উত্তম কুমারের সুরেই বাংলা প্লেব্যাকে আশার আগমন!
ছবি: সংগৃহীত
০৯:০৬ এএম | ১৩ এপ্রিল, ২০২৬
বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল ১৯৫৯ সালে, যখন প্রথমবারের মতো বাংলা প্লেব্যাক জগতে কণ্ঠ মেলান কিংবদন্তি শিল্পী আশা ভোসলে। সেই যাত্রার নেপথ্যে রয়েছে একাধিক চমকপ্রদ গল্প, যা আজও সঙ্গীতপ্রেমীদের কাছে সমানভাবে আকর্ষণীয়।
সেই সময় মুক্তি পায় ‘রাতের অন্ধকারে’ নামের একটি ছবি। ছবিটি আজ অনেকের স্মৃতি থেকে মুছে গেলেও এর অন্তরালে লুকিয়ে আছে বাংলা গানের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। ছবিতে অভিনয় করেছিলেন ছবি বিশ্বাস, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, চন্দ্রাবতী দেবী ও রাজলক্ষ্মী দেবীর মতো প্রতিষ্ঠিত শিল্পীরা। তবে দর্শকের নজর কাড়েন অতিথি শিল্পী হেলেন, যার জন্য তৈরি করা হয়েছিল একটি অভিনব ক্যাবারে দৃশ্য যা তখনকার বাংলা ছবিতে ছিল একেবারেই নতুন।

এই গানের সুরকার ছিলেন ভি বালসারা এবং গীতিকার পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়। বহুভাষিক এক অভিনব গানের পরিকল্পনা থেকেই শুরু হয় অন্যরকম এক সৃষ্টির যাত্রা। গানটি গাওয়াবেন কাকে সেই প্রশ্নের উত্তরে বালসারার এক কথার প্রস্তাব, আশা ভোসলে। তখন তিনি মূলত হিন্দি গানের জগতে প্রতিষ্ঠিত। ফলে বাংলা ছবিতে তাকে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত ছিল সাহসী এবং ব্যতিক্রমী।
কলকাতায় এসে শুরু হয় তার নতুন লড়াই। বাংলা ভাষা তার কাছে ছিল একেবারেই অচেনা। তবুও শব্দে শব্দে, লাইনে লাইনে তাকে গান শেখান বালসারা ও পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়। দীর্ঘ চর্চা ও নিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তিনি রেকর্ড করেন তার প্রথম বাংলা গান ‘এ হাওয়ায় এ হাওয়ায় কী সুরভি ঝরে’। সেই গানের মধ্য দিয়েই বাংলা প্লেব্যাক জগতে আত্মপ্রকাশ ঘটে তার।
রেকর্ডিংয়ের পর কলকাতার রাস্তায় ঘুরে দেখার ইচ্ছেও প্রকাশ করেছিলেন আশা। চৌরঙ্গির ভিড়ের মধ্যে হেঁটে বেড়ালেও কেউ চিনতে পারেনি ভবিষ্যতের এই কিংবদন্তিকে। তখনও প্লেব্যাক শিল্পীদের মুখ ছিল সাধারণ মানুষের কাছে অচেনা।
এই সফরেই আরেক গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ তৈরি হয়। সুরকার সুধীন দাশগুপ্ত-র সঙ্গে কাজের ইচ্ছা প্রকাশ করেন আশা। পরবর্তীতে তার সুরে একাধিক জনপ্রিয় বাংলা আধুনিক গান গেয়ে নিজের অবস্থান আরও মজবুত করেন তিনি।
এরপর আসে আরেক স্মরণীয় অধ্যায়। ‘কাল তুমি আলেয়া’ ছবিতে সঙ্গীত পরিচালকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন মহানায়ক উত্তম কুমার। এই ছবির জন্য নারী কণ্ঠ নির্বাচন করতে গিয়ে উত্তম কুমারের প্রথম পছন্দ ছিল আশা ভোসলে। যদিও প্রাথমিকভাবে অন্য নামের কথাও উঠেছিল, শেষ পর্যন্ত আশাকেই বেছে নেন তিনি।
মুম্বাইয়ে গিয়ে নিজে উদ্যোগ নিয়ে আশাকে গান শেখানোর ব্যবস্থা করেন উত্তম। রাতের পর রাত অনুশীলনের পর চূড়ান্ত হয় রেকর্ডিং। ১৯৬৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ছবিতে আশা গেয়েছিলেন ‘মনের মানুষ ফিরল ঘরে’ এবং ‘পাতা কেটে চুল বেঁধে’ যা পরবর্তীতে শ্রোতাদের কাছে বিশেষভাবে সমাদৃত হয়।
একটি নতুন ভাষা, নতুন সংস্কৃতি সবকিছুকে আপন করে নিয়ে যে ভাবে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, তা নিঃসন্দেহে বিরল দৃষ্টান্ত। তার কণ্ঠে বাংলা গান পেয়েছে এক অনন্য মাত্রা, যা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
আশা ভোসলের সঙ্গীতজীবন যেন এক মহাসমুদ্র। তিনি সশরীরে না থাকলেও তার গান, তার কণ্ঠ, তার সৃষ্টির বৈচিত্র্য বেঁচে থাকবে যুগের পর যুগ।
পিআর/টিকে