দুবাই এনসিবির চিঠিবেনজীরের মামলার নথিপত্র দুবাইয়ে পাঠানোর প্রস্তুতি দুদকের
ছবি: সংগৃহীত
০৫:১৬ পিএম | ১৫ জুন, ২০২৬
দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হওয়া বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সমস্ত নথিপত্র তৈরির প্রস্তুতি চলছে, চূড়ান্ত করে কূটনৈতিক চ্যানেলে যা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পাঠাবে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
সোমবার (১৫ জুন) দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আকতারুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হওয়া বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সমস্ত নথিপত্র তৈরির প্রস্তুতি চলছে। দুর্নীতির এসব নথিপত্র চূড়ান্ত করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পাঠানো হবে কূটনৈতিক চ্যানেলে।
দুর্নীতি মামলার আসামি আওয়ামী লীগ সরকার আমলের বহুল আলোচিত ও সমালোচিত পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদের গ্রেপ্তার হওয়ার বিষয়টি জানিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) আবুধাবিস্থ ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি)।
সেখান থেকে বাংলাদেশের এনসিবিকে চিঠি দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। ওই চিঠিতে এনসিবি আবুধাবি জানিয়েছে, ইউএইর ‘ফৌজদারি বিষয়ে আন্তর্জাতিক বিচারিক সহযোগিতা সংক্রান্ত’ ফেডারেল আইন নম্বর ৩৯/২০০৬-এর ১১ নম্বর ধারা অনুযায়ী, গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তির প্রত্যর্পণ চেয়ে বাংলাদেশকে ৩০ দিনের মধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক লিখিত আবেদন পাঠাতে হবে। আইন অনুযায়ী প্রত্যর্পণ আবেদনের সঙ্গে আরবি ভাষায় অনূদিত, যথাযথ কর্তৃপক্ষের স্বাক্ষর ও সিলযুক্ত নিম্নোক্ত তথ্য ও নথি সংযুক্ত করতে হবে।
যার মধ্যে রয়েছে- প্রত্যর্পণযোগ্য ব্যক্তির নাম, পরিচয়, ছবি (যদি থাকে), জাতীয়তা, ঠিকানা এবং পরিচয় শনাক্তে সহায়ক অন্যান্য তথ্য; অভিযুক্ত অপরাধের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইন, নির্ধারিত শাস্তি এবং তামাদি-সংক্রান্ত বিধানের অনুলিপি; অনুরোধকারী দেশের বিচারিক কর্তৃপক্ষ কর্তৃক জারি করা আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা; মামলার বিস্তারিত বিবরণ, যেখানে অপরাধের প্রকৃতি, অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ এবং অপরাধ সংঘটনের স্থান উল্লেখ থাকবে। তদন্তাধীন মামলার ক্ষেত্রে তদন্ত প্রতিবেদনের অনুলিপি সংযুক্ত করতে হবে; দণ্ডিত ব্যক্তির ক্ষেত্রে আদালতের রায় বা দণ্ডাদেশের সত্যায়িত অনুলিপি, অপরাধের বিবরণ, আরোপিত শাস্তি এবং রায় কার্যকরযোগ্য হওয়ার প্রমাণপত্র ইত্যাদি।
এনসিবি আবুধাবি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র কূটনৈতিক মাধ্যমে পাঠানোর জন্য বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানিয়েছে বলে দুদক সূত্রে জানা গেছে।
২০২৫ সালের ১০ এপ্রিল বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ‘রেড নোটিশ’ জারি করে ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল পুলিশ অর্গানাইজেশন (ইন্টারপোল)।
