কারাগারে আইভীকে গান শোনাতেন মমতাজ
ছবি: সংগৃহীত
০১:৪৪ এএম | ০৫ জুন, ২০২৬
কারাগারে থাকার সময় নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীকে গান শোনাতেন সংগীতশিল্পী ও মানিকগঞ্জের সাবেক এমপি মমতাজ বেগম। জামিনে কারামুক্তির পর নিজ বাড়িতে পৌঁছে জেলজীবনের নানা কথার প্রসঙ্গে এ কথাও জানান তিনি।
বৃহস্পতিবার দুপুরে আইভীর সঙ্গে দেখা করতে আসেন তাঁর স্কুল জীবনের বন্ধুরা। তাঁদের সঙ্গে গল্পের সময় সেলিনা হায়াত আইভী জানান, জেলে প্রায়ই তাঁকে গান শোনাতেন মমতাজ। প্রায়ই অবসর সময়ে জেলে গানের আসর বসত। সেখানে মূল শিল্পী মমতাজ। তবে একটি গানে ‘আমার ভাইয়েরে কইও নাইওর আনতো গিয়া’ এমন লাইন থাকায় আইভী তাঁকে এই গান গাইতে নিষেধ করেন।
তিনি মমতাজকে বলেন, তিনি যেদিন জেল থেকে বের হবেন সেদিন এই গান গাইলে কোনো অসুবিধা নেই। কারণ তিনি সেদিন বাসায় গিয়ে তার দুঃখ ভাগাভাগি করতে পারবেন। কারণ এই গান শুনলে তার সদ্য প্রয়াত ভাই আহমদ আলী রেজা রিপনের কথা মনে পড়ে যায়।
ঘটনাচক্রে তাঁর মুক্তি পাওয়ার দিন বিকেলে গানের আড্ডায় মমতাজ এই গান গেয়েছেন। তখনও আইভী জানতেন না তিনি মুক্তি পেতে যাচ্ছেন। ২০২৫ সালের ৭ এপ্রিল ৫৫ বছর বয়সে তাঁর ভাই হার্ট অ্যাটাকে মারা যান। প্রায় ১ মাস পর ২০২৫ সালের ৯ মে পুলিশ আইভীকে গ্রেপ্তার করে। রিপনের স্ত্রী এর চার বছর আগে মারা যায়। তাদের ৩ সন্তান আইভীর কাছেই থাকেন।
জেলে আইভী একটি কবিতা লেখেন। এটিতে সুর দিয়ে গান তৈরি করেন মমতাজ। মুক্তি পেলে মমতাজ এই গান জনসমক্ষে গাইবেন বলে জানান। কি সেই কবিতা? জিজ্ঞেস করতেই আইভী বললেন, ‘ধুর, আমি কি কবিতা লিখতে পারি? খুবই বাজে হইছে। উনি গুণি শিল্পী তাই এটাকে গান বানিয়েছেন। কবিতা ওনার কাছেই রয়ে গেছে। কপি করে আনিনি।’
জামিনে মুক্তি পেয়ে বুধবার রাত সাড়ে ১২টায় নিজ বাড়িতে পৌঁছেন সেলিনা হায়াৎ আইভী। এরপর আত্মীয়স্বজন আর শুভানুধ্যায়ীরা একে একে দেখা করতে আসছেন তাঁর সঙ্গে। ফোনের পর ফোন আসছে। ফোনে কথা বলতে বলতে আর স্বজনদের সঙ্গে সাক্ষাতে রাতে আর ঘুমাতে পারেননি।
বৃহস্পতিবার বেলা ১২টায় সাংবাদিক আর দেখা করতে আসা নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলার সময় এমনটাই বলছিলেন সদ্য কারামুক্ত ডা. সেলিনা হায়াত আইভী। ছোট ভাই আহম্মদ আলী রেজা রিপনের মৃত্যুর কয়েক দিনের মধ্যেই গ্রেপ্তার হয়েছিলেন আইভী। সে কথা মনে করে বেশ কয়েকবার আবেগপ্রবণ হয়ে যান তিনি।
বিকেল সাড়ে চারটায় তার বাসায় আসেন সাবেক নারী কাউন্সিলর মিনুয়ারা বেগম, শাওন অংকন, সাদিয়া সাউদ, সাবেক কাউন্সিলর মুক্তিযোদ্ধা অলিউর রহমান। তাদের সঙ্গে কথা বলার এক পর্যায়ে ভাইয়ের কথা মনে করে কান্নায় ভেঙে পড়েন আইভী।
