© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

রয়টার্সের প্রতিবেদনহোয়াইট হাউসের চাপেই পদত্যাগ করতে বাধ্য হলেন তুলসী গ্যাবার্ড

শেয়ার করুন:
হোয়াইট হাউসের চাপেই পদত্যাগ করতে বাধ্য হলেন তুলসী গ্যাবার্ড

ছবি: সংগৃহীত

মোজো ডেস্ক
০২:৫১ এএম | ২৬ মে, ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালকের (ডিএনআই) পদ ছাড়ছেন তুলসী গ্যাবার্ড। দীর্ঘদিন ধরে তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ ও অনুগত হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থান ও বিভিন্ন বিতর্কিত দাবিকেও তিনি প্রকাশ্যে সমর্থন দিয়েছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পররাষ্ট্রনীতি ও বিশেষ করে ইরান ইস্যুতে মতপার্থক্যই তার জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। হোয়াইট হাউসের রাজনৈতিক চাপের মুখে অবশেষে পদত্যাগ করতে বাধ্য হচ্ছেন তুলসী গ্যাবার্ড।

গত ২২ মে ট্রাম্পের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন তুলসী গ্যাবার্ড। তিনি জানিয়েছেন, আগামী ৩০ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব ছাড়বেন। স্বামীর ক্যানসার ধরা পড়ায় তার পাশে থাকার জন্যই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি। তবে মার্কিন কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের দাবি, হোয়াইট হাউসের চাপেই তাকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে।

গত বছর থেকেই ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরে তুলসী গ্যাবার্ডকে নিয়ে অস্বস্তি বাড়তে থাকে। বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে তার অবস্থান ট্রাম্পকে ক্ষুব্ধ করে। ট্রাম্প চাইছিলেন, গ্যাবার্ড প্রকাশ্যে বলুন- ইরান খুব দ্রুত পারমাণবিক বোমা তৈরির সক্ষমতা অর্জন করতে যাচ্ছে। কিন্তু মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মূল্যায়নের ভিত্তিতে তিনি বারবার বলেন, ইরান এখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সিদ্ধান্ত নেয়নি।

২০২৫ সালের মার্চে কংগ্রেসে দেওয়া সাক্ষ্যে তুলসী গ্যাবার্ড বলেন, মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে না। তার এই বক্তব্য ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে পড়ে। পরে সাংবাদিকেরা এ নিয়ে প্রশ্ন করলে ট্রাম্প প্রকাশ্যে বিরক্তি প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, সে কী বলেছে, তাতে আমার কিছু যায় আসে না। আমার বিশ্বাস, তারা খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল।

এর পর থেকেই জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক ও পরিকল্পনা থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরিয়ে রাখা হয় গ্যাবার্ডকে। ইরান ইস্যুতে হোয়াইট হাউসের একাধিক বৈঠকে তাকে ডাকা হয়নি। এমনকি কংগ্রেসকে দেওয়া কিছু গোপন ব্রিফিংয়েও তিনি অনুপস্থিত ছিলেন।

তুলসী গ্যাবার্ড বরাবরই বিদেশে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের সমালোচক ছিলেন। ইরাক যুদ্ধ থেকে শুরু করে বিভিন্ন দেশে সরকার পরিবর্তনের মার্কিন নীতির বিরোধিতা করেছেন তিনি। ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরে অনেকেই মনে করতেন, এই অবস্থান তাকে পুরোপুরি বিশ্বাসযোগ্য করে তুলছে না।

গত জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার একটি গোপন পরিকল্পনা নিয়েও কাজ চলছিল বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। তবে সেই পরিকল্পনা থেকে গ্যাবার্ডকে দূরে রাখা হয়। কারণ, বিদেশে সরকার পরিবর্তনের অভিযানের বিরোধী হিসেবে তাঁর অবস্থান প্রশাসনের কট্টর অংশের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না।

এ সময় তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও ন্যাশনাল কাউন্টার টেররিজম সেন্টারের পরিচালক জো কেন্টও পদত্যাগ করেন। ইরান যুদ্ধের বিরোধিতা করে দেওয়া পদত্যাগপত্রে তিনি লেখেন, বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ থেকে আমি এই যুদ্ধকে সমর্থন করতে পারি না।

২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারে ট্রাম্প নিজেকে যুদ্ধবিরোধী নেতা হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, নতুন কোনো যুদ্ধ শুরু করবেন না; বরং চলমান সংঘাত থামাবেন। কিন্তু দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক অভিযান বাড়ানোর কারণে সেই প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে।

বিশ্লেষকদের মতে, তুলসী গ্যাবার্ড ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য এক ধরনের অস্বস্তিকর প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। কারণ, তিনি এমন এক অবস্থানের প্রতিনিধিত্ব করছিলেন, যা ট্রাম্পের আগের রাজনৈতিক বক্তব্যের সঙ্গে মিল থাকলেও বর্তমান নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল।

বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে তার বক্তব্য ট্রাম্প প্রশাসনের যুদ্ধপন্থী অবস্থানকে দুর্বল করে দেয়। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ), স্বতন্ত্র বিশ্লেষক ও মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তারাও বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, ইরান উচ্চমাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করলেও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে- এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন বারবার দাবি করে আসছিল, ইরান খুব দ্রুত পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন করতে যাচ্ছে। সেই প্রেক্ষাপটে তুলসী গ্যাবার্ডের সতর্ক ও তথ্যভিত্তিক অবস্থান হোয়াইট হাউসের সঙ্গে তার দূরত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়।

শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পের প্রতি দীর্ঘদিনের আনুগত্যও তাকে রক্ষা করতে পারেনি। ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক অন্দরমহলের অনেকের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনে টিকে থাকতে শুধু আনুগত্য নয়, প্রেসিডেন্টের অবস্থানের সঙ্গে নিঃশর্ত একমত থাকাও জরুরি। আর সেই জায়গাতেই শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে পড়েন তুলসী গ্যাবার্ড।

সূত্র: রয়টার্স

এসকে/টিএ

মন্তব্য করুন