শিক্ষায় চারটি বড় বাধা, অন্যতম হলো কম বরাদ্দ : সিপিডি
ছবি: সংগৃহীত
০৭:৪৭ পিএম | ০৭ মে, ২০২৬
শিক্ষায় চারটি বড় বাধা রয়েছে, যার মধ্যে অন্যতম কম বরাদ্দ। এক সময় শিক্ষায় বরাদ্দ জিডিপির ২ শতাংশ থাকতো, নামতে নামতে তা এখন ১ দশমিক ৮ শতাংশ হয়েছে। যে ব্যয় হয়, তাও ‘কাজীর গরু কিতাবে আছে, গোয়ালে নেই' -এর মতো অবস্থা।
বৃহস্পতিবার (৭ মে) রাজধানীতে ‘সরকারের অগ্রাধিকার ও শিক্ষা খাত : বাজেট ও বাস্তবতা’ শীর্ষক এক নাগরিক সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনের সময় সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) অতিরিক্ত পরিচালক (গবেষণা) তৌফিকুল ইসলাম খান এসব কথা বলেন।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ও অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের সভাপতিত্বে সংলাপে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণস্বাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ, স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা ও সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ উপস্থিত ছিলেন।
সংলাপে তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, শিক্ষায় একটা সংস্কার লাগবে। শিক্ষার ক্ষেত্রে আমরা সরকারের ৫০টি ঘোষণা পেয়েছি। সরকারের মাত্র তিন মাসও হয়নি। শিক্ষায় চারটি বড় বাধা আছে। যার মধ্যে রয়েছে, স্বল্প বাজেট ও বিনিয়োগ, শিক্ষার গুণগত মান ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার অভাব, বৈষম্যমূলক শিক্ষা কাঠামো এবং কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় অবহেলা।
তিনি আরও বলেন, বড় বাধার মধ্যে একটি হলো শিক্ষায় বরাদ্দ কম। এক সময় শিক্ষায় বরাদ্দ জিডিপির ২ শতাংশ থাকতো, নামতে নামতে তা এখন বরাদ্দ ১ দশমিক ৮ শতাংশ হয়েছে। মুশকিলটা হলো যেটা আসলে ব্যয় হয়— ‘কাজীর গরু কেতাবে আছে, গোয়ালে নেই’-এর মতো অবস্থা। গোয়ালে আছে ১ দশমিক ৩ শতাংশ।
প্রবন্ধ উপস্থাপনায় নতুন সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার প্রসঙ্গে তৌফিকুল ইসলাম বলেন, সামগ্রিকভাবে বিবেচনা করলে দেখা যায়, শিক্ষাখাতের কাঠামোগত সমস্যাগুলোর সমাধানের সঙ্গে বিভিন্ন অঙ্গীকার অর্জন ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। ইশতেহারের শিক্ষার অভিগম্যতা, দুর্গম এলাকায় ঝরে পড়া রোধ, সর্বজনীন প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা সম্প্রসারণ এবং ভৌগোলিক ও সামাজিক বৈষম্য হ্রাসের অঙ্গীকার রয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষার মানের অবনমন এবং প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিকে উত্তরণের দুর্বলতাকে সরাসরি মোকাবিলা করার প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
শিক্ষার মানের ক্ষেত্রে, কারিগরি শিক্ষার প্রসার, মাদ্রাসা শিক্ষার সংস্কার, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক শিক্ষার অন্তর্ভুক্তি, সৃজনশীলতা ও বিশ্লেষণধর্মী চিন্তার ওপর জোর এবং মেধাবী শিক্ষক নিয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার রয়েছে। এতে বুঝা যায়, শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা দক্ষতা বিকাশকে সীমাবদ্ধতা করে দিচ্ছে, সে সম্পর্কে সচেতনতা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে।
