© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

সুস্থ থাকতে কোরবানি ঈদে মাংস খাওয়ার সঠিক নিয়ম জেনে নিন

শেয়ার করুন:
সুস্থ থাকতে কোরবানি ঈদে মাংস খাওয়ার সঠিক নিয়ম জেনে নিন

ছবি: সংগৃহীত

মোজো ডেস্ক
০৫:২৪ পিএম | ২৪ মে, ২০২৬
কোরবানির ঈদ আমাদের জীবনে আনন্দ, ত্যাগ ও সম্প্রীতির এক অনন্য উৎসব। এই উৎসবকে ঘিরে পরিবার, আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগির অন্যতম বড় মাধ্যম হলো খাবার। কোরবানির মাংস দিয়ে তৈরি নানা মুখরোচক পদ ছাড়া ঈদের আনন্দ যেন পূর্ণতা পায় না। তবে উৎসবের আনন্দ উপভোগ করতে গিয়ে যদি খাদ্যাভ্যাসে অনিয়ম হয়, তাহলে তা শরীরের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই সুস্থ থেকে ঈদ উদযাপন করতে হলে খাবারের ক্ষেত্রে সচেতনতা ও সংযম দুটোই জরুরি। কোরবানি ঈদে স্বাস্থ্য সতর্কতা নিয়ে লিখেছেন পুষ্টিবিদ ইসরাত জাহান ইফাত।

কোরবানির ঈদে প্রায় প্রতিটি ঘরেই গরু বা খাসির মাংস দিয়ে বিরিয়ানি, কাচ্চি, তেহারি, রেজালা, কোরমা, কালাভুনা কিংবা কাবাবের মতো সমৃদ্ধ খাবার তৈরি হয়। কিন্তু মনে রাখতে হবে, প্রতিটি পরিবারের সদস্যের শারীরিক অবস্থা এক নয়। শিশু, বয়স্ক, ডায়াবেটিস রোগী, হৃদরোগী কিংবা উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের জন্য একই ধরনের খাবার সমানভাবে উপযোগী নাও হতে পারে। তাই ঈদের খাবারের মেনু তৈরিতে স্বাস্থ্যকর পরিকল্পনা থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

গরু ও খাসির মাংস শরীরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টির উৎস। এতে রয়েছে উচ্চমানের প্রোটিন, জিঙ্ক, সেলেনিয়াম, ফসফরাস, হিম আয়রন এবং ভিটামিন বি-কমপ্লেক্স, বিশেষ করে ভিটামিন বি১২, বি৬ ও বি৩। এসব উপাদান শরীরের পেশি গঠন, রক্ত তৈরিতে সহায়তা এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে ভূমিকা রাখে। তবে একই সঙ্গে লাল মাংসে স্যাচুরেটেড ফ্যাট ও কোলেস্টেরলও থাকে, যা অতিরিক্ত গ্রহণ করলে হৃদরোগ, স্থূলতা ও রক্তে চর্বি বৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই লাল মাংস ক্ষতিকর না উপকারী হবে, তা নির্ভর করে খাওয়ার পরিমাণ, রান্নার ধরন এবং ব্যক্তির শারীরিক অবস্থার ওপর।


সুস্থ স্বাভাবিক একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ, যার ওজন ৬০ থেকে ৭০ কেজির মধ্যে, তিনি দিনে মোট ২৫০ থেকে ৩০০ গ্রাম পর্যন্ত মাংস খেতে পারেন। তবে এই পরিমাণ একবারে না খেয়ে তিন বেলায় ভাগ করে খাওয়া ভালো। একই দিনে যদি ডিম, মুরগি বা অন্যান্য প্রোটিনজাতীয় খাবার খাওয়া হয়, তাহলে মাংসের পরিমাণ ২০০ গ্রামের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত।



অন্যদিকে, যাদের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, কিডনি বা লিভারের দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা রয়েছে, তাদের জন্য আরও বেশি সতর্কতা প্রয়োজন। এসব রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা দিনে ৬০ থেকে ৯০ গ্রামের বেশি লাল মাংস না খাওয়াই ভালো। একই সঙ্গে সেদিন অন্য কোনো ভারী প্রোটিনজাতীয় খাবার এড়িয়ে চলা উচিত। তাদের জন্য পোলাও বা বিরিয়ানির পরিবর্তে পরিমিত সাদা ভাত, সবজি ও অল্প পরিমাণ লিন মিট স্বাস্থ্যকর বিকল্প হতে পারে।

ঈদের সকালে বা বিকেলে দুধ-সেমাই, পায়েস, পুডিং, কাস্টার্ড বা ফালুদার মতো মিষ্টান্ন অনেকেরই পছন্দের খাবার। তবে এসব খাবার তৈরিতে অতিরিক্ত চিনি, কনডেন্সড মিল্ক, বাটার, মার্জারিন বা অতিরিক্ত তেল ব্যবহার না করাই ভালো। ডায়াবেটিস রোগীরা বিকল্প মিষ্টিকারক হিসেবে স্টেভিয়া ব্যবহার করতে পারেন। চিনি, গুড়, মধু বা মিছরি এড়িয়ে চলা উচিত। আরও ভালো হয় যদি মিষ্টান্নের পরিবর্তে মৌসুমি রঙিন ফল যেমন তরমুজ, পেঁপে, আনারস, আম বা জাম খাওয়া হয়। এতে শরীর পাবে ভিটামিন, খনিজ ও আঁশ।