দুদকের যে দুই মামলায় তদন্তে আদালতের নির্দেশনায় ইন্টারপোলে রেড নোটিশ ইস্যুর জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেওয়া হয়।
মামলার মধ্যে ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ১২ কোটি টাকার বেশি অবৈধ সম্পদ ও সম্পদের তথ্য গোপনের মামলা রয়েছে। ওই মামলায় আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়। এই মামলার বাদী দুদক উপপরিচালক মোহাম্মদ জয়নাল আবেদিনের প্রেক্ষিতে আদালতের গ্রেপ্তার পরোয়ানা জারি করে। এরই ধারাবাহিকতায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ইন্টারপোলে রেড নোটিশ ইস্যু করা হয়।
দুদক সূত্রে জানা যায়, দুদকের অনুসন্ধানকালে বেনজীরকে সম্পদ বিবরণী দাখিলের আদেশ দেওয়া হলে তিনি আইনজীবীর মাধ্যমে ২০২৪ সালের ২৭ আগস্ট দুদকে সম্পদ বিবরণী জমা দেন। সেখানে তিনি ৫ কোটি ৬৭ লাখ ৩৭ হাজার ৩৬৫ টাকার স্থাবর সম্পদ ও ৫ কোটি ৭৪ লাখ ৮৯ হাজার ৯৬৬ টাকার অস্থাবর সম্পদের তথ্য দেন। তবে তদন্তে দেখা যায়, বেনজীর আহমেদ তার ঘোষণাকৃত সম্পদের মধ্যে ২ কোটি ৬২ লাখ ৮৯ হাজার ৬০ টাকার সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন এবং ৯ কোটি ৪৪ লাখ ৬৪ হাজার ৭৫১ হাজার টাকার সম্পদের বৈধ উৎস দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন। যা জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ বলে দুদকের কাছে প্রমাণিত হওয়া ২০০৪ সালের দুদক আইনের ২৬ (২) ও ২৭ (১) ধারায় অভিযোগ আনা হয়।
অন্যদিকে, ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর পরিচয় গোপন করে পাসপোর্ট নবায়ন ও জালিয়াতির অভিযোগে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়।
বেনজীর ছাড়া বাকী আসামিরা হলেন— পাসপোর্টের সাবেক পরিচালক ফজলুল হক, মুন্সী মুয়ীদ ইকরাম, টেকনিক্যাল ম্যানেজার সাহেনা হক ও বিভাগীয় পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন।
ওই মামলার এজাহারে বলা হয়, বেনজীর আহমেদ ২০২১০ সালের ১১ অক্টোবর ডিআইজি হিসেবে কর্মরত থাকাবস্থায় হাতে লেখা পাসপোর্ট সমর্পণ করে বিভাগীয় অনাপত্তিপত্র ব্যতীত অফিসিয়াল মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (এমআরপি) এর জন্য আবেদন করেন। আবেদন ফরমে ‘অফিসিয়াল’ হিসেবে মার্ক করা হয়। তার আবেদনপত্রের প্রফেশনের ক্রমিকে সরকারি চাকরিজীবী হওয়া সত্ত্বেও জাল-জালিয়াতি, প্রতারণা, অপরাধমূলক অসদাচরণ ও মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে প্রাইভেট সার্ভিস উল্লেখ করা হয়। পরবর্তীতে র্যাবের মহাপরিচালক হিসেবে কর্মরত থাকাবস্থায়ও পাসপোর্টের আবেদনপত্রে জালিয়াতি-প্রতারণা, অপরাধমূলক অসদাচরণ ও মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে ‘প্রাইভেট সার্ভিস’ উল্লেখ করেন। অন্যান্য সময়েও বিভাগীয় অনাপত্তিপত্র ব্যতীত মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (এমআরপি)/ই-পাসপোর্ট (ইলেক্ট্রনিক পাসপোর্ট) এর জন্য আবেদন করেছেন। পাসপোর্ট অধিদপ্তরের আসামিরা বেনজীর আহমেদের দাপ্তরিক পরিচয় সম্পর্কে সম্পূর্ণভাবে জ্ঞাত থেকেও অন্যান্য আসামিরা বিভাগীয় অনাপত্তি সনদ সংগ্রহ না করে কিংবা যাচাই না করে স্বেচ্ছায় সজ্ঞানে তার নামে সাধারণ পাসপোর্ট কিংবা ই-পাসপোর্ট ইস্যুর চূড়ান্ত অনুমোদন প্রদান করেছেন। আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪২০/৪৬৭/৪৬৮/৪৭১/১০৯ ও ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারা এবং দি বাংলাদেশ পাসপোর্ট অর্ডার ১৯৭৩ এর ১১ ধারায় অপরাধ করেছেন।
