গাজায় বিশুদ্ধ পানির সংকট চরমে, আরও বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি
ছবি: সংগৃহীত
১২:৩৬ পিএম | ২৭ এপ্রিল, ২০২৬
ইসরায়েলি হামলায় গাজার বেসামরিক অবকাঠামোর বড় অংশই ধ্বংস হয়ে গেছে। যার মধ্যে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ ও পয়ঃবর্জ্য ব্যবস্থাপনাও রয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও স্বাস্থ্যে। বিশুদ্ধ পানি ও ন্যূনতম স্যানিটেশন সুবিধার অভাবে গাজায় এখন জনস্বাস্থ্য বিপর্যয় তৈরি হয়েছে। প্রতিদিনই বাড়ছে পানিবাহিত রোগ, সংক্রমণ ও মানসিক চাপ।
আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সংস্থা ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস (এমএসএফ) জানিয়েছে, সংকট এতটাই তীব্র যে, অনেকে ক্ষতস্থান পরিষ্কার করতে না পারায় সেখানে পোকা জন্মাচ্ছে। নিরাপদ পানি না পেয়ে নারী ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ছে।
সংগঠনটির জরুরি মানবিক বিষয়ক ব্যবস্থাপক লরেলিন ল্যাসের বলেছেন, বিশুদ্ধ পানি ও মৌলিক স্যানিটেশন সুবিধার অভাবে ফিলিস্তিনিরা ক্রমাগত অসুস্থ হয়ে পড়েছে। আমরা প্রতিদিন অসংখ্য রোগের চিকিৎসা করছি। যেগুলোর মূল কারণ বিশুদ্ধ পানির অভাব, সাবানের সংকট এবং অত্যন্ত ঘিঞ্জি জীবনযাপন।
ল্যাসের আরও জানান, অনেককেই প্রতিদিনই এক ভয়াবহ প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। পানি দিয়ে কী করবেন? পিপাসা মেটাবেন, রান্না করবেন, নাকি ধোয়ার কাজ করবেন? তাকে তিনটির একটিকে বেছে নিতে হবে। এর ফলে নারীরা বিশেষভাবে বিপজ্জনক অবস্থার মুখে পড়ছেন। তার দৈনন্দিন প্রয়োজন বা সন্তান প্রসবের পরেও নিজেদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে পারেন না। যা সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, বিশুদ্ধ পানির অভাবে শিশুরা বারবার অসুস্থ হয়ে পড়ছে।
পানি পৌঁছাতে গিয়ে প্রাণ হারাচ্ছেন কর্মীরা
এপ্রিলের মাঝামাঝি সময় থেকে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। ইসরায়েলের হামলায় পানি সরবরাহকর্মীও নিহত হচ্ছেন। চার দিনের ব্যবধানে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় একজন পানি প্রকৌশলী এবং দুজন চালক নিহত হন। এর ফলে পানি সরবরাহ ব্যবস্থা আরও দুর্বল হয়ে পড়েছে। প্রতিরোধযোগ্য রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
গাজার উপকূলীয় পৌরসভাগুলোর পানি সরবরাহ সংস্থার উপ-পরিচালক ওমর শাতাত বলেন, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে পানি সরবরাহ ও মেরামত কাজে নিয়োজিত অন্তত ১৯ জন কর্মী নিহত হয়েছেন।
সর্বশেষ হামলাটি চালানো হয় উত্তর গাজার আল-জেইন কূপে, যেখানে কাজ করার সময় পানি প্রকৌশলীদের ওপর আঘাত হানা হয়। এতে একজন নিহত ও চারজন আহত হন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, হামলায় আশপাশের মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পানির উৎসটি গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যায়। ফলে হাজার হাজার মানুষ পানি সংকটে পড়েছে।
এর চার দিন আগে উত্তর গাজার প্রধান পানি সংগ্রহ কেন্দ্রে ইউনিসেফ-এর দুই চালককে গুলি করে হত্যা করা হয়। সংস্থাটি জানিয়েছে, এ ধরনের হামলা গাজার লাখো মানুষের কাছে বিশুদ্ধ পানি পৌঁছে দেওয়ার মানবিক কার্যক্রমকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলছে।
ইউনিসেফের উদ্বেগজনক তথ্য
জাতিসংঘের মানদণ্ড অনুযায়ী, মৌলিক স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে একজন মানুষের দৈনিক ৫০ থেকে ১০০ লিটার পানি প্রয়োজন। কিন্তু ইউনিসেফের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, গাজায় প্রতিদিন গড়ে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৭ লিটার পানযোগ্য পানি এবং গৃহস্থালির কাজে ব্যবহারের জন্য পাওয়া যাচ্ছে ১৬ লিটার পানি। আরও ভয়াবহ সত্য হলো, অধিকাংশ মানুষ দৈনিক ন্যূনতম ৬ লিটার পরিষ্কার ও নিরাপদ পানের পানি থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন। ফলে পানিশূন্যতা, নোংরা পানিবাহিত রোগ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি প্রতিদিনই বাড়ছে।
খান ইউনিসের বাসিন্দা ৩৮ বছর বয়সী ওমর সা'দা জানান, একটি পানির ট্রাক দিয়ে ৫০টিরও বেশি পরিবারকে পানি দেওয়া হয়। ভোর ৬টার মধ্যে উঠে লাইনে দাঁড়াতে হয়, কিন্তু এখন পানি পাওয়া যায় মাত্র দুই ঘণ্টা। পানির অভাবে গোসল ও কাপড় ধোয়া কমিয়ে দেওয়ায় তার সন্তানদের ত্বকে সংক্রমণ দেখা দিয়েছে।
আল-কারারা এলাকার বাসিন্দা নেসমা রাশওয়ান বলেন, সপ্তাহে মাত্র একবার পানির ট্রাক আসে, আর সেই পানিও নিরাপদ নয়। প্রায় এক বছর ধরে তৃষ্ণা মেটায় এমন বিশুদ্ধ পানি পাই না। বাধ্য হয়ে সন্তানদের সমুদ্রে গোসল করিয়ে এনে সামান্য মিষ্টি পানি দিয়ে ধুয়ে দিতে হয়।
বিধিনিষেধের কবলে স্বাস্থ্যবিধি পণ্য
এদিকে সাবান, ওয়াশিং পাউডারসহ স্বাস্থ্যবিধি পণ্যের ওপর ইসরায়েলি বিধিনিষেধের কারণে বাজারে দাম বেড়েছে। এতে জনাকীর্ণ আশ্রয়কেন্দ্র ও তাঁবুতে বসবাস করা মানুষের জন্য পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। দেইর আল-বালাহর এক দোকানদার আনোয়ার আল-মাগরিবী বলেন, ‘৭ কেজির এক প্যাকেট ডিটারজেন্টের দাম ৫০ শেকেল থেকে বেড়ে ১০০ শেকেল বা তারও বেশি হয়েছে।’
সূত্র: গার্ডিয়ান
এমআর/টিএ