বিশ্ব মৌমাছি দিবস আজ
ছবি: সংগৃহীত
০৭:২৩ এএম | ২০ মে, ২০২৬
আধুনিক মৌমাছি পালনের জনক হিসেবে পরিচিত স্লোভেনীয় মৌমাছি পালক অ্যান্টন জনসার জন্মদিন ১৭৩৪ সালের ২০ মে। তার এই জন্মতারিখকে স্মরণীয় করে রাখতেই প্রতি বছর ২০ মে বিশ্বজুড়ে বিশ্ব মৌমাছি দিবস পালন করা হয়।
মৌমাছি ও অন্যান্য পরাগায়নকারী প্রাণীর গুরুত্ব এবং বাস্তুতন্ত্রে তাদের অবদান সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা বাড়ানোই এ দিবসের প্রধান উদ্দেশ্য।
মৌমাছির সঙ্গে ওতোপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে মৌচাক, মধু ও মোমের নাম। শুধু প্রকৃতিতে পরাগায়ন নয়, মধু ও মোম শিল্পেও বিশেষ ভূমিকা পালন করে ছোট্ট প্রাণিটি।
মধু, মোম ও ফুলের পরাগায়নের জন্য প্রসিদ্ধ পিঁপড়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কযুক্ত মধু সংগ্রহকারী পতঙ্গবিশেষকে মৌমাছি বলা হয়। অ্যান্টার্কটিকা ব্যতীত পৃথিবীর সকল মহাদেশে যেখানেই পতঙ্গ-পরাগায়িত সপুষ্পক উদ্ভিদ আছে সেখানেই মৌমাছি আছে। বাংলাদেশে সচরাচর যে মৌমাছি দেখা যায় তার বৈজ্ঞানিক নাম এপিস ইন্ডিকা।
ফুলে ফুলে উড়ে মধু সংগ্রহের গুরুদায়িত্ব নিয়ে সব সময় ছুটে বেড়ায় মৌমাছি। কর্মব্যস্ততা, নিয়মানুবর্তিতা এবং পরিশ্রমের যথার্থ উদাহরণ ছোট্ট এই পতঙ্গ। কেবল তা-ই নয়, মৌচাক নির্মাণে মৌমাছির যে শৈল্পিক মনন, বিজ্ঞানমনস্কতা ও দক্ষতার পরিচয় পাওয়া যায়, তাতে পতঙ্গটিকে উঁচু স্তরের শিল্পী বললেও কম বলা হয়।
ফুলে ফুলে ঘুরে বেড়ানোর সময় মৌমাছিরা তাদের পা এবং বুকের লোমের ফুলের অসংখ্য পরাগরেণু বয়ে বেড়ায়। এক ফুলের পরাগরেণু অন্য ফুলের গর্ভমুণ্ডে পড়লে পরাগায়ণ ঘটে, যার ফলশ্রুতিতে উৎপন্ন হয় ফল। এভাবে মৌমাছিরা পরাগায়ণের মাধ্যম হিসাবে কাজ করে ফল ও ফসলের উৎপাদন বাড়ায়।

এ দেশের আবহাওয়া প্রকৃতি অনুযায়ী ক্ষুদে আকৃতির এই মৌমাছি প্রজাতি গাছের কোটরে, দেয়ালের ফাঁটলে, বাক্স পেটরা ইত্যাদি আবদ্ধ স্থানে বাসা তৈরি করে। এদের উৎপাদিত মধুর মান খুবই উৎকৃষ্ট।
প্রত্যেকটি মৌচাকে মৌমাছিরা বসতিবদ্ধ হয়ে একটি বড় পরিবার বা সমাজ গড়ে বাস করে ৷ আকার ও কাজের ভিত্তিতে মৌমাছিরা তিন সম্প্রদায়ে বিভক্ত:
১. রানি মৌমাছি যা একমাত্র উর্বর মৌমাছি
২. ড্রোন বা পুরুষ মৌমাছি
৩. কর্মী মৌমাছি বা বন্ধ্যা মৌমাছি
