স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রীর বক্তব্যে আইনগত অসংগতি রয়েছে : শিশির মনির
ছবি: সংগৃহীত
০৯:৫৬ পিএম | ১৩ এপ্রিল, ২০২৬
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রীর বক্তব্যে আইনগত অসংগতি রয়েছে বলে দাবি করেছেন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী শিশির মনির। তিনি বলেন, ‘গুম ও মানবাধিকার কমিশন সংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিলের যে ব্যাখ্যা সরকার দিয়েছে, তা আইনগতভাবে সঠিক নয়।’
আজ সোমবার রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং চিফ হুইপের বক্তব্যের প্রেক্ষিতে জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। সংবাদ সম্মেলনে আরো বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের সদস্য ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে গুম (Enforced Disappearance) ‘ক্রাইম এগেইনস্ট হিউম্যানিটি’-এর একটি অংশ, যা বিচারযোগ্য হতে হলে ‘ওয়াইডস্প্রেড’ ও ‘সিস্টেমেটিক’ হতে হয়। কিন্তু কোনো ব্যক্তিকে আলাদাভাবে গুম করার ঘটনা এই আইনের আওতায় পড়ে না। ফলে গুম অধ্যাদেশ ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আইনের সংজ্ঞা এক নয় এ কথা স্পষ্ট।
তিনি আরো বলেন, মানবাধিকার কমিশন আইনে তদন্ত, সময়সীমা ও ক্ষতিপূরণের বিষয়ে কোনো বিধান নেই, সরকারের এমন বক্তব্যও সঠিক নয়। আইনের সংশ্লিষ্ট ধারাগুলোতে ৩০ দিনের সময়সীমা, তদন্ত প্রক্রিয়া এবং ক্ষতিপূরণ আদায়ের বিষয় উল্লেখ রয়েছে।
গণভোট অধ্যাদেশ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকার নিজেই একে ‘ফ্যাক্টাম ভ্যালিড’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। সে ক্ষেত্রে এটি বাস্তবায়নের দায়িত্বও সরকারের ওপর বর্তায়। বৈধতা স্বীকার করে বাস্তবায়ন না করা হলে তার দায় সরকারকেই নিতে হবে। এদিকে বিচারকদের শোকজ নোটিশ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার দাবি, যে আইনের আওতায় নোটিশ দেওয়া হয়েছে, সেটি ইতোমধ্যে সুপ্রিম কোর্ট অসাংবিধানিক বলে ঘোষণা করে বাতিল করেছে। ফলে সেই আইনের ভিত্তিতে শোকজ করাকে তিনি ‘আইনগতভাবে অগ্রহণযোগ্য’ বলে উল্লেখ করেন।
এ ছাড়া ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশে নতুন ধারা সংযোজনের মাধ্যমে আগের মালিকদের কাছে ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। তার মতে, এতে আর্থিক খাতে অনিয়মের দায় নির্ধারণ ও অর্থ পুনরুদ্ধারের বিষয়টি উপেক্ষিত হয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের সদস্য ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সংসদের প্রথম অধিবেশনে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। সংবিধানের ৯৩(ডি) অনুচ্ছেদের ৩০ দিনের সময়সীমা শেষে দেখা যায়, ১১৭টি অধ্যাদেশ পাস হয়েছে—কিছু হুবহু, কিছু সংশোধিত আকারে; ৭টি রহিত এবং ১৬টি ল্যাপস হয়েছে, অর্থাৎ সংসদে উপস্থাপনই করা হয়নি।
তিনি বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও পৃথক সচিবালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার বিষয়গুলো ল্যাপস বা বাতিল করায় জনগণের প্রত্যাশা আন্ডারমাইন হয়েছে।
তিনি জানান, তারা দুই দফায় ওয়াকআউট করেছেন। বিশেষ কমিটিতে মতবিরোধহীন বিষয় পাস ও মতবিরোধপূর্ণ বিষয়ে আলোচনার ‘জেন্টলম্যান অ্যাগ্রিমেন্ট’ থাকলেও তা মানা হয়নি। সংসদে কথা বলার সুযোগ না পাওয়ায় তারা বাইরে এসে বক্তব্য দিয়েছেন। বিশেষ কমিটির প্রতিবেদনে বিরোধী দলসহ কিছু সরকারদলীয় সদস্যের নোট অব ডিসেন্ট অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, যা গণতান্ত্রিক চর্চার পরিপন্থী।
স্থানীয় সরকার অধ্যাদেশে অনির্বাচিত প্রশাসক নিয়োগকে তিনি সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদের পরিপন্থী উল্লেখ করে বলেন, এ কারণেই প্রথম ওয়াকআউট করা হয়; পরে প্রক্রিয়াগত অসঙ্গতির প্রতিবাদে আবারও ওয়াকআউট করা হয়।
ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশের ক্ষেত্রে তিনি বলেন, শেষ মুহূর্তে বিলের কপি দিয়ে ১৮(ক) ধারা সংযোজনের মাধ্যমে পূর্বের মালিকদের কাছে নিয়ন্ত্রণ ফেরানোর সুযোগ রাখা হয়েছে, যা স্বচ্ছতার পরিপন্থী।
তিনি বলেন, বিএনপির একটা ইতিহাস আছে। গত ১৬ বছর দেখে এসেছি তারা সবসময় বলতেন ঈদের পরে আন্দোলন হবে। কিন্তু সেই ঈদ কিন্তু কখনোই আসেনি। এখন যেই বিলগুলার ব্যাপারে তারা আন্তর্জাতিকভাবে চাপের মুখে পড়েছে। সেই মানবাধিকার কমিশন বিল, গুম কমিশনের বিল, স্বাধীন বিচার বিভাগের সচিবালয়ের বিল। তারা বলছেন, অধিকতর সংশোধন করে তারা স্টেকহোল্ডারদের সাথে আলোচনা করে আনবেন। কিন্তু এটা কবে আনবেন, এটা কি আবার সেই ঈদের পরের আন্দোলনের মতো, ১৬ বছর আমাদের অপেক্ষা করতে হবে কি না, এটাই জাতির সামনে প্রশ্ন।
তিনি বলেন, জনগণ যদি তাদের অধিকার বাস্তবায়ন করার জন্য সংসদের ওপর আস্থা হারিয়ে রাস্তায় নেমে আসে সেজন্য জনগণকে দায় দিতে পারবেন না। এর জন্য সরকার দলকে সরকার দলীয় সংসদ সদস্যদেরকে দায় নিতে হবে এই গভমেন্টকে দায় নিতে হবে।
ইউটি/টিএ