ব্রিটেনের শীর্ষ করদাতার তালিকায় রাজা চার্লস
ছবি: সংগৃহীত
০৫:০৯ পিএম | ২৬ জুন, ২০২৬
দীর্ঘ দশ বছরব্যাপী সংস্কার কাজ শেষ হওয়ার পরও ঐতিহ্যবাহী বাকিংহাম প্যালেসে আর সপরিবারে থাকছেন না ব্রিটিশ রাজা চার্লস।রাজপরিবারের কর্মকর্তারা গতকাল (২৫ জুন) এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। এর মধ্য দিয়ে প্রায় দুই শতাব্দী পর ব্রিটিশ রাজাদের প্রধান কার্যালয় ও প্রধান বাসভবন হিসেবে বাকিংহাম প্যালেস ব্যবহারের ঐতিহাসিক অধ্যায়ের অবসান ঘটতে যাচ্ছে।
একই সঙ্গে গতকাল কর্মকর্তারা প্রথমবারের মতো রাজার কর দেওয়ার হিসাব প্রকাশ্যে এনেছেন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজা চার্লস কর বাবদ ১ কোটি ২৯ লাখ পাউন্ড (প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ ৪০ হাজার মার্কিন ডলার) পরিশোধ করেছেন, যা তাকে ব্রিটেনের শীর্ষ ১০০ করদাতার তালিকায় স্থান দিয়েছে। ২০২২ সালে রানি এলিজাবেথের মৃত্যুর পর রাজপরিবারের আর্থিক হিসাব-নিকাশ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে সমালোচনা বাড়ে। এর পরিপ্রেক্ষিতে আর্থিক বিষয়ে আরও বেশি স্বচ্ছতা বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল রাজপরিবার।
আগামী বছর বাকিংহাম প্যালেসের দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার কাজ শেষ হবে। তবে রাজা চার্লস তার পুরোনো বাসস্থান লন্ডনের 'ক্ল্যারেন্স হাউস'-এই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বাকিংহাম প্যালেসের এই সংস্কার প্রকল্পের আওতায় মূলত জরাজীর্ণ বৈদ্যুতিক সংযোগ, পাইপলাইন এবং হিটিং সিস্টেম পরিবর্তন করা হচ্ছে।
২০১৭ সালে যখন এই সংস্কার কাজ শুরু হয়, তখন আশা করা হয়েছিল এটিই হবে ব্রিটিশ রাজাদের প্রধান বাসভবন; যেমনটি ১৮৩৭ সালে রানি ভিক্টোরিয়ার সিংহাসন আরোহণের পর থেকে হয়ে আসছিল।
রাজার কোষাধ্যক্ষ জেমস চ্যালমার্স জানিয়েছেন, বাকিংহাম প্যালেস সপরিবারে থাকার জন্য ব্যবহৃত না হলেও বিদেশি অতিথিদের স্বাগত জানানোসহ সব ধরনের রাষ্ট্রীয় ও আনুষ্ঠানিক কার্যক্রমের প্রধান কেন্দ্র হিসেবেই বহাল থাকবে।
তিনি সাংবাদিকদের বলেন, 'এটি রাজতন্ত্রের প্রধান কার্যালয় এবং আমাদের জাতীয় ভবনগুলোর মুকুট হিসেবেই থাকবে। মহামান্য যখনই লন্ডনে থাকবেন, ভবনের ছাদে রাজকীয় পতাকা সগর্বে উড়তে থাকবে।'
জানা গেছে, ২০১৯ সালের পর থেকে রাজা চার্লস বা প্রয়াত রানি এলিজাবেথ কেউই বাকিংহাম প্যালেসে রাত কাটাননি। তবে প্যালেসে রাজার ব্যক্তিগত কক্ষগুলো আগের মতোই সংরক্ষিত থাকবে। প্রতি বছর প্রায় ৭ লাখ দর্শনার্থী এই ঐতিহাসিক ভবনটি পরিদর্শন করেন। এখন থেকে সাধারণ মানুষের জন্য এই প্রাসাদে প্রবেশের সুযোগ আরও বাড়ানো হবে বলে জানিয়েছেন জেমস চ্যালমার্স।
