যশোরে জনসভায় প্রধানমন্ত্রীকাউকে জনগণের শান্তি নষ্ট করার সুযোগ দেওয়া হবে না
ছবি: সংগৃহীত
০৯:০৫ এএম | ২৮ এপ্রিল, ২০২৬
জনগণের শান্তি নষ্ট করার সুযোগ কাউকে দেওয়া হবে না বলে হুঁশিয়ার উচ্চারণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, ‘যারা দেশ স্বাধীনের সময়, দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় মানুষকে বিভ্রান্তির চেষ্টা করেছিল, যারা ’৮৬ সালে বিভ্রান্তি করেছিল, যারা ’৭১ সালে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছিল, যারা ২০০৯ সালে বিভ্রান্তি করেছিল; ঠিক এসব ব্যক্তি আজ আবার এসে ২০২৬ সালে বিভ্রান্তির চেষ্টা করছে।’
গতকাল সোমবার বিকেলে যশোরের কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানে জেলা বিএনপি আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন দলটির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময় জুলাই সনদ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সংসদে পাস করানোর প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিএনপির কাছে কী কী অগ্রাধিকার, আপনাদের সঙ্গে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরতে চাই। বিএনপিসহ সব রাজনৈতিক দল মিলে আমরা সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় জুলাই সনদ সই করেছি। বাংলাদেশের মানুষ ভোটের মাধ্যমে রায় দিয়েছে, যে জুলাই সনদ দক্ষিণ প্লাজায় সই করা হয়েছে, সে জুলাই সনদ পাস করতে হবে। সেজন্যই আমরা বলেছি, এই জুলাই সনদ আমরা দক্ষিণ প্লাজায় সই করেছি, সেই জুলাই সনদের প্রতিটি শর্ত প্রত্যেকটি লাইন ইনশাল্লাহ বিএনপি সংসদে পাস করবে।’
‘দেশের জনগণই বিএনপির রাজনীতি’ উল্লেখ করে দলটির চেয়ারম্যান বলেন, ‘দেশের মানুষের স্বার্থে জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার অসমাপ্ত কাজ শেষ করবে এ সরকার।’ দেশের জনগোষ্ঠীর অর্ধেক নারীকে পেছনে ফেলে কোনো উন্নয়ন সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। বিএনপির ওপর দেশের মানুষের আস্থা রয়েছে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ‘সরকারের পরিকল্পনাগুলো বাধাগ্রস্ত করতে চায় একটি মহল, যারা নির্বাচনের আগে জান্নাতের টিকিট বিক্রি করেছিল।’
তিনি বলেন, ‘জনগণের শান্তি নষ্ট করবে, এমন কাজ করতে দেওয়া হবে না। কোনো টিকিট বিক্রি নয়, জনগণের জন্য কাজ করবে বিএনপি সরকার। বিভ্রান্তকারীরা বিভ্রান্তি ছড়াবে, আর বিএনপি জনগণের জন্য কাজ করবে।’
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এর আগে সকাল সোয়া ১০টায় ঢাকা থেকে যশোর বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। দুপুর ১২টায় শার্শায় শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত উলশী খাল পুনর্খননের উদ্বোধন করেন এবং সুধী সমাবেশে বক্তব্য দেন। এরপর দুপুর ২টায় যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধন করেন। পরে তিনি যশোর ইনস্টিটিউট পাবলিক লাইব্রেরি পরিদর্শন করেন। বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে যশোর কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানে আয়োজিত জনসভায় ভাষণ দেন।
নারীদের ‘এলপিজি কার্ড’ দেওয়ার ঘোষণা: মেয়েদের শিক্ষা ব্যবস্থা স্নাতক ও ডিগ্রি পর্যন্ত বিনামূল্যে করার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে নারীদের রান্নার কষ্ট লাঘবে এবার ‘এলপিজি কার্ড’ দেওয়ারও ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। মা-বোনদের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মা-বোনদের একটি কারণে খুব কষ্ট হয়, রান্নাবাড়ির ব্যাপারে কষ্ট হয়; সেটি গ্রামের মা-বোনই হোক, শহরের মা-বোনই হোক। আমরা যেমন সারা দেশের মায়েদের কাছে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দিচ্ছি, সেরকম আরেকটি কাজ দিতে চাই; সেটি হবে এলপিজি কার্ড। এলপি গ্যাস এটি আমরা মা-বোনদের পৌঁছে দেব, যাতে তাদের রান্নাবান্নার জন্য কষ্ট করতে না হয়।’
মেয়েদের শিক্ষা স্নাতক পর্যন্ত বিনামূল্যে: নারী শিক্ষা প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, ‘দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯১ থেকে ’৯৬ সাল পর্যন্ত যখন দেশ পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন, মা-বোনদের শিক্ষিত করার জন্য শিক্ষা ব্যবস্থা মেট্রিক পর্যন্ত ফ্রি করে দিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে দেশনেত্রী খালেদা জিয়া যখন ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন, তখন ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত শিক্ষা ব্যবস্থা ফ্রি করে দিয়েছিলেন। তার অসমাপ্ত কাজ পূরণের লক্ষ্যে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, মেয়েদের শিক্ষা ব্যবস্থা স্নাতক ও ডিগ্রি পর্যন্ত বিনামূল্যে করব। শুধু মেয়েদের শিক্ষা ব্যবস্থা আমরা ডিগ্রি পর্যন্ত ফ্রি করব না, একই সঙ্গে আমাদের যে মেয়েরা ভালো রেজাল্ট করতে পারবে, তাদের জন্য উপবৃত্তির ব্যবস্থা করব; যাতে তারা আরও উচ্চতর শিক্ষা লাভ করতে পারে।’
