© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

ইরানের প্রস্তাব মেনে নিতে ট্রাম্পকে অনুরোধ করলেন আরব নেতারা

শেয়ার করুন:
ইরানের প্রস্তাব মেনে নিতে ট্রাম্পকে অনুরোধ করলেন আরব নেতারা

ছবি: সংগৃহীত

মোজো ডেস্ক
০৪:১৪ এএম | ২৪ মে, ২০২৬
চলমান বিধ্বংসী যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে ইরানের দেওয়া সর্বশেষ শান্তি প্রস্তাবটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অনুরোধ জানিয়েছেন মধ্যপ্রাচ্য ও আরব অঞ্চলের শীর্ষ নেতারা। শনিবার বিকেলে ট্রাম্পের সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ের ফোনালাপে তারা এই আহ্বান জানান। একই সময়ে তেহরানে মধ্যস্থতাকারীদের আলোচনা থেকে ইঙ্গিত মিলেছে যে, দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটিয়ে দুই পক্ষ একটি সম্ভাব্য চুক্তির রূপরেখার খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে। আঞ্চলিক এই নেতারা ট্রাম্পকে ইরানের সঙ্গে একটি অন্তর্বর্তীকালীন ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি বা সমঝোতা স্মারক গ্রহণ করার জন্য বিশেষভাবে উৎসাহিত করেছেন।

হোয়াইট হাউস ও আঞ্চলিক কূটনৈতিক সূত্রগুলো এই ফোনালাপকে অত্যন্ত ফলপ্রসূ এবং আশাব্যঞ্জক বলে বর্ণনা করেছে। সিএনএন-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এক আঞ্চলিক কূটনীতিক বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে আরব ও উপসাগরীয় নেতাদের আলাপচারিতা অত্যন্ত ইতিবাচক ছিল। শান্তি প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে ভালো অগ্রগতি হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আলোচনার মাধ্যমে যে যুগান্তকারী অগ্রগতি অর্জন করেছেন, আঞ্চলিক নেতারা তার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন এবং এই শান্তি প্রচেষ্টায় তাদের পূর্ণ সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

শান্তিচুক্তির সম্ভাবনাকে ‘ফিফটি-ফিফটি’ বললেন ট্রাম্প

এদিকে নেতাদের সঙ্গে এই গুরুত্বপূর্ণ ফোনালাপের আগে সংবাদমাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’-কে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনাকে ‘ফিফটি-ফিফটি’ বা ৫০/৫০ বলে উল্লেখ করেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ইরানের বিরুদ্ধে পুনরায় সামরিক অভিযান শুরু করা হবে কি না, সে বিষয়ে তিনি রবিবারের মধ্যেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন। ট্রাম্প তার স্বভাবসুলভ কড়া ভাষায় বলেন, এই আলোচনা হয় একটি ‘ভালো’ চুক্তির দিকে নিয়ে যাবে, অন্যথায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে একদম ‘ধ্বংসস্তূপে’ পরিণত করার পথ বেছে নেবে।

পর্দার আড়ালে ব্যাপক কূটনীতিক তৎপরতা

শনিবার সকালের দিকেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, কাতার এবং পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীদের তেহরান সফরের পর দুই পক্ষ যুদ্ধ বন্ধের একটি খসড়া রূপরেখার কাছাকাছি পৌঁছেছে। তেহরানের কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানাচ্ছে, ভবিষ্যতে আরও বিস্তারিত এবং স্থায়ী চুক্তি সম্পাদনের লক্ষ্যেই আপাতত একটি অন্তর্বর্তীকালীন সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করছে ওয়াশিংটন ও তেহরান। এ বিষয়ে ভারতের নয়াদিল্লিতে অবস্থানরত মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সাংবাদিকদের বলেন, পর্দার আড়ালে ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে। আজ বা আগামী দু-একদিনের মধ্যে এ বিষয়ে বড় কোনো ঘোষণা আসতে পারে।

ইসরায়েলের ‘সতর্ক দৃষ্টি’ ও নেতানিয়াহুর ‘উদ্বেগ’

