© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার এবং বাংলাদেশে স্পোর্টস বল শিল্পের সম্ভাবনা

শেয়ার করুন:
বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার এবং বাংলাদেশে স্পোর্টস বল শিল্পের সম্ভাবনা

ছবি: সংগৃহীত

তারিক হাসান, প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন বিষয়ক উপদেষ্টার একান্ত সচিব ও সদস্য সচিব, টেনিস কমিটি, অফিসার্স ক্লাব ঢাকা
১২:২৫ পিএম | ৩১ মে, ২০২৬
বাংলাদেশ- প্রায় ১৮ কোটি মানুষের এক প্রাণবন্ত দেশ, যেখানে খেলাধুলা শুধু বিনোদন নয়, এটি মানুষের জীবনের সঙ্গে মিশে আছে শিকড়ের মতো। ফুটবলের উত্তেজনা থেকে ক্রিকেটের উন্মাদনা, টেনিস থেকে ভলিবল- সব বয়সের মানুষ মাঠে নামে, স্বপ্ন দেখে, জয়ের আনন্দ ভাগ করে নেয়।

কিন্তু এই বিশাল ক্রীড়াপ্রেমী জাতির এক অদ্ভুত বাস্তবতা রয়েছে। যে বল দিয়ে লক্ষ মানুষ প্রতিদিন খেলে, সেই বলটুকুও আমাদের কিনতে হয় বিদেশ থেকে। পাকিস্তান, চীন, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভারত থেকে আমদানি করা বলের উপর নির্ভর করেই চলছে দেশের পুরো ক্রীড়া সামগ্রীর বাজার। এই নির্ভরশীলতা একদিকে যেমন মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় ঘটাচ্ছে, অন্যদিকে দেশীয় শিল্পের বিকাশের পথও রুদ্ধ করে রাখছে।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ক্রীড়া খাতকে জাতীয় অর্থনীতির অংশ হিসেবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেছে। সেই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই এই প্রস্তাবনা - একটি শক্তিশালী দেশীয় স্পোর্টস বল শিল্প গড়ে তোলার স্বপ্ন ও সম্ভাবনার রূপরেখা।

বাংলাদেশের স্পোর্টস বল বাজারের আকার

২০২৬ সালের ১ এপ্রিল থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত আমদানি তথ্যের ভিত্তিতে বার্ষিক বাজারের একটি প্রাক্কলন করা হয়েছে। যদি ধরা হয় যে উক্ত সময়ের আমদানির ধারা সারা বছর একই হারে অব্যাহত থাকবে, তাহলে বাংলাদেশের স্পোর্টস বল আমদানির বার্ষিক বাজারমূল্য নিম্নরূপ হতে পারে:
পণ্যের ধরন

লন টেনিস বলের সম্ভাব্য বার্ষিক আমদানি মূল্য  ৩,১৩,৬০,৯০৮ (টাকা), ইনফ্ল্যাটেবল বল (ফুটবল, বাস্কেটবল, ভলিবল ইত্যাদি) ২৮,৬৯,২৩,৪৫৬, অন্যান্য স্পোর্টস বল
 ২৮,৫৫,৩৮,৩৬৮। মোট ৬০,৩৮,২২,৭৩২ (টাকা)।

অর্থাৎ, শুধুমাত্র স্পোর্টস বলের বাজারের আনুমানিক বার্ষিক আকার প্রায় ৬০.৩৮ কোটি টাকা। এটি একটি উল্লেখযোগ্য বাজার, যা দেশীয় উৎপাদনের মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হলে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শিল্পায়নের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে।

সম্ভাবনা

বাংলাদেশ টেনিস ফেডারেশনের উদ্যোগে প্রাথমিকভাবে একটি আধুনিক লন টেনিস বল উৎপাদনের মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু করা যেতে পারে। পরবর্তীতে ফুটবল, ক্রিকেট-টেনিস বল, ভলিবল এবং অন্যান্য ক্রীড়া বল উৎপাদনের মাধ্যমে বাজার সম্প্রসারণ করা সম্ভব হবে।

এ ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে:

আমদানি নির্ভরতা হ্রাস পাবে;
বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে;
দেশীয় শিল্প ও প্রযুক্তির বিকাশ ঘটবে;
নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে;
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে;

ভবিষ্যতে রপ্তানিমুখী শিল্প হিসেবে বিকাশের সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে।