খাল খনন কর্মসূচি: জনসভায় খাল খনন কর্মসূচি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মানুষের কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, বিএনপি ক্ষমতায় এসে দেশের মানুষের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠনে সক্ষম হলে দেশে আমরা শহীদ জিয়ার রেখে যাওয়া সেই খাল খনন কর্মসূচি শুরু করব। ইনশাআল্লাহ আগামী ৫ বছরে আমরা চেষ্টা করব সারা দেশে এই উলশী খালের মতো প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল আমরা খনন করতে। এতে গ্রামের মানুষ, কৃষক ভাইবোনরা, এলাকাবাসী এবং তরুণরা তাদের বিভিন্ন রকম আয়-রোজগারের সুবিধা সেখান থেকে করতে পারে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা নির্বাচনের আগে বলেছিলাম মা-বোনদের স্বাবলম্বী করার জন্য ফ্যামিলি কার্ড দেব। ইনশাআল্লাহ আগামী ৫ বছরের মধ্যে আমরা চেষ্টা করব দেশের সব গ্রামে সব মায়ের হাতে এই ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেওয়ার। আমরা ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে প্রত্যেক মায়ের কাছে, প্রত্যেক নারী পরিবারের প্রধানের কাছে মাসে আড়াই হাজার টাকা করে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করব, যাতে করে তারা তাদের সন্তানদের দেখভাল করতে পারেন; সন্তানের পড়াশোনা, দেখাশুনা করতে পারেন। হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল লালন-পালন করে তারা যাতে নিজেদের রুটি-রোজগারের ব্যবস্থা করতে পারেন, সে ব্যবস্থা আমরা করতে চাই।’
কৃষক ও শ্রমিকদের কল্যাণে নেওয়া পদক্ষেপ: কৃষক ও শ্রমিকদের কল্যাণে নেওয়া পদক্ষেপগুলো তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা বলেছিলাম, বিএনপি সরকার গঠন করলে কৃষক ভাইদের জন্য কৃষি কার্ড দেব; কৃষক ভাইদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ মওকুফের ব্যবস্থা করব। আল্লাহর রহমতে আমরা সেই কাজও শুরু করেছি। সরকার গঠনের প্রথম ১০০ দিনের মধ্যেই আমরা কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করেছি।’
বন্ধ কলকারখানা চালুর ঘোষণা: বিভিন্ন চিনিকল ও কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে বহু মানুষ বেকার হয়ে গেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের অনেক কলকারখানা বন্ধ রয়েছে। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে কিছু কলকারখানা চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এগুলো চালু হলে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হবে। পাশাপাশি অনেক দেশে জনশক্তি রপ্তানি সীমিত ও বন্ধ রয়েছে। সেসব দেশের সঙ্গে আমাদের আলোচনা চলছে। দ্রুতই অনেক দেশে আমরা জনশক্তি রপ্তানিতে গতি আনতে পারব।’
সব ধর্মের মানুষের প্রতি সম্মান জানিয়ে সরকারপ্রধান বলেন, ‘আমরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম যে মসজিদের ইমাম, খতিব ও মুয়াজ্জিনসহ সব ধর্মের ধর্মগুরুদের জন্য সরকারিভাবে সম্মানীর ব্যবস্থা করব। আলহামদুলিল্লাহ, সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন এরই মধ্যে শুরু করেছি। দেশের মানুষের সমর্থন নিয়ে বিএনপি যতদিন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকবে, জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিটি জবান আমরা অক্ষরে অক্ষরে পালন করার আপ্রাণ চেষ্টা করব।’
জেলা বিএনপি সভাপতি সৈয়দ সাবেরুল হক সাবুর সভাপতিত্বে জনসভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান নার্গিস বেগম, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ প্রমুখ। জনসভা পরিচালনা করেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন খোকন।
এর আগে দুপুর ১২টায় শার্শা উপজেলার উলাশী এলাকায় দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা ও পানি নিষ্কাশন সমস্যার সমাধানে খাল পুনর্খনন কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। পাঁচ দশক আগে জিয়াউর রহমানের যেখান থেকে খাল খনন কর্মসূচি শুরু করেছিলেন, সেই উলশী খাল পুনর্খনন কার্যক্রম উদ্বোধন করলেন তার ছেলে তারেক রহমান। কোদাল দিয়ে মাটি কেটে এ খনন কার্যক্রমের সূচনা শেষে খালপাড়ে সুধী সমাবেশে বক্তব্য দেন। এরপর দুপুর ২টায় তিনি যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধন করেন।
এবি/টিএ