শনিবার ট্রাম্পের এই বিশেষ বৈঠকে উপসাগরীয় অঞ্চলের নেতাদের পাশাপাশি পাকিস্তান, তুরস্ক এবং মিসরের শীর্ষ কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ট্রাম্প নিজেই জানিয়েছেন, তিনি তার বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জামাতা তথা অন্যতম প্রধান উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনারের সঙ্গেও এই প্রস্তাব নিয়ে বিশদ আলোচনা করছেন। অন্যদিকে, মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকে শনিবার হোয়াইট হাউসে প্রবেশ করতে দেখা গেছে, যা প্রশাসনের সর্বোচ্চ মহলের জরুরি তৎপরতারই বহিঃপ্রকাশ। এই পুরো প্রক্রিয়ার দিকে কড়া নজর রাখছে ইসরায়েলও। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছেন এবং রাতে ট্রাম্পের সঙ্গে তার কথা বলার কথা রয়েছে।

ইসরায়েলের প্রধান উদ্বেগ হলো, এই সম্ভাব্য অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তিটি যদি কেবল যুদ্ধবিরতি বাড়ানো, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া এবং ইরানের ওপর থেকে ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা শিথিলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা তেল আবিবের জন্য বিপজ্জনক হবে। কারণ, এই খসড়ায় ইসরায়েলের জন্য সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয়— অর্থাৎ ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ও সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বিষয়টি উপেক্ষিত থেকে যেতে পারে। তবে ওয়াশিংটন ইসরায়েলকে এই ইউরেনিয়াম ইস্যুতে বারবার আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছে। সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য নেতানিয়াহু শনিবার রাতে তার সীমিত নিরাপত্তা মন্ত্রিসভা ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি জরুরি বৈঠক ডেকেছেন।

ট্রাম্পকে দুই রিপাবলিকান সিনেটরের ‘সতর্কবার্তা’

যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও ট্রাম্পের এই সম্ভাব্য শান্তিচুক্তি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে রিপাবলিকান পার্টির কট্টর ইরানবিরোধী সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম এবং রজার উইকার ট্রাম্পকে সতর্ক করেছেন। গ্রাহাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ইরান যদি এই অঞ্চলের জলপথ বা হরমুজ প্রণালিতে স্থায়ীভাবে আধিপত্য বিস্তার করে এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি অবকাঠামোকে জিম্মি করার সক্ষমতা বজায় রাখে, তবে তা মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য বদলে দেবে। দীর্ঘমেয়াদে এটি ইসরায়েলের জন্য একটি দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়াবে। সিনেটের সশস্ত্র পরিষেবা কমিটির চেয়ারম্যান রজার উইকারও ট্রাম্পকে সতর্ক করে বলেছেন, ইসলামপন্থী ইরানি সরকারের সঙ্গে যেকোনো দুর্বল চুক্তি ট্রাম্পের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে।

হরমুজ নিয়ে ইরানের হুংকার

অন্যপক্ষে, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় তারা একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) চূড়ান্ত করার দিকেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। তেহরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই শনিবার জানান, এই খসড়া প্রস্তাবের মূল ফোকাস হলো- যুদ্ধ বন্ধ করা, ইরানের ওপর মার্কিন নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়া এবং বিদেশে আটকে থাকা ইরানি সম্পদ অবমুক্ত করা। তবে এই পর্যায়ে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে কোনো আলোচনা হচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, হরমুজ প্রণালি-সংক্রান্ত যেকোনো চুক্তি ও ব্যবস্থাপনা ইরান, ওমান এবং এই অঞ্চলের উপকূলীয় দেশগুলোর মধ্যে হওয়া উচিত এবং এতে যুক্তরাষ্ট্রের নাক গলানোর কোনো অধিকার নেই।

আলোচনা নিয়ে মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান ও কাতারের পক্ষ থেকে ‘সতর্ক আশাবাদ’ ব্যক্ত করা হয়েছে। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সেনাপ্রধানের দুই দিনের তেহরান সফর অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছে এবং গত ২৪ ঘণ্টার নিবিড় আলোচনা একটি চূড়ান্ত সমঝোতার পথ তৈরি করেছে। তবে চুক্তি হলেও এর স্থায়িত্ব নিয়ে সংশয় কাটছে না। ইরানের প্রধান আলোচক ও পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ অত্যন্ত হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, ইরান তার জাতীয় অধিকার থেকে একচুলও নড়বে না। তিনি মার্কিন প্রশাসনকে অবিশ্বস্ত আখ্যা দিয়ে সতর্ক করেন, ট্রাম্প যদি আবারও যুদ্ধ শুরু করার ভুল করেন, তবে মার্কিন বাহিনীর জন্য এবারকার পরিণতি হবে ইতিহাসের সবচেয়ে মারাত্মক ও তিক্ত।

সূত্র: সিএনএন

এমআর/টিএ  

মন্তব্য করুন