জ্বালানি সংকটের কারণে খেলনা গাড়ি ও বাসে চড়ছেন মার্কিনিরা
ছবি: সংগৃহীত
০৭:০০ পিএম | ২০ মে, ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে হু হু করে বাড়ছে জ্বালানি তেলের দাম। বর্তমানে দেশটিতে প্রতি গ্যালন প্রায় ৩.৭৮ লিটার ক্যাটাগরির পেট্রোলের গড় দাম ৪.৫০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। চড়া দামের এই ধাক্কায় সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে।
অনেকেই দূরপাল্লার যাত্রা পরিহার করছেন, চড়া দামের পাম্পগুলো এড়িয়ে চলছেন, আবার কেউ কেউ ঝুঁকছেন গণপরিবহনের দিকে। তবে জর্জিয়ার বাসিন্দা মালি হাইটাওয়ারের সমাধানটি সবাইকে চমকে দিয়েছে।
৩০ বছর বয়সী এই হ্যান্ডিম্যান আবর্জনার স্তূপ থেকে কুড়িয়ে পাওয়া একটি ভাঙা খেলনা গাড়িকে রূপান্তর করেছেন নিজের বাহনে। ব্যাটারিচালিত ওই খেলনা গাড়িতে তিনি বসিয়ে দিয়েছেন পাওয়ার ওয়াশারের দুই গ্যালনের একটি এক-পিস্টন ইঞ্জিন। লন-মুভারের মতো দড়ি টেনে স্টার্ট দিলেই হাঁটু মুড়ে, মাথায় হেলমেট পরে তিনি রওনা হন সুপারমার্কেটের দিকে।
হাইটাওয়ার জানান, তার আসল গাড়িটি একবার ফুল ট্যাংক করতে খরচ হয় প্রায় ৯০ ডলার, যা তার সাধ্যের বাইরে। তাই মুদি সদাইয়ের জন্য খেলনা গাড়ির ওপরেই একটি ক্যারিয়ার বসিয়ে নিয়েছেন তিনি।
আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশন- এর তথ্যমতে, ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতি গ্যালন গ্যাসের দাম যেখানে ৩ ডলারের কাছাকাছি ছিল, তা বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ৪.৫২ ডলারে। ওয়াশিংটন পোস্ট ও এবিসি নিউজের একটি জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৪৪ শতাংশ মার্কিনি ইতিমধ্যেই গাড়ি চালানো কমিয়ে দিয়েছেন।
এই অর্থনৈতিক সংকটকে আবার কেউ কেউ ব্যবসায়িক সুযোগ হিসেবেও দেখছেন। ম্যাসাচুসেটসের 'ক্যাম্প ফার্লি'-এর নির্বাহী পরিচালক রেনি টোচ্চি তার নিজের গাড়ির তেলের খরচ বাড়ার পর এক অভিনব বুদ্ধি বের করেন। তিনি মা-বাবাদের উদ্দেশ্য করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার শুরু করেন-গরমের ছুটিতে বাচ্চাদের গাড়িতে করে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরিয়ে জ্বালানি খরচ করার চেয়ে তাদের 'স্লিপ-অ্যাওয়ে ক্যাম্প' বা আবাসিক ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেওয়া অনেক বেশি সাশ্রয়ী। তার এই কৌশল ক্যাম্পের বুকিং বাড়াতে বেশ কাজ করছে।
ওয়াশিংটনের বাসিন্দা ২৮ বছর বয়সী কনটেন্ট ক্রিয়েটর ডাফনে ফ্লোরেস জানান, ক্যালিফোর্নিয়ায় বন্ধুদের সাথে দেখা করতে গিয়ে তিনি নিজের গাড়ি পার্কিংয়ে রেখে যাতায়াতের জন্য সম্পূর্ণ বাসের ওপর নির্ভর করছেন। তিনি বলেন, লস অ্যাঞ্জেলেসে ফ্রিপোর্টগুলোর কাছের পাম্পে তেলের দাম গ্যালন প্রতি ৯ ডলারে ঠেকেছে। বাসে চললে খরচ যেমন বাঁচে, তেমনি যাতায়াতের সময়ে ভিডিও এডিট করার বাড়তি সুবিধাও পাওয়া যায়।
আমেরিকার পূর্ব থেকে পশ্চিম উপকূল-সবখানেই একই চিত্র। মেইনের ব্যাংগোর শহরের ট্রানজিট প্রশাসক লরি লিনকট জানান, জানুয়ারি থেকে তাদের সরকারি বাস সিস্টেমে যাত্রী সংখ্যা ২১% বেড়েছে। তিনি বলেন, আমি লক্ষ্য করেছি, সব পেশা ও বয়সের মানুষই এখন বাসে যাতায়াত করছেন।
ক্যালিফোর্নিয়ার এল সেগুন্দোর একটি গ্যাস স্টেশনে সম্প্রতি চালকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। লাস ভেগাসের একটি পর্যটন সংস্থা সেখানে প্রথম ১০০ জন চালককে ১০০ ডলার মূল্যের বিনামূল্যে গ্যাস দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল। তবে যারা লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন, তাদের উদ্দেশ্য কোনো বিনোদন ভ্রমণ ছিল না; বরং ছিল দৈনিক টিকে থাকার লড়াই। রবার্ট জ্যাকসন নামের এক চালক বলেন, এই গ্যাসে মাত্র কয়েকদিন চলবে। এখন আমাকে বাধ্য হয়ে হেঁটে এবং ট্রেনে যাতায়াত করতে হচ্ছে। জীবন আসলেই কঠিন হয়ে পড়েছে।
জ্বালানির এই বাজারে সাধারণ মানুষ যখন দিশেহারা, তখন সাইডলাইনে বসে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন ইলেকট্রিক ভেহিকেল বা বৈদ্যুতিক গাড়ির মালিকেরা। বিশেষ করে ইলন মাস্কের টেসলা গাড়ির চালকেরা, যারা কিছুদিন আগেও নানা কারণে ট্রোলের শিকার হতেন, তারা এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের স্বস্তির কথা জানান দিচ্ছেন। সিলিকন ভ্যালির টেসলা ওনার্স গ্রুপের সভাপতি জন স্ট্রিংগার মজা করে একটি ভিডিও পোস্ট করে লিখেছেন, আহ্! তেলের দাম নিয়ে যে আমাকে ভাবতে হচ্ছে না, এটাই কত বড় শান্তি!
বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন নাগরিকদের এই ইম্প্রোভাইজেশন বা তাৎক্ষণিক বিকল্প ব্যবস্থা কেবল সাময়িক কোনো প্রবণতা নয়, বরং তা দেশটির দীর্ঘদিনের গাড়ি-কেন্দ্রিক সংস্কৃতিকে স্থায়ীভাবে বদলে দেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সূত্র: রয়টার্স
এসকে/টিএ