© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

মুক্তিযুদ্ধ শেষ হলেও শেষ হয়নি নারীর জীবনসংগ্রাম

শেয়ার করুন:
মুক্তিযুদ্ধ শেষ হলেও শেষ হয়নি নারীর জীবনসংগ্রাম

ছবি: সংগৃহীত

মোজো ডেস্ক
০৬:২২ পিএম | ০৯ মে, ২০২৬
স্বামীকে নিয়ে কৃষিজীবী পরিবারে মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করছিলেন নেত্রকোনার সাজেদা। মুক্তিযুদ্ধে স্বামী মারা যাওয়ার পর তার ভাসুর বাড়িঘর এবং জমি দখল করে নেন। স্বাধীন দেশে ১৫ বছর পর মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয়দের সহযোগিতায় স্বামীর ভিটায় একটু জায়গা মেলে।

শহীদজায়া সাজেদার ভাষ্য, ‘দেশের যুদ্ধ শেষ হয়ে গিয়েছিল, আমার যুদ্ধ চলতেই থাকলো। আমি কোথাও গিয়ে আশ্রয় পাইনি। নিজেকে খেয়ে পরে বাঁচতে হলে লোকের ঘরে কাজ করে খাওয়া ছাড়া কোনো পথ আমার ছিল না। দিনে কাজ করেছি, রাতে কেঁদে বালিশ ভিজিয়েছি।’

মুক্তিযুদ্ধে উপার্জনক্ষম পরিবার প্রধানকে হারিয়েছিলেন বিপুল সংখ্যক শহীদ জায়া, সংসার জীবনে আকস্মিকভাবে কঠোর বাস্তবতার মুখোমুখি হন তারা। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে কীভাবে এই নারীরা সংসারের হাল ধরতে বাধ্য হন, সন্তান-সন্ততিদের সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করেন কিংবা করতে ব্যর্থ হন- তা অনুধাবনে এই নারীদের জীবনসংগ্রাম নিয়ে ‘মুক্তিযুদ্ধে পরিবার-প্রধানহারা নারীর জীবনসংগ্রাম’ শীর্ষক গবেষণাকর্ম পরিচালনা করেছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। 

এই প্রয়াসের মুখ্য গবেষক ছিলেন জাদুঘরের গবেষণা ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপক ড. রেজিনা বেগম।

শনিবার মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের সেমিনার হলে গবেষক রেজিনা বেগম গবেষণাকর্মটির প্রাথমিক পর্যায় উপস্থাপন করেন। প্যানেল আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন শহীদজায়া শ্যমলী নাসরিন চৌধুরী, অধ্যাপক মেঘনা গুহঠাকুরতা এবং অধ্যাপক আবু মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন।

১৩০জন শহীদজায়াকে নিয়ে গবেষণাটি পরিচালনা করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধকালীন তাদের কেউ একক পরিবারে, কেউ আবার যৌথ পরিবারে বসবাস করতেন। যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের কেউ কৃষক, ব্যবসায়ী, চাকুরীজীবী, শিক্ষক, ডাক্তার, মেকানিক, রিকশাচালকও ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় কোনো কোনো নারী ছিলেন অন্তঃসত্ত্বা। তারা পরিবারপ্রধানকে হারিয়ে কেউ শরণার্থী ক্যাম্পে, কেউ আত্মীয়র বাড়িতে আশ্রয় নেন। যুদ্ধের পর চলে তাদের আরেক লড়াই।

রেজিনা বেগম বলেন, ‘স্বামীর মৃত্যুর পর অনেক শহীদজায়া তার স্বামীর বাড়িতে জায়গা পায়নি। তার সম্পত্তির উত্তরাধিকার হতে পারেননি। বিপুল সংখ্যক নারী পরিবারের প্রধান বা উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে অনিশ্চিত জীবনের মুখোমুখি হন। এই শহীদজায়াদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ অর্থ উপার্জনে সম্পৃক্ত ছিলেন না, পাশাপাশি তাদের বয়স এবং শিক্ষাগত যোগ্যতায় বিবেচনায়ও তারা প্রান্তিক গোষ্ঠীর অন্তর্গত ছিলেন।’

সেমিনারে সূচনা বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি সারা যাকের বলেন, আমাদের জীবনে নানাভাবে মুক্তিযুদ্ধ প্রভাবিত করেছে। মুক্তিযুদ্ধে অনেক পরিবারে উপর্জনক্ষম প্রধান ব্যক্তিটিই মারা গেছেন। সেই পরিবারের যে জীবন-সংগ্রাম, তা ওঠে আসছে এই গবেষণাপত্রে।

জাদুঘরের আরেক ট্রাস্টি সারওয়ার আলী বলেন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বস্তুনিষ্ঠভাবে তুলে ধরতে গবেষণার কোনো বিকল্প নেই। এটি প্রাথমিক গবেষণাপত্র। এটিকে সমৃদ্ধ করা গেলে মুক্তিযুদ্ধের একটা অনালোচিত অধ্যায় নতুন চিন্তার খোরাক যোগাবে। মুক্তিযুদ্ধ যে ১৬ ডিসেম্বর শেষ হয়ে যায়নি, বরং যুদ্ধে স্বামীহারা কিংবা পরিবারের প্রধান ব্যক্তিটিকে হারিয়ে যে অথৈ লড়াই করেছেন আমাদের মায়েরা, তা উঠে আসবে।

শহীদজায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী বলেন, সেসব লড়াকু মায়েদের কথা আমরা মনে রাখিনি। গবেষককে ধন্যবাদ জানাই, তিনি তাদের সেই অজানা কথা তুলে এনেছেন। এ ধরণের গবেষণা আরো বড় পরিসরে হওয়া জরুরি। মুক্তিযুদ্ধকে যারা ভুলে যেতে চায়, তাদের বুঝতে হবে মুক্তিযুদ্ধ এই দেশের অস্তিত্ব।

মেঘনাগুহ ঠাকুরতা বলেন, এই গবেষণা থেকে আরো অনেক গবেষণার দ্বার খুলে যাবে।

গবেষণাপত্রটিকে সমৃদ্ধ করতে নানা রকম পরামর্শ দেন অধ্যাপক আবু মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন। এই গবেষণাটি একটি প্রাথমিক ভিত্তি হতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি এখনো বই আকারে প্রকাশ যেহেতু হয়নি। তাই বলা যায়, এটি প্রাথমিক পর্যায়ে আছে।এই কাজটি একটি নতুন দিগন্তের উন্মোচন করবে। এটি আরও বড় পরিসরে করা উচিত।


ইউটি/টিএ

মন্তব্য করুন