আসিফ নজরুলের ‘হস্তক্ষেপে’ মামলা থেকে রেহাই সিমিনের
ছবি: সংগৃহীত
০২:১২ পিএম | ২১ মে, ২০২৬
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের প্রভাব খাটিয়ে ট্রান্সকম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সিমিন রহমান তাঁর বিরুদ্ধে থাকা সব মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন— এমন অভিযোগ ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে দেশের অন্যতম শীর্ষ করপোরেট পরিবারটির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব। বিশেষ করে ভাই হত্যাসহ শেয়ার জালিয়াতির অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলায় অভিযোগপত্র দাখিলের পরও আদালতের অব্যাহতির সিদ্ধান্ত নিয়ে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের হস্তক্ষেপে মামলার গতিপথ বদলে যায়। অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে তিনি এই মামলায় প্রভাব খাটিয়েছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। আর পুরো প্রক্রিয়ায় মধ্যস্থতার ভূমিকা পালন করেন ট্রান্সকম গ্রুপের মালিকানাধীন দুই গণমাধ্যমের সম্পাদক মতিউর রহমান ও মাহফুজ আনাম।
মামলার বাদী ও ট্রান্সকম গ্রুপের পরিচালক শাযরেহ্ হক অভিযোগ করেছেন, প্রভাবশালী তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপেই আদালত বাদীপক্ষের বক্তব্য না শুনে মামলাটি খারিজ করে দেন।
ট্রান্সকম গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান লতিফুর রহমানের মৃত্যুর পর পারিবারিক দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসে। বড় মেয়ে সিমিন রহমানের বিরুদ্ধে ‘হত্যা, অর্থ আত্মসাৎ, সম্পত্তি দখল ও অবৈধভাবে শেয়ার হস্তান্তরের’ অভিযোগ এনে মামলার পথে হাঁটেন ছোট মেয়ে শাযরেহ্ হক। ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে করপোরেট অঙ্গনেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
অভিযোগ রয়েছে, এসব মামলার তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতার ব্যবহার করেছেন সিমিন রহমান। আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের ঘনিষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট তৌফিকা করিমের মাধ্যমে আদালত থেকে নিজেদের অনুকূলে আদেশ নেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। তৌফিকা করিমের চেম্বারের দুই আইনজীবী শাহীন ও বাহারুল আদালতের বিভিন্ন পর্যায়ে সিমিন রহমানের পক্ষে কাজ করেছেন বলেও দাবি করা হয়েছে।
পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রভাবশালী উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয় বলেও অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, মোটা অঙ্কের আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে মামলায় হস্তক্ষেপ করা হয়।
মামলার নথিপত্র অনুযায়ী, ট্রান্সকম গ্রুপের অধিকাংশ শেয়ার নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতে ভাই-বোনের স্বাক্ষর জালিয়াতির অভিযোগ রয়েছে সিমিন রহমানের বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে ভুয়া পারিবারিক ‘ডিড অব সেটলমেন্ট’ তৈরির অভিযোগও আনা হয়েছে।
এ ছাড়া রাজধানীর গুলশানে লতিফুর রহমানের নামে থাকা প্রায় দুই বিঘা দুই কাঠা জমির মধ্যে ৩৫ কাঠা জমি ভুয়া হেবা দলিলের মাধ্যমে নিজের নামে নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, রাজউকের কাছে জমা দেওয়া ওই দলিলে লতিফুর রহমান ও শাযরেহ্ হকের স্বাক্ষর জাল করা হয়েছিল। পরে বিষয়টি ধরা পড়লে সেই প্রক্রিয়া আটকে যায়।
সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা জানান, ২০২০ সালের ১ জুলাই লতিফুর রহমানের মৃত্যুর পর থেকেই জালিয়াতির বিভিন্ন ঘটনা শুরু হয়। ২০২৩ সালের শুরুতে ছেলে আরশাদ ওয়ালিউর রহমান ও মেয়ে শাযরেহ্ হক পুরো বিষয়টি বুঝতে পারেন। এরপর ধীরে ধীরে বিভিন্ন জালিয়াতির তথ্য সামনে আসে।
এ ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার তদন্ত করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তদন্ত কর্মকর্তা শাজেদুর রহমান ছয়জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। অভিযোগপত্রে বলা হয়, ২০২০ সালে অনুষ্ঠিত একটি বোর্ড সভায় শাযরেহ্ হক ও আরশাদ ওয়ালিউর রহমান উপস্থিত না থাকলেও তাঁদের স্বাক্ষর দেখানো হয়। একইভাবে লতিফুর রহমানের ভুয়া অনুমোদনের স্বাক্ষরও ব্যবহার করা হয়।
তবে অভিযোগপত্র দাখিলের পর আদালত সিমিন রহমানসহ সব আসামিকে অব্যাহতি দেন।
এ বিষয়ে শাযরেহ্ হক বলেন, “কোর্ট আমাদের আবেদন না শুনেই মামলাটি খারিজ করে দিয়েছেন। তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপে মামলাটি খারিজ করা হয়েছে। আমি এতে বিস্মিত।” তিনি বলেন, “সব তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত কর্মকর্তা চার্জশিট দাখিল করেছিলেন। কিন্তু আমাদের বক্তব্য না শুনেই আসামিদের অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।” তিনি জানান, এ বিষয়ে উচ্চ আদালতে আবেদন করা হয়েছে।
অন্যদিকে ট্রান্সকম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সিমিন রহমানের বিরুদ্ধে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘১০০ কোটি টাকা ঘুষ’ দেওয়ার অভিযোগও অনুসন্ধান করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গত বছরের নভেম্বরে এ অভিযোগ অনুসন্ধানে দুদকের একজন উপপরিচালককে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
দুদকের একটি সূত্র জানিয়েছে, সিমিন রহমানের বিরুদ্ধে থাকা হত্যা, শেয়ার জালিয়াতি ও প্রতারণার মামলাগুলো ধামাচাপা দিতেই এই ঘুষ দেওয়া হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অভিযোগের সঙ্গে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততাও অনুসন্ধান করছে সংস্থাটি।
এসএন