তিনি বলেন, মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ, বিনামূল্যে ওয়াই-ফাই এবং শিক্ষা বিষয়ক টেলিভিশন চ্যানেল- এগুলো শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রযুক্তিগত ঘাটতি পূরণের লক্ষ্যকে সামনে রেখে প্রণীত হয়েছে। এগুলো অতীতের মতো শুধুমাত্র যন্ত্রপাতি সরবরাহে সীমাবদ্ধ থাকার ঝুঁকি বহন করে। কাঠামোগত বড় পরিবর্তন সম্ভব হতে পারে যদি শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করা যায়। তবে কেবল অর্থায়নই শিক্ষা খাতের গভীরে প্রোথিত সমস্যাগুলোর সমাধান করতে সক্ষম নয়।
সিপিডির প্রবন্ধে আরও বলা হয়, শিক্ষাখাত এখন এমন একপর্যায়ে এসে পৌঁছেছে যেখানে শুধু সংখ্যাগত সাফল্য দিয়ে প্রকৃত অগ্রগতি পরিমাপ করা আর সম্ভব নয়। অর্জিত সাফল্যের ভিত্তিতে পরবর্তী ধাপের উন্নয়নের জন্য শিক্ষা খাতে গভীর সংস্কার এখন অত্যাবশ্যক হয়ে উঠেছে। এটি এখন সময়ের দাবি। শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও প্রত্যাশিত শিখন ফল অর্জিত না হওয়া ইঙ্গিত করে যে সমস্যাটি শুধু শিক্ষায় প্রবেশাধিকারের নয়; বরং এটি শিক্ষার গুণগত মান, শিখন পদ্ধতি, মূল্যায়ন এবং সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার বিদ্যমান সীমাবদ্ধতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের শিক্ষাখাত এখন একটি যুগ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে রয়েছে। শিক্ষাকে শুধুমাত্র একটি খাত হিসেবে নয়, বরং সামগ্রিক জাতীয় উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করে পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ করতে হবে। তাহলেই কেবলমাত্র শিক্ষাখাতের বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করা সম্ভব হবে। সঠিক নীতি, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং ভবিষ্যৎমুখী দৃষ্টিভঙ্গি নেওয়া গেলে এই চ্যালেঞ্জগুলোকে সম্ভাবনায় রূপান্তর করা সম্ভব হবে। বর্তমান সীমাবদ্ধতাগুলো ভবিষ্যতের উন্নয়ন সম্ভাবনাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
সংলাপে প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, প্রশিক্ষণ না দিয়ে আমরা কাউকে ক্লাসরুমে ঢোকাবো না। এ সিদ্ধান্তের কারণে সাড়ে ১৪ হাজার শিক্ষক আমার বিরুদ্ধে মিছিলও করেছেন। কিন্তু আমরা আমাদের অবস্থানে অনড় রয়েছি। গত বছর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে চলতি বছর নিয়োগ পাওয়া প্রায় সাড়ে ১৪ হাজার শিক্ষকের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলছে। প্রশিক্ষণ শেষ হলে আগামী চার থেকে ছয় মাসের মধ্যে তাদের শ্রেণিকক্ষে পাঠানো হবে।
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়েও সরকার কাজ করছে জানিয়ে তিনি বলেন, বেসরকারি স্কুলগুলোর সঙ্গে আমরা বসছি। কীভাবে তাদের আরও কার্যকর নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনা যায়, সেটি নিয়ে কাজ করছি। শিক্ষা কমিশন হলে ভালো। তবে সরকার যেন জবাবদিহিতার বাইরে চলে না যায়, সে বিষয়ে নাগরিক সমাজকে ভূমিকা রাখতে হবে। সরকারের সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের ডাকেন, প্রশ্ন করেন। উত্তরের মাধ্যমে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব।
দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে মন্তব্য করে ববি হাজ্জাজ বলেন, অনেক মেরামতের কাজ বাকি আছে। আমরা ধাপে ধাপে সংস্কারের চেষ্টা করছি। আগামী দিনে ১০ বছরের নিচের সব ধরনের শিক্ষাকে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে এনে একই ধরনের কারিকুলামের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
আরআই/টিকে