অতিরিক্ত মাংস খাওয়ার একটি সাধারণ সমস্যা হলো কোষ্ঠকাঠিন্য। যাদের পাইলস বা এনাল ফিসারের সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত মাংস খেলে পায়ুপথে ব্যথা, জ্বালাপোড়া এমনকি রক্তক্ষরণও হতে পারে। তাই ঈদের সময় প্রচুর পানি পান করা অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি ইসবগুলের ভুষি, তোকমা, চিয়া সিড, লেবুর শরবত বা ফলের রসজাতীয় তরল খাবার গ্রহণ করলে হজম ভালো থাকে এবং কোষ্ঠকাঠিন্যের ঝুঁকি কমে।

খাবারের সঙ্গে সবজি ও সালাদ রাখার অভ্যাসও খুব গুরুত্বপূর্ণ। প্রতি ৫০ গ্রাম মাংসের সঙ্গে অন্তত ১০০ গ্রাম সবজি বা সালাদ খেলে শরীরে আঁশের ঘাটতি কমে এবং হজম ভালো হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, খাবার শুরু করার আগে সালাদ বা সবজি খেলে অতিরিক্ত ভাত বা পোলাও খাওয়ার প্রবণতাও কমে যায়।

অনেকেই জানেন না যে গরু বা খাসির সব অংশের মাংস সমান নয়। পেছনের রান, পিঠ বা দাবনার অংশের মাংসে তুলনামূলক কম চর্বি ও বেশি প্রোটিন থাকে, যাকে লিন মিট বলা হয়। অন্যদিকে চর্বিযুক্ত অংশ, মগজ বা ভুঁড়িতে কোলেস্টেরল ও ফ্যাটের পরিমাণ অনেক বেশি। তাই যতটা সম্ভব লিন মিট বেছে নেওয়া উচিত।

স্বাস্থ্যকর রান্নার পদ্ধতিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাংস রান্নার আগে লেবুর রস, টক দই, আদা, রসুন বা ভিনেগার দিয়ে কিছুক্ষণ মেরিনেট করে রাখলে তা তুলনামূলক সহজপাচ্য হয়। কম তেলে এবং বেশি সবজি দিয়ে রান্না করা ভালো। অতিরিক্ত ভাজাভুজি, ঘি বা মাখনের ব্যবহার কমানো উচিত। বেক, গ্রিল, স্টিম বা স্ট্যু ধরনের রান্না ভাজা খাবারের তুলনায় স্বাস্থ্যকর। বিফ স্টেক, গ্রিলড টিক্কা, সবজি সহ বেকড মিট, স্যুপ বা হালিম তুলনামূলক ভালো বিকল্প হতে পারে।

ভারী খাবারের পর হজম ঠিক রাখতে বোরহানি, টক দইয়ের ঘোল, জিরা পানি, আদা পানি বা ডাবের পানি খাওয়া উপকারী। অন্যদিকে কোমল পানীয়, কৃত্রিম রঙ ও ফ্লেভারযুক্ত ড্রিংকস শরীরের জন্য ক্ষতিকর, তাই এগুলো এড়িয়ে চলাই ভালো।

ঈদের দিন অনেকেই সারাদিন বসে গল্প করেন বা বিশ্রাম নেন। কিন্তু অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণের পর শরীরচর্চা না করলে হজমে সমস্যা ও ওজন বৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়ে। তাই ঈদের দিনেও অন্তত ৩০ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টা হাঁটার অভ্যাস রাখা উচিত। পাশাপাশি রাতের খাবার খাওয়ার পরপরই ঘুমানো উচিত নয়; অন্তত দুই ঘণ্টা বিরতি রাখা ভালো।

ঈদের আনন্দ যেন অসুস্থতার কারণ না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা আমাদের সবার দায়িত্ব। পরিমিত ও সচেতন খাদ্যাভ্যাস, স্বাস্থ্যকর রান্না এবং পর্যাপ্ত পানি ও সবজি গ্রহণের মাধ্যমে সুস্থ থেকে উৎসব উপভোগ করা সম্ভব। যাদের দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক সমস্যা রয়েছে, তারা প্রয়োজনে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিয়ে খাদ্যতালিকা নির্ধারণ করতে পারেন।


লেখক-
ইসরাত জাহান ইফাত
সিনিয়র ক্লিনিক্যাল নিউট্রিশনিস্ট
বাংলাদেশ সাইকিয়াট্রিক কেয়ার ক্লিনিক, ধানমন্ডি
ও বায়োজিন কসমেসিউটিকেলস

মন্তব্য করুন