আইন অনুযায়ী ব্রিটিশ রাজাকে আয়কর, ক্যাপিটাল গেইনস বা উত্তরাধিকার কর দিতে হয় না। তবে ১৯৯৩ সাল থেকে রানি এলিজাবেথ যেভাবে স্বেচ্ছায় কর দেওয়া শুরু করেছিলেন, রাজা চার্লসও সেই ধারা বজায় রেখেছেন। কিন্তু এর আগে কখনো কর পরিশোধের সুনির্দিষ্ট অংক প্রকাশ করা হয়নি।
১৩৯৯ সাল থেকে চলে আসা নিয়ম অনুযায়ী, ব্রিটিশ রাজারা 'ডাচি অব ল্যাঙ্কাস্টার' নামক বিশাল এক ভূসম্পত্তি থেকে ব্যক্তিগত আয় পেয়ে থাকেন।২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই সম্পত্তি থেকে রাজার আয় ছিল ২ কোটি ৫২ লাখ পাউন্ড। এর বাইরেও তার অন্যান্য সম্পদ ও বিনিয়োগ থেকে আয় রয়েছে।
কোষাধ্যক্ষ চ্যালমার্স জানান, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রাজা চার্লস ১ কোটি ১৭ লাখ পাউন্ড কর দিয়েছেন। ২০২২ সালে সিংহাসনে বসার পর থেকে এ পর্যন্ত তিনি ৩ কোটি পাউন্ডের বেশি কর পরিশোধ করেছেন।
ব্যক্তিগত আয়ের পাশাপাশি রাজপ্রাসাদের রক্ষণাবেক্ষণ, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন এবং যাতায়াত খরচের জন্য সরকারের কাছ থেকে বার্ষিক অনুদান (সভেরেন গ্রান্ট) পেয়ে থাকেন রাজা। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এই অনুদানের পরিমাণ দাঁড়াবে ১৩ কোটি ৭৯ লাখ পাউন্ড। তবে চ্যালমার্স জানান, রাজার স্পষ্ট ইচ্ছার কারণেই ২০২৭-২৮ অর্থবছরে এই অনুদান কমিয়ে ১০ কোটি পাউন্ড করা হবে এবং ২০৩১-৩২ অর্থবছর পর্যন্ত তা অপরিবর্তিত থাকবে।
২০১৬ সালে বাকিংহাম প্যালেসের সংস্কার কাজের তহবিল জোগাতে অনুদান বরাদ্দের নীতিমালায় যে পরিবর্তন আনা হয়েছিল, তার চেয়ে বর্তমান বরাদ্দ প্রায় ৬ কোটি পাউন্ড বেশি। এই বরাদ্দের যৌক্তিকতা নিয়ে চ্যালমার্স বলেন, 'এটি কোনো ব্ল্যাঙ্ক চেক (উন্মুক্ত বরাদ্দ) নয়।' বরাদ্দের পরিমাণ যেন সুসংগত থাকে, তা নিশ্চিত করার জন্য সব ধরনের সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা রয়েছে।
এদিকে সিংহাসনের উত্তরাধিকারী প্রিন্স উইলিয়াম ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৭৭ লাখ ৬০ হাজার পাউন্ড কর দিয়েছেন বলে তার কার্যালয় জানিয়েছে।পাশাপাশি একটি বন্ধ কারাগার থেকে পাওয়া ১৫ লাখ পাউন্ড ভাড়া তিনি স্থানীয় সম্প্রদায়ের কল্যাণে দান করার নির্দেশ দিয়েছেন।
উল্লেখ্য, সেনাবাহিনী, জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা এবং স্কুলগুলোর কাছ থেকে ভাড়া নিয়ে রাজপরিবারের মুনাফা করার যে সমালোচনা উঠেছিল, চার্লস ও উইলিয়াম তা প্রত্যাখ্যান করেছেন।
সূত্র: রয়টার্স
এমআর/টিকে