এই হার আমাদের প্রাপ্য ছিল না: কোচ পিটার বাটলার
ছবি: সংগৃহীত
০৪:৪১ এএম | ০৭ জুন, ২০২৬
দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলে শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখার লড়াইয়ে শেষ বাঁশি বাজতেই গোয়ার নেহেরু স্টেডিয়াম যেন রূপান্তরিত হলো এক টুকরো বিষাদের দ্বীপে। একদিকে যখন স্বাগতিক ভারতের গ্যালারিজুড়ে হর্ষধ্বনি, ঠিক তখনই হ্যাটট্রিক শিরোপার স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার চড়া বেদনায় মাঝমাঠেই নিথর বসে পড়লেন মারিয়া-আফঈদা-ঋতুপর্ণা-তহুরারা; কারও চোখ ভেসে গেল নোনা জলে, কেউবা ক্লান্ত শরীরটা এলিয়ে দিলেন মাঠের সবুজ ঘাসে। গোয়ার জওহরলাল নেহেরু স্টেডিয়ামে শনিবার উইমেন’স সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের কাছে ৩-১ গোলে হেরে শিরোপা খুইয়েছে বাংলাদেশ।
ম্যাচ শেষে মাঠের সেই কান্নার আবহকে আরও ভারী করে দিয়ে সংবাদ সম্মেলন কক্ষের বাইরে তখন নামলো মুষলধারে বৃষ্টি। প্রকৃতি যেন বাংলাদেশের মেয়েদের এই হৃদয়ভাঙা হারের ব্যথায় শামিল হলো। ঠিক এমন এক মেঘাচ্ছন্ন ও গুমোট আবহে সংবাদ সম্মেলনে এসে বাংলাদেশ দলের প্রধান কোচ পিটার বাটলারের কণ্ঠে ঝরল ক্ষোভ ও আক্ষেপ। নিজের দল নিয়ে পর্বতসম গর্ব প্রকাশ করেও এই ইংলিশ কোচ জানালেন— মাঠের লড়াইয়ে দল দুর্দান্ত খেললেও ভাগ্য এবং টাইমিংয়ের নিষ্ঠুর পরিহাসে এই পরাজয় মেনে নিতে হচ্ছে, যা কোনোভাবেই দলের প্রাপ্য ছিল না।
পারফরম্যান্সের প্রতিফলন নেই স্কোরলাইনে
২০২২ সালে গোলাম রব্বানী ছোটনের হাত ধরে এই শিরোপা প্রথম জয়ের পর, ২০২৪ সালে বাটলারের কোচিংয়েই মুকুট ধরে রেখেছিল বাংলাদেশ। এবার গ্রুপ পর্ব ও সেমি-ফাইনালে কিছুটা বিবর্ণ থাকলেও ফাইনালের মঞ্চে এসে চেনা দাপুটে ফুটবলের পসরা মেলেন ঋতুপর্ণা-মারিয়ারা। কিন্তু ফিনিশিংয়ের ব্যর্থতা ও রক্ষণের ভুলে চড়া মাশুল দিতে হয়েছে দলকে।
বাটলারের স্পষ্ট মনে হয়েছে, তাদের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের সঠিক প্রতিফলন স্কোরলাইনে ঘটেনি। তিনি বলেন, “সত্যি বলতে, আমার মনে হয়, যেভাবে খেলা হয়েছে স্কোরলাইনে তার সঠিক প্রতিফলন নয়। আমার মতে, ম্যাচের একটা দীর্ঘ সময় জুড়ে আমরাই সেরা দল ছিলাম। মেয়েদের নিয়ে আমি সত্যিই ভীষণ গর্বিত, তারা যেভাবে নিজেদের মেলে ধরেছে এবং যেভাবে চেষ্টা করেছে। তবে হ্যাঁ, আমার মনে হয় প্রথম গোলটি ছিল একটা আকস্মিক দুর্ঘটনা, আমরা স্রেফ খেই হারিয়ে ফেলেছিলাম।”