বেনজীরে বিরুদ্ধে ৭৪ কোটি টাকারও বেশি অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ৪টি মামলাসহ পাসপোর্ট জালিয়াতি ও মানিলন্ডারিং মিলিয়ে বেনজীরের বিরুদ্ধে মোট ৬টি মামলা রয়েছে। ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, গোপালগঞ্জ ও মাদারীপুর, বান্দরবানসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রায় ৩৪৫ বিঘা জমিসহ অঢেল সম্পদের খোঁজ পায় দুদক। এমনকি দেশের গণ্ডি পেরিয়ে দুবাইতে থাকা দুটি ফ্ল্যাট ও ব্যাংক হিসাব জব্দ করে সংস্থাটি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ রোববার (১৪ জুন) বিকেলে সংসদ অধিবেশনের শুরুতে ৩০০ বিধিতে দেওয়া বক্তব্যে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি অবগত করেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর দুর্নীতি মামলায় অভিযুক্ত পুলিশের সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তারের জন্য ইন্টারপোলের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ শুরু করে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) ঢাকা কর্তৃক ইন্টারপোলে আবেদন করা হয়। গত ১১ এপ্রিল ২০২৫ তারিখে এটি পাঠানো হয়েছিল এবং আমরা বিষয়টি মনিটর করেছি। ইন্টারপোল ২০২৫/২৩৯ নম্বর ফাইল ও ৫৭৪/২০২৫ কন্ট্রোল নম্বরের মাধ্যমে বেনজীর আহমেদের প্রতি রেড নোটিশ জারি করে। ওই রেড নোটিশের মাধ্যমে ইন্টারপোল কর্তৃক সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে তাকে গ্রেপ্তারের জন্য অনুরোধ করা হয়।
মন্ত্রী বলেন, গত ১২ জুন সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ডাইরেক্টরেট জেনারেল অব ফেডারেল ক্রিমিনাল পুলিশ, ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) আবুধাবি থেকে পাঠানো একটি ই-মেইলের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারকে জানানো হয়েছে যে, দুর্নীতি মামলায় অভিযুক্ত বেনজীর আহমেদকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে এবং তিনি বর্তমানে সেখানে আটক রয়েছেন।
২০২০ সালে ৩০তম আইজিপি হিসেবে পুলিশ বাহিনীর প্রধান পদে দায়িত্ব নেন বেনজীর। নিয়মানুযায়ী সিনিয়র সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা হিসেবে তার কূটনৈতিক পাসপোর্ট পাওয়ার কথা। কিন্তু বেনজীর মর্যাদাপূর্ণ লাল পাসপোর্টও নেননি। আইজিপি হয়েও তিনি ফের বেসরকারি চাকরিজীবী পরিচয়ে সাধারণ পাসপোর্টের আবেদন করেন। সে সময় দেশে চালু হয় ই-পাসপোর্ট। বেনজীরের আবেদন নিয়েও দেখা দেয় জটিলতা। তা সমাধান করতে তিনি আগারগাঁওয়ের পাসপোর্ট অফিসে যাননি। অসুস্থতার কথা বলে পাসপোর্টের ডিআইপির মোবাইল ইউনিট চেয়ে পাঠান। পরে পাসপোর্ট অফিসের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা তার বাসায় গিয়ে ছবি তোলা, আঙুলের ছাপ নেওয়াসহ সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন। ২০২০ সালের ৪ মার্চ তার আবেদনপত্র জমা হয়ে যায়। ওই বছরের ১ জুন বেনজীরের নামে ১০ বছর মেয়াদি ই-পাসপোর্ট ইস্যু করা হয়।
এসএন