বিশ্বে প্রায় ২০,০০০ প্রজাতির মৌমাছি রয়েছে। মৌমাছিরা উপনিবেশে থাকে। প্রতিটি কলোনির রানী, কর্মী এবং ড্রোন রয়েছে। ড্রোনটিতে সমস্ত পুরুষ মৌমাছি থাকে, শ্রমিক মৌমাছি ড্রোনটিকে পরিষ্কার করে। কর্মীরা পরাগ এবং অমৃত সংগ্রহ করে এবং বাচ্চাদের যত্ন নেয়। ড্রোন মৌমাছি কেবল রানী মৌমাছির সঙ্গে সঙ্গম করে। রানী মৌমাছি কেবল ডিম দেওয়ার কাজ করে। মৌমাছিরা গণতন্ত্র অনুসরণ করে। নতুন বাড়ি বাছাই করতে তাদের আলোচনা হয়।
মৌচাক
মৌচাক হলো মৌমাছির আবাসস্থল। এটি তৈরি হয় মোম জাতীয় পদার্থ দিয়ে। মৌচাকে ক্ষদ্র ক্ষুদ্র ষড়ভূজ প্রকোষ্ঠ থাকে। মৌমাছি এসব প্রকোষ্ঠে মধু সঞ্চয় করে। এছাড়া ফাঁকা প্রকোষ্ঠে মৌমাছি ডিম পাড়ে, লার্ভা ও পিউপা সংরক্ষণ করে।
মধু
লাখ লাখ মৌমাছির অক্লান্ত শ্রমে তৈরি হয় মধু। মৌমাছিরা ফুলে ফুলে বিচরণ করে ফুলের রেণু ও মিষ্টি রস সংগ্রহ করে পাকস্থলীতে রাখে। তারপর সেখানে মৌমাছির মুখ নিঃসৃত লালা মিশ্রিত হয়ে রাসায়নিক জটিল বিক্রিয়ায় মধু তৈরি হয়। এরপর মৌমাছি মুখ হতে মৌচাকের প্রকোষ্ঠে তা জমা করে ভবিষ্যদ সঞ্চয়ের জন্য।
মধু মূলত এক প্রকারের মিষ্টি ও ঘন তরল পদার্থ, যা মৌমাছি ও অন্যান্য পতঙ্গ ফুলের নির্যাস হতে তৈরি হয়। এটি উচ্চ ঔষধিগুণ সম্পন্ন সুপেয় একটি ভেষজ তরল। বিশ্বে বাংলাদেশের সুন্দরবনের মধু স্বাদ, রং, হালকা সুগন্ধ এবং ঔষধিগুণাবলীর জন্য প্রসিদ্ধ।
মোম
মোমবাতি শিল্পে মৌমাছির অবদান অপরিসীম। কর্মী মৌমাছিরা তাদের পেটের গ্রন্থি থেকে প্রাকৃতিক মোম নিঃসৃত করে মৌচাক তৈরি করে। মৌমাছিরা প্রথমে মধু খেয়ে নিজেদের শরীরের ভেতরের বিশেষ গ্রন্থির সাহায্যে তরল মোম তৈরি করে। এরপর তা নিঃসৃতের পর বাতাসের সংস্পর্শে এসে শক্ত ফ্লেক্সে পরিণত হয়। এটি দিয়েই মৌমাছিরা তৈরি করে মৌচাক।
মৌচাক তৈরির জন্য মৌমাছির দেহ অভ্যন্তরে তৈরি হওয়া এই মোম প্রকৃতপক্ষে ফ্যাটি এসিডের ইস্টার। মধু সংগ্রহকারীরা মধু সংগ্রহ করার পর মৌচাক গলিয়ে ও ছেঁকে এই মোম আলাদা করে। মোম সংগ্রহ ও পরিশোধনের মাধ্যমে গড়ে ওঠে মোম শিল্প যেখানে উন্নত মানের, সুগন্ধযুক্ত ও স্বাস্থ্যসম্মত মোমবাতি তৈরি করা হয় যা পরিবেশের জন্য মোটেও ক্ষতিকর নয়।
প্রসঙ্গত, ২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মৌমাছি-পালকদের আবেদনের ভিত্তিতে ইউনাইটেড স্টেটস ডিপার্টমেন্ট অব অ্যাগ্রিকালচার ১৫ আগস্ট বিশ্ব মৌমাছি দিবসটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়। তাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রতি বছর আগস্ট মাসের তৃতীয় শনিবার পালিত হয় জাতীয় মৌমাছি দিবস।
এসএ/এসএন