ম্যাচের প্রথমার্ধের ৪২ বা ৪৩ মিনিটে প্রথম গোল হজম করে বাংলাদেশ। এরপর ঋতুপর্ণা চাকমার চোখধাঁধো গোলে সমতায় ফিরলেও দ্বিতীয়ার্ধের শুরুর প্রথম মিনিটেই (১ মিনিট ৪ সেকেন্ড) দ্বিতীয় গোলটি খেয়ে বসে দল। গোল হজমের এই বাজে টাইমিং নিয়ে বাটলার বলেন, “প্রথম গোলটি হজম করার সময়টাও খারাপ ছিল। আর দ্বিতীয় গোলটি হয়েছে ঠিক বিরতির পরই— এক মিনিট ৪ সেকেন্ডের মাথায়। মেয়েরা জানে যে, আমি সবসময় ২০ মিনিটের ব্লক বা ১৫-২০ মিনিটের ব্লকে কাজ করি। আর তৃতীয় গোলটির সময় আমরা আক্রমণ করছিলাম, সুযোগ খুঁজছিলাম, দারুণ একটা সুযোগও ছিল। তবে হ্যাঁ, যা হওয়ার তা তো হয়েছেই এবং দুর্ভাগ্যবশত, এটি আমাদের জন্য হতাশাজনক। কিন্তু মেয়েরা যেভাবে খেলেছে, বিশেষ করে তরুণ মেয়েরা, তাতে আমি সত্যিই খুব সন্তুষ্ট।”
ভাঙা নয়, শেখার বার্তা
ফাইনালে হারলেও আলো ছড়ানো তরুণ মোমিতা খাতুন, আনিকা রানিয়া সিদ্দিকীদের প্রশংসায় ভাসিয়েছেন বাটলার। এই হারে ভেঙে না পড়ে এটিকে একটি শেখার প্রক্রিয়া হিসেবে দেখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “আমার মনে হয়, মোমিতার পারফরম্যান্স অসাধারণ ছিল। আনিকাও খুব, খুব ভালো করেছে। শামসুন্নাহার ও তহুরা সত্যিই অনেক পরিশ্রম করেছে, জানপ্রাণ দিয়ে লড়েছে। মারিয়া মান্দা অধিনায়ক হিসেবে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে। সুতরাং, হ্যাঁ, দলের ঘাটতিগুলো কোথায় তা আমি জানি, তবে আমার মনে হয় এটা নিয়ে আমাদের খুব বেশি ভেঙে পড়লে চলবে না।”
তিনি বলেন, “আমি সবসময় বলি, এটা একটা প্রতিনিয়ত শেখার প্রক্রিয়া। তবে এই টুর্নামেন্ট একটু ওঠানামার মধ্য দিয়ে গেছে এবং এটা শুধু আমাদের জন্য নয়, অন্যদের জন্যও। ভারতের কোচের সঙ্গে আমার কথা হচ্ছিল। তবে আমি মনে করি, তারাও জানে যে, আজ রাতে, এই হারটি আমাদের প্রাপ্য ছিল না। আমার মনে হয়, অনেকেই এটি স্বীকার করবেন যে, ম্যাচের একটা দীর্ঘ সময় আমরা ভারতের চেয়ে ভালো খেলেছি।”
ঋতুপর্ণার প্রশংসা ভারতীয় কোচের মুখে
বাংলাদেশ হারলেও ফাইনালে অসাধারণ খেলা উইঙ্গার ঋতুপর্ণা চাকমাকে প্রশংসায় ভাসিয়েছেন ভারতীয় কোচ ক্রেস্পিন ছেত্রী। ম্যাচ শেষে তিনি বলেন, “ঋতুপর্ণা আজ সত্যি দারুণ খেলেছে। উদীয়মান ও নতুন ফুটবলারদের জন্য সে একটা বড় উদাহরণ। বাংলাদেশ দলে তার নাম আমি আলাদাভাবেই উল্লেখ করব।”
রানার্সআপ ট্রফি নিয়ে বাংলাদেশ দল যখন মাঠ ছাড়ে, তখনও বাইরে অবিরাম বৃষ্টি ঝরছে। সাফের মুকুট হারানোর বেদনা আর ভেজা শরীর নিয়ে স্টেডিয়াম ছাড়ে বাংলাদেশ নারী দল।
উল্লেখ্য, রানার্সআপ ট্রফি ছাড়া বাকি সব মূল পুরস্কারই নিজেদের করে নিয়েছে স্বাগতিক ভারত। টুর্নামেন্টের সেরা গোলকিপার হয়েছেন ভারতের পানথই চানু এবং আসরের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়েছেন ভারতের সানফিদা নংরুম। আর সুশৃঙ্খল ফুটবল খেলার স্বীকৃতি হিসেবে ‘ফেয়ার প্লে’ পুরস্কারটি পেয়েছে নেপাল দল।
টিজে/টিএ