© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

হরমুজ প্রণালিতে ইরানের ছোট নৌকার ঝাঁক যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিচ্ছে

শেয়ার করুন:
হরমুজ প্রণালিতে ইরানের ছোট নৌকার ঝাঁক যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিচ্ছে

ছবি: সংগৃহীত

মোজো ডেস্ক
০১:০০ পিএম | ১৫ মে, ২০২৬
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, তিনি ইরানের নৌবাহিনীকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছেন, যা এখন মেশিনগান লাগানো ছোট ছোট নৌকায় সীমাবদ্ধ। কিন্তু এসব ছোট নৌকা- যেগুলোকে কিছু পশ্চিমা বিশ্লেষক মশা নৌবহর হিসেবে অভিহিত করেন, এগুলোর 'হুল'ও আছে।

কয়েক মাস ধরে বিশ্বের জাহাজ চলাচলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালিতে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি করতে ইরানের শাসকদের সহায়তা করছে এই নৌকাগুলো। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর লক্ষ্য বিশ্ব অর্থনীতিতে আঘাত হানা এবং ওয়াশিংটনকে তেহরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ থেকে সরে আসতে চাপ সৃষ্টি করা। কিন্তু এই 'মশা নৌবহর' আসলে কী এবং এটি এত কার্যকর প্রমাণিত হলো কীভাবে?

ছোট ও দ্রুতগতির আক্রমণকারী নৌকার এই বহরটি ১৯৮০-এর দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় তৈরি করেন ইরানের শাসকেরা। যদিও তখন ইরান-ইরাকের মধ্যে যুদ্ধ চলছিল, তবে ১৯৮০-এর দশকের সেই 'ট্যাংকার যুদ্ধ' পারস্য উপসাগরেও ছড়িয়ে পড়ে এবং তেলের জাহাজ চলাচলের সুরক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র সম্পৃক্ত হয়। ওই সময় মার্কিন নৌবাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে ইরানের প্রচলিত নৌবহর বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে। এরপর শক্তিশালী নৌবাহিনীর মোকাবিলার জন্য ছোট ছোট নৌকার এই বহর তৈরি করা তাদের সামরিক কৌশলের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। এটি ইরানের বিস্তৃত সামরিক কৌশলেরই একটি অংশ; যেখানে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, নৌ-মাইন, উপকূলভিত্তিক উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা এবং পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে তাদের মিত্র গোষ্ঠীগুলোর হামলাও অন্তর্ভুক্ত।

ক্ষমতাধর ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসি পরিচালিত এই বহরটি প্রচলিত নৌযুদ্ধের জন্য তৈরি নয়; বরং হয়রানি করা, ঘিরে ফেলা, বিভ্রান্ত করা এবং জাহাজ চলাচল ব্যাহত করার জন্য বলেন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব টেনেসির সহযোগী অধ্যাপক সাঈদ গোলকার। তিনি ইরানি শাসকদের বিরোধী অলাভজনক প্রতিষ্ঠান 'ইউনাইটেড অ্যাগেইনস্ট নিউক্লিয়ার ইরান (ইউএএসআই)'-এর জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা পদেও নিযুক্ত আছেন।

তিনি বলেন, আইআরজিসি জানে যে প্রচলিত নৌযুদ্ধে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে পরাজিত করতে পারবে না। বরং তাদের লক্ষ্য হলো উপসাগর অতিক্রমকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর খরচ ও ঝুঁকি বাড়ানো এবং প্রণালিটিকে আরও বিপজ্জনক করে তোলা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বহরের রণকৌশলের মধ্যে রয়েছে বাণিজ্যিক জাহাজের কাছাকাছি গুলি চালানো, সমুদ্রে মাইন পাতা এবং বিভিন্ন দিক থেকে উচ্চগতিতে নৌকার ঝাঁক পাঠানো। দ্রুত আক্রমণকারী এসব নৌকার অনেকগুলোই মেশিনগান, রকেট বা জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রে সজ্জিত।

এর মধ্যে অনেক নৌকা ইরান নিজেই তৈরি করেছে। আবার বেসামরিক কাজে বা মাছ ধরার জন্য আগে ব্যবহৃত হতো এমন নৌকাকে রূপান্তর করেও ব্যবহার করা হয়েছে। হাডসন ইনস্টিটিউটের নন-রেসিডেন্ট সিনিয়র ফেলো কান কাসাপোগলুর একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই নৌকাগুলো সাশ্রয়ী এবং সহজেই প্রতিস্থাপনযোগ্য। কাসাপোগলুর মতে, এর ফলে তুলনামূলক কম ব্যয়ে ইরান বাণিজ্যিক ও সামরিক জাহাজকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে এবং প্রতিপক্ষের উচ্চমূল্যের সম্পদ ও বৈশ্বিক সামুদ্রিক অর্থনীতিকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই কার্যক্রমের সামগ্রিক লক্ষ্য হলো ওয়াশিংটনকে তেহরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ থেকে সরে আসতে চাপ দেওয়া এবং ভবিষ্যতের যেকোনো হামলা নিরুৎসাহিত করা।
অনেক নৌকা পানির খুব কাছাকাছি বা নিচুতে অবস্থান করে বলে খুব কাছে না পৌঁছানো পর্যন্ত রাডারে সেগুলো শনাক্ত করা কঠিন। এগুলোর ওপর কার্যকর নজরদারির জন্য ড্রোন, হেলিকপ্টার বা টহল বিমান দিয়ে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।

এই বহরের প্রকৃত আকার কত, তা অজানা। এর একটি অন্যতম কারণ হতে পারে, অনেক নৌকা ইরানের দক্ষিণ উপকূলজুড়ে বিভিন্ন গুহা, খাঁড়ি এবং ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গে লুকিয়ে রাখা হয়। তবে অনুমান করা হয়, এ ধরনের নৌকার সংখ্যা ৫০০ থেকে এক হাজারেরও বেশি। ইরানের শাসকগোষ্ঠী নিয়মিতভাবে এই 'মশা নৌবহর' নিয়ে নৌ-মহড়া চালায়।

বিশ্লেষকেরা প্রায়ই ইরানের এই কৌশলকে 'সাগরে গেরিলা যুদ্ধ' হিসেবে বর্ণনা করেন। মার্কিন নৌবাহিনী খোলা সমুদ্রে সুযোগ পেলে ইরানের এই দ্রুতগামী নৌকাগুলো ধ্বংস করে দিতে পারে, তবে গোলকারের মতে, আইআরজিসি সচেতনভাবেই সরাসরি সংঘর্ষ এড়িয়ে চলে।

তিনি আরও যুক্ত করেন, আইআরজিসি সরাসরি মুখোমুখি সংঘর্ষ এড়াতে চায় এবং এর বদলে আঘাত করে পালিয়ে যাওয়ার কৌশল, নৌকার ঝাঁক, মাইন, ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও ছোট নৌকা ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমের খরচ বাড়িয়ে দেয়।"

তা ছাড়া, ইরান খুব দ্রুত ও কম খরচে তাদের হারানো নৌকা প্রতিস্থাপন করতে পারে। অন্যদিকে, বাণিজ্যিক চলাচল রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের অত্যন্ত ব্যয়বহুল জাহাজ ও বিমান মোতায়েন করতে হয়।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

এসএ/এসএন

মন্তব্য করুন