সকাল থেকেই তার বাসার ভেতরে অবস্থিত পারিবারিক খানকায় ‘গাদিরে খুম’ এর ঐতিহাসিক ঘটনা স্মরণে ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন চলছিল। ইসলামের ইতিহাস অনুযায়ী, এ দিন গাদির নামের একটি কুয়ার পাশে নবীজি হযরত মুহাম্মদ (সা.) হযরত আলীকে তার উত্তরসূরি ঘোষণা করেন। এ উপলক্ষে তরিকতপন্থীরা বিশেষ দোয়ার আয়োজন করে। আইভী জেলে বসে দোয়া করেন, গাদিরে খুম দিবসের আগেই যেন তিনি বাসায় যেতে পারেন। তার সে দোয়া কবুল হয়েছে। এই গল্প করতে করতে তিনি বলেন, ‘যেসব ধর্মীয় আমল অন্য সময় করা হয়নি জেলে বসে তিনি সেসব আমল করেছেন।’
গত বছরের ৯ মে ভোরে নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগের নিজ বাসা থেকে আইভীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে তাঁকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের ঘটনায় হত্যা ও হত্যাচেষ্টা এবং বিস্ফোরক আইনে ১২টি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
এদিকে সাবেক এই মেয়রের বাসার সামনে অত্যাধুনিক সিসি ক্যামেরা বসিয়েছে জেলা পুলিশ। নারায়ণগঞ্জে তাঁর বাসায় যাওয়ার আগ মুহূর্তে বাড়ির গেটের সামনের ল্যাম্পপোস্টে এই সিসি ক্যামেরা বসানো হয়।
এ বিষয়ে জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) তারেক আল মেহেদী জানান, এই সিসি ক্যামেরা শুধু সাবেক মেয়রের বাড়িকে কেন্দ্র করে লাগানো হয়নি। নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা রোধে সিসি ক্যামেরা লাগানো হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে সাবেক মেয়রের বাসার সামনেও সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়েছে। এলাকায় মোট চারটি সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়েছে।
তিনি জানান, সাবেক মেয়রের সঙ্গে মানুষজন দেখা করতে আসতে পারবে। তবে তিনি কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড করছেন কিনা, রাজনৈতিক সভা করছেন কিনা, এটি পুলিশ নজরদারি করবে। তেমন কোনো প্রমাণ পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সিদ্ধিরগঞ্জ থানার দুই মামলায় ৩০ এপ্রিল হাইকোর্ট রুল দিয়ে আইভীকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দেন। এই জামিন স্থগিত চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষ পৃথক আবেদন করে। ১৭ মে আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতি মো. রেজাউল হকের নেতৃত্বাধীন চেম্বার জজ আদালত হাইকোর্টের দেওয়া জামিন স্থগিত চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনে ‘নো অর্ডার’ দেন। এর আগে গত ১০ মে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ঘটনায় হত্যাসহ পৃথক ১০ মামলায় সেলিনা হায়াৎ আইভীকে হাইকোর্টের দেওয়া জামিন বহাল রাখেন আপিল বিভাগ। ১২ মামলায় আইভীকে হাইকোর্টের দেওয়া জামিন বহাল রেখে আপিল বিভাগের দেওয়া আদেশ কারা কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে পৌঁছানোর পর যাচাই-বাছাই শেষে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়।
২০০৩ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার মেয়র ছিলেন আইভী। পরে নবগঠিত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের টানা তিনটি নির্বাচনেও মেয়র পদে জয়ী হন তিনি।
আরআই/টিএ