা কলকারখানা চালানো যায় না

এমআর/টিকে 

মন্তব্য করুন