সুতরাং, বাংলাদেশের ক্রীড়া খাতের উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক মূল্য সংযোজনের লক্ষ্যে একটি দেশীয় স্পোর্টস বল শিল্প প্রতিষ্ঠা সময়োপযোগী ও সম্ভাবনাময় উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও প্রযুক্তিগত অংশীদারিত্বের সম্ভাবনা

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের উন্নয়ন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং শিল্প সহযোগিতার নতুন সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী বছরগুলোতে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান উভয় দেশের অর্থনীতির আকার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে খেলাধুলা, বিনোদন এবং ক্রীড়া সামগ্রীর চাহিদাও স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধি পাবে।

পাকিস্তানের শিয়ালকোট শহর ব্রিটিশ শাসনামল থেকেই বিশ্বমানের খেলাধুলার সামগ্রী উৎপাদনের জন্য সুপরিচিত। বর্তমানে ফুটবল, ক্রিকেট সামগ্রী, হকি স্টিক, গ্লাভস এবং বিভিন্ন ধরনের স্পোর্টস বল উৎপাদন ও রপ্তানির ক্ষেত্রে শিয়ালকোট আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি শিল্পকেন্দ্র। বিশেষ করে টেনিস বল উৎপাদনের ক্ষেত্রে শিয়ালকোটভিত্তিক Bevan Sports একটি পরিচিত প্রতিষ্ঠান। এছাড়াও ROZA Sports, Lucid Industriesসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান টেনিস বল উৎপাদন ও রপ্তানির সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছে। তবে ফুটবল বা অন্যান্য ক্রীড়া সামগ্রীর তুলনায় আন্তর্জাতিক মানের টেনিস বল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা পাকিস্তানে তুলনামূলকভাবে সীমিত।

এই প্রেক্ষাপটে Bevan Sports-এর কারিগরি সহযোগিতা, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং সম্ভাব্য যৌথ উদ্যোগের (Joint Venture) মাধ্যমে বাংলাদেশে একটি আধুনিক লন টেনিস বল ও টেপ টেনিস বল উৎপাদন কারখানা স্থাপনের সুযোগ রয়েছে। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন উৎপাদন প্রযুক্তি, গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং দক্ষ জনবল উন্নয়নের সুবিধা পাওয়া যেতে পারে।
বিকল্পভাবে, চীনের আধুনিক স্পোর্টস বল উৎপাদন প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি আমদানি করেও একটি সমন্বিত ও আধুনিক উৎপাদন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা সম্ভব। বর্তমানে চীন বিশ্বব্যাপী স্পোর্টস সামগ্রী উৎপাদনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র এবং প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে উন্নত প্রযুক্তির উৎপাদন যন্ত্রপাতি সরবরাহ করে থাকে। ফলে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি, মেশিনারি এবং কারিগরি সহায়তা সংগ্রহের মাধ্যমে বাংলাদেশে একটি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন স্পোর্টস বল উৎপাদন শিল্প প্রতিষ্ঠার যথেষ্ট সম্ভাবনা বিদ্যমান।

সঠিক বিনিয়োগ, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক প্রযুক্তিগত সহযোগিতা নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ শুধু নিজস্ব চাহিদা পূরণেই সক্ষম হবে না, বরং ভবিষ্যতে দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং অন্যান্য আঞ্চলিক বাজারে স্পোর্টস বল রপ্তানিকারক দেশ হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করতে পারবে।

বিনিয়োগ কাঠামো ও অংশীদারিত্বের প্রস্তাবনা

প্রস্তাবিত টেনিস বল উৎপাদন কারখানা স্থাপনের জন্য সরকারের প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে না। একটি অংশগ্রহণমূলক বিনিয়োগ কাঠামোর মাধ্যমে প্রয়োজনীয় মূলধন সংগ্রহ করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ টেনিস ফেডারেশনের কর্মকর্তা, সাবেক ও বর্তমান খেলোয়াড়, টেনিস সংগঠক এবং দেশের বিভিন্ন টেনিস ক্লাবের মধ্যে শেয়ার বণ্টনের মাধ্যমে প্রাথমিক বা আংশিক বিনিয়োগ সংগ্রহ করা যেতে পারে। এর ফলে প্রকল্পটির প্রতি টেনিস অঙ্গনের মালিকানা ও সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি পাবে।

