পশ্চিমবঙ্গের কবি শ্রীজাতের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি
ছবি: সংগৃহীত
০৬:৫১ এএম | ২৩ এপ্রিল, ২০২৬
পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফার ভোটগ্রহণ আগামীকাল। ভোটের ঠিক আগের দিন বুধবার (২২ এপ্রিল) ওপার বাংলার কবি শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে— এমন তথ্য শোনা যায়। তবে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হওয়ার তথ্য সঠিক হলেও আদালতের এখতিয়ারভুক্ত ইস্যুতে ইসিকে জড়িয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানোর অভিযোগে কলকাতার একটি বেসরকারি সংবাদমাধ্যমকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে রাজ্য নির্বাচন কমিশন। শ্রীজাতও প্রকাশ করেছেন অভিমানী কিছু কথা।
মূলত, কলকাতার পরিচিত মুখ কবি শ্রীজাতর বিরুদ্ধে 'অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট' বা গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হওয়া সংক্রান্ত একটি খবরকে কেন্দ্র করেই এই বিতর্কের সূত্রপাত হয়। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) পক্ষ থেকে যুগ্ম প্রধান নির্বাচন কমিশনার এক চিঠিতে জানিয়েছেন যে, সেই সংবাদমাধ্যমে দাবি করা হয়েছিল ইসির নির্দেশে শ্রীজাতর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে এবং তাকে ভোট প্রক্রিয়ার আগেই আটক করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কমিশন স্পষ্ট জানিয়েছে,এই খবরটি সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
কমিশনের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে যে, গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা আদালতের এখতিয়ারভুক্তবিষয়। এতে নির্বাচন কমিশনের কোনও ভূমিকা থাকে না।
চিঠিতে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী ওই গ্রেফতারি পরোয়ানা কার্যকর করার শেষ তারিখ হলো ২০২৮ সালের ১১ জুন। কিন্তু ভোটের ঠিক আগে এই ধরনের যাচাই না করা তথ্য প্রচার করাকে নির্বাচন আচরণবিধি লঙ্ঘন এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করার এক ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছে কমিশন।
এদিকে, কবি শ্রীজাতর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে বিষয়টি নিয়ে বুধবার বিকেলে আমডাঙার নির্বাচনী জনসভা থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, 'সকাল থেকে পাগল হয়ে গেছি ফোনে-মেসেজে। শ্রীজাতকে নাকি ফোন করেছে কেউ, ‘আপনার বাড়িতে পুলিশ যাচ্ছে। আপনাকে গ্রেফতার করা হবে।’ আমি সঙ্গে সঙ্গে তাকে ফোন করলাম। এ আবার কী! বাইক চলবে না, রেল বন্ধ, এগুলো ইলেকশন কমিশন করছে।'
রাজ্যের দায়িত্বপ্রাপ্ত জাতীয় নির্বাচন কমিশনের বিশেষ পর্যবেক্ষক সুব্রত গুপ্ত বলেন, শ্রীজাতর বিরুদ্ধে তারা আলাদা কোনও নির্দেশ জারি করেননি। এই খবর পুরোটা মিথ্যা। শ্রীজাত চাইলে সরাসরি নির্বাচন কমিশনে ফোন করে বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে নিতে পারেন।
কবি শ্রীজাত বলেন, ‘আমি যেটুকু শুনেছি, কয়েক বছর আগে একটি মামলা হয়েছিল। সেই মামলায় এ ধরনের গ্রেফতারি পরোয়ানার জারি করা হয়েছে। এটিই বলে দেয়, আমরা কোন সময় বাস করছি। দার্শনিক প্লেটো বলেছিলেন, আদর্শ রাষ্ট্রে কবির কোনো জায়গা হতে পারে না। আমরা হয়তো আদর্শ রাষ্ট্র হওয়ার দিকে এগোচ্ছি, যেখানে কবির কোনো জায়গা নেই।’
শ্রীজাত বলেন, ‘গলা খুলে, মাথা তুলে কথা বলা তো নানান সমাজে অন্যায় বলে বিচার করা হয়। হয়তো সেই অন্যায় আমার একটু বেশি হয়ে গেছে, তার মাশুল দিতে হবে।’
তিনি বলেন, 'এখানে আরও একটা কথা বলা দরকার বলে আমার মনে হয়। এই খবরটি ভুয়া বলে প্রচার করাও হচ্ছে। শুনছি নির্বাচন কমিশন বলেছে, এই খবর ভুয়া। আমি বা আমরা গ্রেফতারি পরোয়ানার জন্য কাউকে দায়ী করার আগেই কেন নির্বাচন কমিশন এই উত্তর দিতে এগিয়ে এল, সেটা আমার কাছে প্রশ্নের বিষয়। নির্বাচন কমিশন থেকে নাকি এও বলা হয়েছে, চাইলে আমি তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারি। আমি কেন নিজে থেকে এগিয়ে গিয়ে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করব, সেটা আমার কাছে স্পষ্ট নয়। এর জেরে বিপুল রকমের ভ্রান্তি ছড়াচ্ছে এই নির্বাচনের মুখে। তা একেবারেই কাম্য নয়।'
মূলত, ২০১৭ সালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা একটি কবিতার জেরেই এই গ্রেফতারি পরোয়ানা। পরোয়ানাটি জামিন অযোগ্য। ওই সময় উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে যোগী আদিত্যনাথ শপথ নেওয়ার পর শ্রীজাত তার ফেসবুকে ‘অভিশাপ’ শীর্ষক ১২ লাইনের একটি কবিতা প্রকাশ করেন। কবিতার শেষ দুই লাইনের শব্দচয়ন নিয়ে বড়সড় বিতর্কের সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন হিন্দুত্ববাদী সংগঠন দাবি করে, কবি হিন্দুদের পবিত্র প্রতীক ‘ত্রিশূল’ নিয়ে কুরুচিকর মন্তব্য করে হিন্দুধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করেছেন।
সেই কবিতা প্রকাশের পর অর্ণব সরকার নামের শিলিগুড়ির এক কলেজছাত্র শিলিগুড়ি থানায় শ্রীজাতের বিরুদ্ধে সাইবার অপরাধের অভিযোগে লিখিত অভিযোগ করেন। ভারতীয় দণ্ডবিধির ২৯৫–এ (ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত) এবং তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৬৭ ধারায় মামলাটি করা হয়।
সেই সময় শ্রীজাতের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়সহ বাংলার বুদ্ধিজীবী মহলের বড় অংশ। তার সুরক্ষায় রাজ্য সরকারের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। সেই মামলার জেরেই আদালত তার বিরুদ্ধে এখন জামিন অযোগ্য গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন।
টিজে/টিএ