রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে: জামায়াত আমির
ছবি: সংগৃহীত
০৭:৩৫ পিএম | ১৬ মে, ২০২৬
বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, কারো রক্তচক্ষুর দিকে না তাকিয়ে তিস্তা মহাপরিকল্পনাও অবশ্যই বাস্তবায়ন করতে।
তিনি বলেন, পদ্মা ও তিস্তার কারণে বাংলাদেশের চার ভাগের এক ভাগ প্রায় মরুভূমি হয়ে গেছে। আওয়ামী লীগের প্রথম সরকার ক্ষমতায় আসার পর পরীক্ষামূলকভাবে ১৫ দিনের জন্য ফারাক্কা বাঁধ চালানোর সুযোগ দিয়েছিল। ৫৫ বছরেও ১৫ দিন শেষ হয়নি। ইতোমধ্যে পদ্মা শুকনো মৌসুমে মরুভূমি আর বর্ষা মৌসুমে দুর্ভোগের কারণ। এখন পানি দরকার, পানি নাই।
ক্ষমতাসীন সরকারকে সাধুবাদ জানিয়ে জামায়াত আমির বলেন, ইতোমধ্যে পদ্মা ব্যারেজের ঘোষণা দিয়েছে। এ ঘোষণা যেন লোক দেখানো না হয়। এ ঘোষণা যেন বাস্তবে রূপ নেয়। কারো রক্তচক্ষুর দিকে না তাকিয়ে তিস্তা মহাপরিকল্পনাও অবশ্যই বাস্তবায়ন করতে হবে।
শনিবার (১৬ মে) বিকালে ঐতিহাসিক মাদ্রাসা ময়দানে ১১ দলের রাজশাহী বিভাগীয় সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিক বলেন, পদ্মার পানি আনতে হবে। পদ্মা-তিস্তার পানি আমাদের ন্যায্য পাওনা। বাংলাদেশে যে ১৫৪টি অভিন্ন নদী আছে, সবগুলো আজ মৃতপ্রায়। খাল কেটে মানুষকে পানি দিতে চান। খালের পানির উৎস হচ্ছে নদী। নদীই যদি ঠিকমতো না চলে, তাহলে খালের পানি আসবে কোথায় থেকে? আগে নদীর দিকে নজর দেন, সঙ্গে সঙ্গে খালের দিকেও নজর দেন। খাল কাটা কর্মসূচি যদি জনগণের মানসিক প্রশান্তির জন্য করে থাকেন, তাহলে এটা বুমেরাং হয়ে দেখা দেবে। আমরা চাই- নদী যৌবন ফিরে পাক, খাল কাটা কর্মসূচিও চলুক।
বিএনপির কঠোর সমালোচনা করে জামায়াত আমির বলেন, যে পথ দিয়ে স্বৈরাচার হেঁটেছিল, একই পথ দিয়ে আপনারাও হাঁটছেন। স্বৈরাচারের পরিণতি অতীতে হয়েছিল, আপনাদের পরিণতিও ভিন্ন হবে না যদি আপনারা এ পথ থেকে ফিরে আসেন। এ সংসদের মেয়াদ মাত্র আড়াই মাস। আমরা চাইনি এখনই শক্ত করে ধরতে। আমরা সুযোগ দিতে চেয়েছি যে, আপনারা আপনাদের ভুলকে সংশোধন করুন। মনে রাখবেন, আমাদের এ উদারতা যেন দুর্বলতা হিসেবে মনে না করেন। ভালো কাজ করবেন, আমরা আপনাদের কাছে পানির মতো তরল। মন্দ কাজ করবেন, আমরা ইস্পাতের চাইতেও কঠিন হয়ে দাঁড়াব সেদিন।
জুলাইযোদ্ধাদের উপহাস করা হচ্ছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, এটি সঠিক, সাড়ে ১৫ বছর ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধ আমরা যারা বিরোধী দলে ছিলাম দফায় দফায় আন্দোলন করেছি। যেদিন এই তরুণ-তরুণীরা সিদ্ধান্ত নিয়ে সামনে এসেছিল, জনগণ তাদের ডাকে সাড়া দিয়েছিল। সবাই রাস্তায় নেমে এসেছিল। আন্দোলন সেদিনই সফলতার মুখ দেখেছিল। এখন সরকারি দলের বন্ধুরা তাদের কাউকে বলে শিশু পার্টি, আর কাউকে বলে গুপ্ত। লজ্জা। যাদের কারণে আপনাদের এ গদি, তাদের আপনারা উপহাস করছেন।
গণভোট সম্পর্কে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, গণভোটের রায়কে অগ্রাহ্য করা মানে হচ্ছে এ দেশের জনগণকে অপমান করা। তাদের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো। মনে রাখবেন, জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে অতীতে কেউ কোনোদিন রেহাই পায়নি, আপনারাও রেহাই পাবেন না। আজকে অনুরোধ করি, সৎপথে ফিরে আসুন। জাতির সঙ্গে গাদ্দারি-বেঈমানি করবেন না। আপনারা এসে বলুন, আমরা ইতোমধ্যে যা করেছি ভুল করেছি। আমরা জনগণের দেওয়া গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করব। হয়তো জনগণ তখন আপনাদের ক্ষমা করবে। না হলে এর পাওনা বুঝে নেওয়ার জন্য তৈরি হোন। এ জাতি ঠিকই পাওনা বুঝিয়ে দেবে আপনাদের। আপনারা জাতিকে ধোকা দিয়েছেন এবং ইতোমধ্যে তা স্বীকার করে নিয়েছেন। আপনাদের নেতা বলেছিলেন, আমরা যদি ধোকা দিই, আগামীতে জনগণ আমাদেরকে আস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করবে। সেই আস্তাকুড়ে দেখার জন্য আপনারা তৈরি হোন।
