মোটরসাইকেল চালকদের বেপরোয়া মনোভাব, উদাসীনতা নাকি কর্তৃপক্ষের গাফিলতি: কার দোষে ঈদযাত্রায় লাশের মিছিল?
ছবি: সংগৃহীত
০৭:৪৩ পিএম | ০৫ জুন, ২০২৬
প্রতিবারের মতো এবারও ঈদুল আজহার আনন্দ ভাগাভাগি করতে লাখ লাখ মানুষ নাড়ির টানে ঢাকা ছেড়েছিলেন। কিন্তু অনেকের জন্যই এই আনন্দের যাত্রা শেষ হয়েছে চিরতরে, বিশেষ করে যারা দ্রুত বাড়ি পৌঁছানোর জন্য দুই চাকার বাহন 'মোটরসাইকেল' বেছে নিয়েছিলেন। বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক পত্রিকা এবং রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে এক ভয়াবহ ও উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে ওঠে। গত ২৫ মে থেকে শুরু হওয়া এবারের ঈদের ছুটিতে সড়ক দুর্ঘটনায় এককভাবে মোটরসাইকেলেই নিহতের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, যা মোট নিহতের প্রায় ৪৪ শতাংশ।

প্রশ্ন উঠেছে, সড়কের এই লাশের মিছিলের জন্য আসলে দায়ী কে? চালকদের বেপরোয়া মনোভাব, সাধারণ মানুষের উদাসীনতা, নাকি নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের গাফিলতি?
বিয়োগান্তক গল্প: পরিসংখ্যানের পেছনের কিছু চেনা মুখ
সংখ্যা কখনো মানুষের আবেগ, ভালোবাসা বা প্রিয়জন হারানোর শূন্যতা বোঝাতে পারে না। মৃত্যুর এই বিশাল সংখ্যার পেছনে লুকিয়ে আছে একেকটি পরিবারের আমৃত্যু হাহাকার। পত্রিকার পাতা ও মাঠপর্যায়ের তথ্য থেকে উঠে আসা কিছু ঘটনা আমাদের বিবেককে নাড়া দিয়ে যায়।
গল্প ১: নতুন বাইকের আনন্দ যখন বিষাদ
২৫ মে সকালে সাভারের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ২৬ বছর বয়সি তরুণ কর্মকর্তা তানভীর আহমেদ ঢাকা থেকে রংপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন। ঈদের ঠিক দুদিন আগে তিল তিল করে জমানো টাকায় আর বাবার দেওয়া কিছু সহযোগিতা মিলিয়ে একটি নতুন চকচকে মোটরসাইকেল কিনেছিলেন তিনি। উদ্দেশ্য ছিল নতুন বাইকে চেপে বাড়ি ফিরে মা-বাবাকে চমকে দেবেন, ঈদের আনন্দটা হবে দ্বিগুণ। কিন্তু মহাসড়কের তীব্র যানজট এড়াতে এবং নতুন বাইকের গতি পরীক্ষা করতে গিয়ে একপর্যায়ে তিনি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। সিরাজগঞ্জের একটি মহাসড়কে আইল্যান্ডের সাথে ধাক্কা খেয়ে ছিটকে পড়েন তানভীর। শোরুম থেকে তোলা নতুন বাইকটির নম্বর প্লেট বসার আগেই তা দুমড়েমুচড়ে যায়, আর নতুন বাইকের আনন্দ নিমিষেই রূপ নেয় পুরো পরিবারের কখনো না শোকানো এক গভীর ক্ষতে।
গল্প ২: ফয়সালের শেষ গতি
