দিল্লিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের হল থেকে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধার
ছবি: সংগৃহীত
১২:৪৫ এএম | ২৫ মে, ২০২৬
উচ্চশিক্ষা অর্জন ও প্রকৌশলী হয়ে পরিবার এবং দেশের মুখ উজ্জ্বল করার স্বপ্ন নিয়ে ভারতে পাড়ি জমিয়েছিলেন জামালপুরের মাদারগঞ্জের তরুণ শিক্ষার্থী মোস্তাক আহমেদ সাগর। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না।
দিল্লির ফরিদাবাদে নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের হলরুমে বসে ফেসবুকে আবেগঘন একটি স্ট্যাটাস দেয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই আত্মহননের পথ বেছে নেন তিনি। মেধাবী এই শিক্ষার্থীর এমন আকস্মিক ও হৃদয়বিদারক মৃত্যুতে তার পরিবারে চলছে শোকের মাতম, পুরো এলাকায় নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।
নিহত মোস্তাক আহমেদ সাগর জামালপুর জেলার মাদারগঞ্জ উপজেলার কড়ইচড়া ইউনিয়নের ঘুঘুমারি বাজার এলাকার বাসিন্দা এবং স্থানীয় পল্লী চিকিৎসক মোশারফ হোসেন মিন্টুর ছেলে।
সাগরের পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সাগর উচ্চ শিক্ষা লাভের উদ্দেশ্যে তিন বছর আগে ভারতের ফরিদাবাদের মানব রচনা ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব রিসার্চ অ্যান্ড স্টাডিজ-এ কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ভর্তি হয়ে অধ্যয়ন শুরু করে। গত ২৩ মে শনিবার বিকেলে নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে একটি আবেগঘন স্ট্যাটাস পোস্ট করেন সাগর। সেখানে তিনি মা-বাবার কাছে ক্ষমা চেয়ে লেখেন, জীবনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের লড়াইয়ে তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। দেশে ফিরে পরিবারের সঙ্গে সুখের মুহূর্ত ভাগাভাগি করতে না পারার আক্ষেপও প্রকাশ করেন।
স্ট্যাটাসের একপর্যায়ে নিজের মানসিক অস্থিরতা, ব্যক্তিগত হতাশা ও অপূর্ণ ভালোবাসার কথা উল্লেখ করেন সাগর। একই সঙ্গে মৃত্যুর জন্য কাউকে দায়ী না করার অনুরোধ জানিয়ে তিনি লেখেন, তার এই সিদ্ধান্তের জন্য যেন কোনও নির্দোষ মানুষকে দোষারোপ করা না হয়। মৃত্যুর পর ঝামেলাহীনভাবে তার লাশ দাফনের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
নিহতের বাবা মোশারফ হোসেন মিন্টু বলেন, গত শনিবার বিকেলে আত্মীয়স্বজন ফেসবুকে সাগরের আবেকঘন স্ট্যাটাস দেখতে পায়। সঙ্গে সঙ্গে তিনি ভারতের ওই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তখন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ থেকে তাকে জানানো হয় তার ছেলে আবাসিক হলের কক্ষে ফ্যানের সঙ্গে ফাঁসিতে ঝুলে আত্মহত্যা করেছে। সাগরের মৃত্যুর খবর শোনার পর থেকেই তার পরিবারে চলছে শোকের মাতম।
সাগরের মা সুফিয়া বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, শনিবার দুপুরে ছেলে সাগরের সঙ্গে শেষ কথা হয় তার। এখন কি করছো মায়ের এমন প্রশ্নের জবাবে সাগর বিছানায় শুয়ে থাকার কথা বলে। সামনে পরীক্ষা ভালভাবে পড়াশোনা করা ও কলেজের ফি জমা দেয়াসহ নানা বিষয়ে কথা হয় মা-ছেলের মধ্যে। তখনও তিনি ছেলের কথা বা আচরণে কোনভাবেই অ্যাঁচ করতে পারেননি এটাই ছেলের সঙ্গে তার শেষ কথা।
তিনি আরও বলেন, অনেক কষ্ট করে ছেলেকে বিদেশে পড়তে পাঠিয়েছিলাম। ছেলে এবং তাদের স্বপ্ন ছিল পড়াশোনা শেষ করে একদিন বড় প্রকৌশলী হয়ে দেশে ফিরবে ছেলে। সেইসব স্বপ্ন চুরমার হয়ে গেল।
স্থানীয় সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হক জানান, ভারতের বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে ফোনে সাগরের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। বর্তমানে দিল্লির একটি হাসপাতালে তার মরদেহ রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে। ভারতীয় পুলিশ সাগরের মৃত্যুর ঘটনাটি তদন্ত করছে। পরিবার ও এলাকাবাসী বাংলাদেশ সরকারের কাছে দ্রুত সাগরের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানান।
এদিকে সাগরের মৃত্যুর খবর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকায় শোকের আবহ নেমে আসে। তার বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়স্বজন, সহপাঠী ও স্থানীয়রা ফেসবুকে শোক প্রকাশ করছেন। অনেকেই মাদারগঞ্জের ঘুঘুমারী গ্রামের বাড়িতে ভিড় জমাচ্ছেন। ভদ্র, শান্ত ও মেধাবী সাগরের এমন মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না তারা।
মাদারগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ স্নেহাশিষ রায় বলেন, তিনিও বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অবগত হয়েছেন। সাগরের পরিবারের পক্ষ থেকে বিষয়টি তাকে এখনও অবগত করা হয়নি। তবে নিহত সাগরের পরিবারের পক্ষ থেকে যে কোন সহায়তা চাওয়া হলে সেটি তাৎক্ষণিকভাবে দেখা হবে।
এসকে/এসএন