অবশিষ্ট বিনিয়োগ দেশের একটি স্বনামধন্য শিল্পগোষ্ঠী বা কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণের মাধ্যমে সংগ্রহ করা যেতে পারে। একটি প্রতিষ্ঠিত দেশীয় কোম্পানির অংশগ্রহণ শুধু মূলধন সরবরাহের ক্ষেত্রেই নয়, বরং তাদের শিল্প ব্যবস্থাপনা, বিপণন, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং কর্পোরেট সুশাসনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের স্টার্ট-আপ সহায়তা তহবিল এবং অন্যান্য প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায়ও প্রয়োজনীয় অর্থায়নের সুযোগ অনুসন্ধান করা যেতে পারে। এর ফলে প্রকল্পের আর্থিক ঝুঁকি হ্রাস পাবে এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই ব্যবসায়িক ভিত্তি গড়ে তোলা সহজ হবে।

কারিগরি সহযোগিতা, উৎপাদন প্রযুক্তি, গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ এবং বাজার মূল্যায়নের ক্ষেত্রে পাকিস্তানের শিয়ালকোটভিত্তিক অভিজ্ঞ টেনিস বল প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের অংশগ্রহণ বিবেচনা করা যেতে পারে। যৌথ উদ্যোগ (Joint Venture), প্রযুক্তি স্থানান্তর (Technology Transfer) অথবা কারিগরি সহযোগিতা চুক্তির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

এখানে উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশ টেনিস ফেডারেশনের দীর্ঘদিনের সুনাম, গ্রহণযোগ্যতা এবং জাতীয় পর্যায়ে ব্র্যান্ড ভ্যালুকে স্বীকৃতি দিয়ে প্রস্তাবিত কোম্পানিতে ফেডারেশনের নাম ও লোগো ব্যবহারের বিনিময়ে বাংলাদেশ টেনিস ফেডারেশনকে ১০ শতাংশ ইকুইটি শেয়ার প্রদানের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে ফেডারেশন সরাসরি আর্থিক বিনিয়োগ ছাড়াই প্রকল্পের অংশীদার হতে পারবে এবং ভবিষ্যতে কোম্পানির মুনাফা ও প্রবৃদ্ধি থেকে আর্থিকভাবে উপকৃত হবে।

দীর্ঘমেয়াদি ক্রীড়া উন্নয়ন লক্ষ্য

প্রস্তাবিত স্পোর্টস বল উৎপাদন শিল্পের অন্যতম লক্ষ্য হবে দেশের টেনিস অবকাঠামো ও খেলোয়াড় উন্নয়নে সরাসরি অবদান রাখা। এ লক্ষ্যে আগামী ৫ বছরের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে কমপক্ষে ২ জন খেলোয়াড়কে আন্তর্জাতিক এটিপি (ATP) র‍্যাংকিংয়ে প্রতিষ্ঠিত করার একটি উচ্চাভিলাষী কিন্তু বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ করা যেতে পারে।

বর্তমানে বাংলাদেশে টেনিসের প্রতিভাবান খেলোয়াড়ের অভাব নেই, তবে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ, আন্তর্জাতিক মানের কোচিং এবং আর্থিক সহায়তার সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক সম্ভাবনাময় খেলোয়াড় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজেদের মেলে ধরতে পারে না। একটি শক্তিশালী টেনিস ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে হলে খেলোয়াড় তৈরির প্রক্রিয়াকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে।

এক্ষেত্রে সরকারের "নতুনকুঁড়ি" ক্রীড়া কর্মসূচির আওতায় লন টেনিস খেলাকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জেলা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে অল্প বয়সী মেধাবী খেলোয়াড়দের বাছাই, প্রশিক্ষণ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার সুযোগ সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি টেনিস ফেডারেশন, টেনিস ক্লাবসমূহ এবং প্রস্তাবিত টেনিস বল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগে একটি "টেনিস ট্যালেন্ট ডেভেলপমেন্ট ফান্ড" গঠন করা যেতে পারে, যার মাধ্যমে সম্ভাবনাময় খেলোয়াড়দের প্রশিক্ষণ, সরঞ্জাম, আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ এবং বিদেশে উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা সম্ভব হবে।

এভাবে শিল্প উন্নয়ন ও খেলোয়াড় উন্নয়নকে একই কাঠামোর মধ্যে সংযুক্ত করা গেলে বাংলাদেশে টেনিসের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাবে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের প্রতিনিধিত্ব শক্তিশালী হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে একটি টেকসই টেনিস সংস্কৃতি গড়ে উঠবে।

কেএন/এসএন


মন্তব্য করুন