২৫ মে বিকেলে ঢাকা থেকে কুষ্টিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিল ২২ বছরের তরুণ ফয়সাল। নতুন কেনা ১৫০ সিসির মোটরসাইকেল, চোখে ঈদের আনন্দ আর বন্ধুদের সাথে আগে বাড়ি পৌঁছানোর এক অঘোষিত প্রতিযোগিতা। মহাসড়কের ফাঁকা অংশ পেয়ে সে গতি বাড়িয়ে দেয়। একটি বাঁক পার হওয়ার সময় অতিরিক্ত গতির কারণে নিয়ন্ত্রণ রাখতে না পেরে উল্টো দিক থেকে আসা একটি বাসের নিচে চলে যায় ফয়সালের বাইকটি। ঘটনাস্থলেই ফয়সাল ও তার পেছনে থাকা সহযাত্রী বন্ধু নিহত হয়। এটি কোনো সাধারণ দুর্ঘটনা নয়; এটি গতির অন্ধ মোহের এক করুণ ও নির্মম পরিণতি, যা পরিবারটির জন্য বয়ে এনেছে আজীবন বয়ে বেড়ানোর মতো এক নিঃসঙ্গ দীর্ঘশ্বাস।
গল্প ৩: উদাসীনতার বলি এক শিশু
ঈদের দিন বিকেলে সাভারের একটি আঞ্চলিক সড়কে সপরিবারে আনন্দ ভ্রমণে বেরিয়েছিলেন এক দম্পতি। চালক বাবা, মাঝে চার বছরের শিশু সন্তান এবং পেছনে মা। কারোর মাথায় হেলমেট ছিল না। হঠাৎ পাশ থেকে একটি ধীরগতির ইজিবাইক সামনে চলে আসলে বাবা আচমকা ব্রেক চাপেন। মোটরসাইকেলটি পিছলে পড়ে যায় এবং পেছনের মা ও শিশু ছিটকে পড়ে রাস্তার মাঝখানে। ঠিক সেই মুহূর্তে পেছন থেকে আসা একটি দ্রুতগামী পিকআপ শিশুটিকে চাপা দেয়। এখানে চালকের বেপরোয়া গতি হয়তো ছিল না, কিন্তু ছিল চরম উদাসীনতা ও সুরক্ষার অভাব, যার খেসারত দিতে হলো নিষ্পাপ এক শিশুর জীবন দিয়ে। একটি অসতর্ক মুহূর্ত নিমেষেই হাসিখুশি পরিবারটিকে ফেলে দিল এক অন্তহীন ট্র্যাজেডির মুখে।
গল্প ৪: রেমিট্যান্স যোদ্ধার নিভে যাওয়া স্বপ্ন
আরেকটি মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে। ২৯ বছর বয়সী প্রবাসী যুবক মিজানুর রহমান দীর্ঘ তিন বছর পর দেশে ফিরেছিলেন মা-বাবার সাথে ঈদ করতে। ঈদের পরদিন বন্ধুদের সাথে দেখা করতে মোটরসাইকেল নিয়ে বের হন তিনি। একটি হাইওয়ে জংশনে রাস্তা পার হওয়ার সময় অপর দিক থেকে আসা একটি বেপরোয়া দূরপাল্লার বাস তার মোটরসাইকেলটিকে সজোরে ধাক্কা দেয়। মিজানের মাথায় হেলমেট থাকা সত্ত্বেও বাসের নিচে পিষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। যে ছেলেটিকে নিয়ে পরিবারের মুখে হাসির জোয়ার উঠেছিল, সেই ছেলের লাশ দেখে আজ পুরো পরিবার স্তব্ধ। এখানে মিজানের কোনো বেপরোয়া গতি ছিল না, কিন্তু ছিল সঠিক নিয়ম না মানা, মহাসড়কের বিশৃঙ্খলা আর বাস চালকের মরণঘাতী প্রতিযোগিতা।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, এবারের ঈদযাত্রায় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রায় ৪৩ শতাংশ ঘটনাই ঘটেছে মোটরসাইকেল চালকের নিয়ন্ত্রণ হারানোর কারণে। এছাড়া মুখোমুখি সংঘর্ষ এবং পেছন থেকে অন্য যানবাহনের ধাক্কায় বাকি দুর্ঘটনাগুলো ঘটেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, নিহত মোটরসাইকেল চালক ও আরোহীদের সিংহভাগের বয়স ১৫ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। অর্থাৎ, দেশের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় তরুণ ও উৎপাদনশীল জনগোষ্ঠীই এই দুই চাকার মরণফাঁদে সবচেয়ে বেশি প্রাণ হারাচ্ছে।
বেপরোয়া মনোভাব, উদাসীনতা নাকি গাফিলতি?