সংস্কার প্রস্তাবের বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, আপনারা নাকি সংস্কারের প্রবক্তা। আপনাদের আগে কেউ সংস্কার প্রস্তাব ঘোষণা করেনি। কিন্তু আফসোস, আপনাদের সংস্কার কর্মসূচির প্রথম দফার সঙ্গে আপনারাই গাদ্দারি করছেন। প্রথম দফায় আছে, আপনারা যদি নির্বাচিত হন তাহলে দেশকে সংস্কার করতে হবে। আর সংস্কার করতে হলে সংবিধানের মেরামত করতে হবে। আজকে আপনারা বলছেন- সংস্কার কী জিনিস, সংবিধানের আপনারা সেটা বোঝেন না। তাহলে কি আপনারা সংস্কার না বুঝে শিশুর মতো প্রথম দফায় লিখেছিলেন। আপনারা আপনাদের ইশতেহারে লিখেছিলেন, বাংলাদেশের কোথাও কোনো অনির্বাচিত জনপ্রতিনিধি থাকবে না। সরকার গঠন হওয়ার পর ৪২টি জেলায় ইতোমধ্যে প্রশাসক নিয়োগ করেছেন।
প্রশাসক কি নির্বাচিত প্রতিনিধি?
আমাদেরকে ভয় দেখাবেন না উল্লেখ করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, আমাদেরকে মাঝে মাঝে চোখ রাঙানো হয়। কেউ কেউ বলেন, যদি আপনারা এই করেন, ওই করেন তাহলে আগামীতে এই হবে, সেই হবে। বন্ধু, আমাদেরকে ভয় দেখাবেন না। যাদের নেতারা হাসতে হাসতে ফাঁসির তক্তার ওপর দাঁড়াতে পারে, তাদেরকে কোনো কিছুর ভয় দেখাবেন না। আমাদের নেতৃবৃন্দ রাস্তা রচনা করে গিয়েছেন, জনগণের মুক্তির রাস্তা। এ রাস্তা ধরে আমরা চলতেই থাকব। আমরা সব বিষয়ে কথা বলব। সংসদে কথা বলতে অনুমতি লাগে। যদি সংসদে কথা বলতে দেওয়া না হয় তাহলে আমরা ওখানে চলে আসব, যেখানে কথা বলতে কারো অনুমতি লাগবে না। আমরা তখন জনগণের পার্লামেন্টে চলে আসব।
ভারতের উদ্দেশে তিনি বলেন, পার্শ্ববর্তী দেশ আমাদের প্রতিবেশী। প্রতিবেশীকে সম্মান করি। আমরা চাই, আপনারা শান্তিতে থাকুন। আমরা চাই না ধর্মের ভিত্তিতে সেখানে বিভাজন এবং অশান্তি হোক। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি, সেখানে শুধু মুসলিম নামের মানুষকে নাজেহাল করা হচ্ছে। আর বাংলাদেশের দিকে লাল চোখ দেখানো হচ্ছে। বন্ধু, এটা তিতুমীরের বাংলাদেশ। হাজি শরীয়তউল্লাহর বাংলাদেশ। শাহমখদুমের বাংলাদেশ। এ বাংলাদেশের দিকে চোখ রাঙাবেন না। হুমকি-ধমকি দেবেন না।
তিনি আরও বলেন- আমরা চাই, আমরা শান্তিতে থাকি, আপনারাও শান্তিতে থাকুন। আমাদের শান্তি নিয়ে টান দিলে কারো শান্তিই থাকবে না। আমরা বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানাবো, এখন সেখানে যে মানবিক বিপর্যয় চলছে আমরা এ ব্যাপারে আপনাদের বক্তব্য জানতে চাই। আপনাদের পদক্ষেপ দেখতে চাই। এ বিপর্যয় বন্ধ হোক। আমরা বাংলাদেশে কাউকে সাম্প্রদায়িক অশান্তি তৈরি করতে দেব না। এ দেশ সব ধর্মের মানুষের। আমাদের দিকে কেউ কালো হাত না বাড়াক। যদি দেয়, ২০ কোটি মানুষের ৪০ কোটি হাত তা রুখে দেবে।
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও রাজশাহী অঞ্চলের পরিচালক রফিকুল ইসলাম খান। পরিচালনা করেন রাজশাহী মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি ইমাজ উদ্দিন মন্ডল।
সমাবেশে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিডি) চেয়ারম্যান ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ (বীর বিক্রম), জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম, জাতীয় নারীশক্তির আহ্বায়ক মনিরা শারমিন ও ১১ দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন।
এসকে/টিকে