এই ত্রিভুজ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের তিনটি দিকই সমানভাবে খতিয়ে দেখতে হবে যেমন-
১. চালকদের বেপরোয়া মনোভাব: তরুণ চালকদের মধ্যে ট্রাফিক আইন অমান্য করা, হেলমেট সঠিকভাবে না পরা অথবা মানহীন প্লাস্টিক হেলমেট ব্যবহার করা এবং ওভারটেকিংয়ের এক মরণনেশা দেখা যায়। ঈদযাত্রায় মহাসড়ক একটু ফাঁকা পেলেই তারা বেপরোয়া গতিতে বাইক চালান। এই বেপরোয়া মনোভাবই বেশিরভাগ নিয়ন্ত্রণ হারানোর মূল কারণ।
২. সাধারণ মানুষের উদাসীনতা: মোটরসাইকেল মূলত একটি দূরপাল্লার পারিবারিক বাহন নয়। কিন্তু উদাসীনতাবশত অনেকেই স্ত্রী-সন্তান ও ভারী ব্যাগ নিয়ে শত শত কিলোমিটার পথ এই বাহনের মাধ্যমে পাড়ি দিচ্ছেন। দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার কারণে ক্লান্তি, ঘুম ঘুম চোখ এবং যথাযথ সুরক্ষাসামগ্রী না থাকা এই উদাসীনতারই অংশ, যা দুর্ঘটনাকে ডেকে আনছে।
৩. প্রশাসন বা কর্তৃপক্ষের গাফিলতি: এখানেই সবচেয়ে বড় জবাবদিহিতার জায়গা। মহাসড়কে দূরপাল্লার দ্রুতগতির বাসের পাশাপাশি ইজিবাইক/ব্যাটারিচালিত রিক্সা, নসিমন বা সিএনজি অটো রিক্সার মতো ধীরগতির অননুমোদিত যানবাহন চলাচলের উপর নিষেধাজ্ঞা থাকলেও তা কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হয়নি। লাইসেন্সবিহীন চালক ও রেজিস্ট্রেশন বিহীন মোটরসাইকেল কীভাবে মহাসড়কে নির্বিঘ্নে চলাচল করল, সেই নজরদারি কোথায় ছিল? হাইওয়ে পুলিশের তদারকি ও আইন প্রয়োগের শিথিলতা কর্তৃপক্ষের গাফিলতিকেই স্পষ্ট করে।
প্রতি বছর ঈদের পর শোক প্রকাশ করে বা কাউকে এককভাবে দোষারোপ করে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। আমাদের সম্মিলিত ও টেকসই উদ্যোগ প্রয়োজন যেমন-
কঠোর আইন প্রয়োগ: মহাসড়কে মোটরসাইকেলের গতিসীমা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। হেলমেট ছাড়া যাতে কোনভাবেই মোটরসাইকেল চালকরা সড়কে নামতে না পারে পারে। স্পিড গানের ব্যবহার বাড়িয়ে তাৎক্ষণিক জরিমানার ব্যবস্থা করতে হবে।
সচেতনতা বৃদ্ধি: তরুণদের ও অভিভাবকদের বুঝতে হবে যে গতির চেয়ে জীবনের মূল্য অনেক বেশি। মোটরসাইকেলে সপরিবারে দূরপাল্লার যাত্রা নিরুৎসাহিত করতে হবে। মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার করতে হবে এবং তা সঠিকভাবে পড়তে হবে।
মানসম্পন্ন গণপরিবহনের সহজলভ্যতা: মানুষ যদি নিরাপদ ও আরামদায়ক বাস বা ট্রেনের টিকিট সহজে ও সঠিক মূল্যে পেত, তবে বাধ্য হয়ে অনেকেই হয়তো মোটরসাইকেলে এত দীর্ঘ ঝুঁকিপূর্ণ পথ পাড়ি দিত না।
ঈদ হোক আনন্দ, মিলন আর সুখের বার্তা বয়ে আনার উৎসব; কোনো পরিবারের জন্য না হোক কান্না, শোক কিংবা অপূরণীয় ক্ষতির স্মৃতি। সড়কে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় চালকের সতর্কতা, যাত্রীর সচেতনতা এবং প্রশাসনের কার্যকর তদারকি সমানভাবে জরুরি। সবার দায়িত্বশীল আচরণই পারে নিরাপদ ঈদযাত্রা নিশ্চিত করতে।
টিকে